রাজধানী | The Daily Ittefaq

ঢাকায় তিন বছরের বেশি অবস্থানকারী চিকিৎসকদের তালিকা চূড়ান্ত

ঢাকায় তিন বছরের বেশি অবস্থানকারী চিকিৎসকদের তালিকা চূড়ান্ত
যে কোনও মুহূর্তে বদলির আদেশ জারি হবে, চিন্তায় অনেকে ** স্বাচিপ করলেও আইনের ব্যত্যয় ঘটবে না ** ১০ বছর পর্যন্ত অনেক চিকিৎসক রাজধানীর অধিকাংশ হাসপাতালে কর্মরত
আবুল খায়ের২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং ০৯:২৮ মিঃ
ঢাকায় তিন বছরের বেশি অবস্থানকারী চিকিৎসকদের তালিকা চূড়ান্ত
 
স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসছে। এ খাতে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এবার এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তিন বছরের অধিক সময় ঢাকায় অবস্থানকারী চিকিৎসকরা আর ঢাকায় থাকতে পারবেন না। তাদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। যে কোনো সময় ঢাকার বাইরে বদলির আদেশ জারি হবে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
 
জানা গেছে, তৃণমূলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে উল্লিখিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপের) নেতা হলেও এক্ষেত্রে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না। অতীতে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপি সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের নেতা হওয়ার বদৌলতে ক্ষমতায় থাকাকালীন তারা ঢাকায়ই অবস্থান করতেন। কেউ তাদের সরাতে পারতো না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উল্লিখিত সিদ্ধান্ত বাস্তাবয়ন হলে স্বাস্থ্যখাতে আমূল পরিবর্তন আসবে। 
 
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উল্লিখিত খবরে চিন্তায় পড়েছেন অনেক চিকিৎসক। ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত অনেক চিকিৎসক রাজধানীর অধিকাংশ হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একজন সহযোগী অধ্যাপক আছেন ১৪ বছর ধরে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। অপারেশন থিয়েটারে রোগীকে অজ্ঞান করা হলেও ওই চিকিৎসক সেখানে যান না। বাইরে মিটিং আছে বলে রোগীর অপারেশন বন্ধ রাখেন তিনি। এমন অনেক অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। এছাড়া ৫ বছর ধরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একজন চিকিৎসক আছেন। সম্প্রতি তার পদে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তার পদ নেই অথচ তিনি ওখানে আছেন। নিজেকে স্বাচিপ নেতা হিসেবে দাবি করেন ওই চিকিৎসক।
 
ঢাকার বাইরে তৃণমূলে চিকিৎসক সংকট থাকলেও ঢাকার অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চিকিৎসক রয়েছেন। আর ঢাকার বাইরে চিকিৎসকদের পদ শূন্য থাকে। কেউই ঢাকার বাইরে গিয়ে থাকতে চান না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, চিকিৎসকদের দলবাজির কারণে গ্রামে চিকিৎসক থাকছেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের অদক্ষতা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিকিৎসকদের গ্রামের কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে একাধিকবার অনুরোধ করেছেন, নির্দেশও দিয়েছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও গ্রামে তিন বছর থাকার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন এবং এ ব্যাপারে তদারকি অব্যাহত রেখেছেন। গ্রামে চিকিৎসক না থাকাসহ চিকিৎসকদের আচরণ নিয়ে জাতীয় সংসদে ইতিপূর্বে সংসদ সদস্যরা কয়েক দফা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছে কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি। স্বাচিপের একাধিক নেতা বলেন, দলের মধ্যে যোগ্য ও অভিজ্ঞ অনেক চিকিৎসক আছেন। দলবাজি করতে গিয়ে তারা ডাক্তারের অভিজ্ঞতা থেকে দূরে থাকেন। নিয়ম অনুযায়ী তিন বছরের অধিক সময় ধরে ঢাকায় থাকা চিকিৎসকদের বদলি করা হলে অনেক যোগ্য ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক ঢাকায় আসার সুযোগ পাবেন।
 
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুক্তি, যারা একটানা তিন বছর গ্রামে থেকেছেন, তাদের ঢাকায় আসার সুযোগ করে দেওয়া উচিত। আর যারা ঢাকায় তিন বছরের অধিক সময় অবস্থান করছেন, তাদের গ্রামে গিয়ে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে হবে। চিকিৎসকদের নিয়োগ বদলি নীতিমালায় তা উল্লেখ রয়েছে। এবার তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। জানা গেছে, এমবিবিএস শেষ করার পর প্রায় সব চিকিৎসকই ঢাকায় থাকতে চান। ঢাকায় ব্যক্তিগতভাবে রোগী দেখার এবং বেসরকারি ক্লিনিকে কাজ করার সুযোগ বেশি। তাই ঢাকা কিংবা আশপাশে পদায়ন চান সবাই। অনেকে অজুহাত দেখিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। স্নাতকোত্তর শিক্ষার নামে চিকিৎসকদের ঢাকায় আসা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য বলছে, বর্তমানে এমডি, এমএস, এফসিপিএস, এমফিল ও ডিপ্লোমা কোর্সে এক হাজার ৪৯৭ জন চিকিৎসক প্রেষণে আছেন। ঢাকা না ছাড়তে অনেকে একটি কোর্স শেষ করে অন্য কোর্সে ভর্তি হন। এছাড়া সংযুক্তির (অ্যাটাচমেন্ট) মাধ্যমে অনেকে রাজধানীর বড় বড় হাসপাতালে কাজ করছেন। রাজধানীর অধিকাংশ হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে অনুমোদিত পদের চেয়ে বেশিসংখ্যক চিকিৎসক কাজ করছেন।
 
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, পঙ্গু হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, দুই একজন নয়, অনেক চিকিৎসকই ৫ থেকে ১০ বছর ধরে সেখানে আছেন। কেউ কেউ আবার ১৩/১৫ বছর ধরে অবস্থান করছেন। কর্তৃপক্ষ অনেকের নামও বলেছে। রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি হিসেবে তারা থাকেন। আবার কেউ কেউ টাকার বিনিময়ে যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলেরই নেতা বনে যান। বিএনপির সময় বিএনপি, আর আওয়ামী লীগের সময় আওয়ামী লীগ। বিএমএ ও স্বাচিপের এক শ্রেণির নেতা এবং মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সমন্বিত সিন্ডিকেটের কারণে কোনোভাবেই তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা যায় না। ঢাকার বাইরে বদলি করা না গেলেও এসব চিকিৎসকের অধিকাংশ কিন্তু বৃহস্পতি থেকে শনিবার ঢাকার বাইরে প্রাইভেট প্রাকটিস করতে যান। প্রাইভেট প্রাকটিসের জন্য গ্রামে যেতে পারলেও সরকারি চাকরি করতে যেতে পারেন না।
 
জানা গেছে, জেলা ও উপজেলাসহ ইউনিয়ন পর্যায়ের বেশিরভাগ বেসরকারি ক্লিনিকে ঢাকার চিকিৎসকরা প্রাইভেট প্রাকটিস করেন। অনেকের সাইনবোর্ড আছে, অনেক এলাকায় আবার মাইকিং করে বলা হয়, ঢাকা থেকে ওমুক ডাক্তার আসছেন। এই ৩ দিন রাজধানীর সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেবা ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এর সত্যতা স্বীকার করেছেন। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেন না তারা। কারণ এসব চিকিৎসকের হাত অনেক লম্বা।
 
সূত্র জানায়, যেসব চিকিৎসক ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে আছেন তাদের অনেকের যোগ্যতাও কম। কারণ চিকিৎসা সেবার চেয়ে রাজনীতিকে তারা বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, মেধাবী চিকিৎসকরা কখনো লেজুড়বৃত্তি করেন না। কারণ চিকিৎসকরা যত বেশি চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত থাকবেন, ততবেশি অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন।    
 
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ইত্তেফাককে বলেন, আমরা একসঙ্গে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে তাদের গ্রামে পদায়ন করি। তিন বছর তাদের সেখানে থাকার নির্দেশনা দিয়েছিলাম। তিন বছর পর তাদের ভাল জায়গায় আসার সুযোগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিন বছরের বেশি সময় কোনো চিকিৎসক ঢাকায় থাকতে পারবেন না। আমরা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিচ্ছি। যেকোনো মূল্যে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।
 
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৪ নভেম্বর, ২০১৭ ইং
ফজর৫:১১
যোহর১১:৫৩
আসর৩:৩৮
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩৪
সূর্যোদয় - ৬:৩২সূর্যাস্ত - ০৫:১২