রাজধানী | The Daily Ittefaq

চাকরির জন্য পড়া, ধুলো জমে অন্য বইয়ে

চাকরির জন্য পড়া, ধুলো জমে অন্য বইয়ে
বেগম সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার
রফিকুল ইসলাম রবি ও তামিম মজিদ০৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং ০২:০৭ মিঃ
চাকরির জন্য পড়া, ধুলো জমে অন্য বইয়ে

সকাল ৮টা। রাজধানীর শাহবাগস্থ বেগম সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারে প্রবেশের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন তরুণ ও তরুণীরা। সকাল ১০টায় পাবলিক লাইব্রেরি খুলে দেওয়া হলেও সিট নিশ্চিত করার জন্য কয়েক ঘণ্টা আগে থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন এসব তরুণ ও তরুণীরা। গত রবিবার এ চিত্র দেখা যায়।

তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এটা নিত্য দিনের চিত্র। বয়সে তরুণ এসব গ্র্যাজুয়েটরা সাহিত্য, বিজ্ঞান, সমাজ কিংবা গল্পের বই পড়ার জন্য এখানে আসেন না, মূলত বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে এখানে পড়াশোনা করতে আসেন। কারণ এখানকার পরিবেশ অনেক নিরিবিলি। লাইব্রেরির ২য় তলার সাধারণ পাঠ কক্ষে উপন্যাস, কবিতা, সাহিত্য ও কিংবা বিজ্ঞানের বই নয়, সবাই বিসিএস সম্পর্কিত বই মনোযোগী হয়ে পড়ছেন। বুক সেলেফ সারিবদ্ধ পড়ে আছে অন্যান্য বই। প্রচ্ছদে জমে আছে ধুলো। কারণ এসব বই খুবই কমই নড়াচড়া করেন পাঠকরা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, দু’বছর আগেও পাবলিক লাইব্রেরির এমন চিত্র ছিল না। স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণ-তরুণীরা বই পড়ার জন্য এখানে ভিড় জমাতো। নানা ধরনের বইয়ের মধ্যে খুঁজে নিতো তার মৌলিক জ্ঞান। অথচ এখন পাবলিক লাইব্রেরিতে ক্যারিয়ার কেন্দ্রিক জ্ঞান চর্চায় একমুখী হয়েছেন তরুণরা। চাকরি প্রত্যাশী তরুণদের ভিড়ে অন্যান্য পাঠকরা সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে পাবলিক লাইব্রেরির স্বকীয়তা হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন তারা। তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, চাকরির জন্য পড়াশোনার যে, অন্য কোনো কিছু শেখা যায় না, এটা পুরোপুরি ঠিক না। কারণ চাকরির জন্য সাহিত্য, গণিত, ইংরেজিসহ অনেক বিষয়েই পড়তে হয়। তাই কিছুটা হলেও তো জানা বা শেখা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের অন্যতম এই বৃহত্ লাইব্রেরিতে প্রায় ২ লাখ বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে।

কথা হয় জাতীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে পড়তে আসা জান্নাতুল ফেরদাউস তরি নামের একজন তরুণীর সঙ্গে। তিনি গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ উন্নয়ন বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে চাকরির বাজারে প্রচুর প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় নিজেকে প্রস্তুত করতে কঠোর অধ্যবসায় প্রয়োজন।

ইমরান আহমদ অপু নামে এক তরুণ জানান, তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিনান্স বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিরও সভাপতি। কাজ করেছেন একটি অনলাইনে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে। কিন্তু সেই পেশা পড়ে এখন মনোযোগ দিয়েছেন বিসিএসমুখী পড়াশোনায়। তিনি বলেন, টার্গেট একটাই, যেকোনো একটা সরকারি চাকরি পাওয়া।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী মাসুদ রানা জানান, বিসিএসে একমাত্র টার্গেট প্রশাসন অথবা পুলিশ ক্যাডার হওয়া। আরেক তরুণী পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হোম ইকোনমিক্ম কলেজ থেকে। তিনিও চাকরির পড়াশোনার জন্য নিয়মিত লাইব্রেরিতে আসেন বলে জানান।

জাতীয় গণগ্রন্থাগারের প্রিন্সিপাল লাইব্রেরিয়ান মো. জিল্লুর রহমান ইত্তেফাক’কে বলেন, বিসিএস বা অন্য সরকারি চাকরি অথবা ব্যাংকের চাকরির পড়াশুনা করার জন্যই লাইব্রেরিতে আসেন তরুণ ও তরুণীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক এবং মানব সম্পদ ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক ইত্তেফাককে বলেন, তরুণরা লাইব্রেরিতে গিয়ে চাকরির প্রতিযোগিতায় টিকতে সহায়ক বই পড়ছে। মূল একাডেমিক বা একস্ট্রা কারিকুলামের বইগুলোর প্রতি তাদের আগ্রহ কম। এই প্রক্রিয়ার ফলে শিক্ষার্থীরা একমুখী হয়ে পড়ছে। ফলে মেধাশূন্য মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে। যাদের সমাজ, সংস্কৃতি বা শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে জ্ঞান সীমিত কিংবা ভাসমান জ্ঞান। সে চাকরি ঠিকই পাচ্ছে, প্রকৃতভাবে যে একজন চাকরিজীবীর সমন্বিত জ্ঞান থাকা দরকার সেই জায়গা তৈরি হচ্ছে না। এভাবে চললে সুস্থ, মননশীল, ক্রিয়াশীল মানবসম্পদ তৈরিতে আমরা ব্যর্থ হয়ে পড়বো।

এই বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, এই সিস্টেম থেকে বের হয়ে আসতে হলে চাকরিতে প্রার্থী বাছাই পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। এসব পরীক্ষার একাডেমিক নম্বরের একটা অংশ থাকতে হবে। ফলে শিক্ষার্থীরা একাডেমিক পড়াশোনার উপর গুরুত্ব দেবে।

ইত্তেফাক/নূহু

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩৩
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৩
মাগরিব৫:৫৭
এশা৭:১০
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫২