রাজধানী | The Daily Ittefaq

উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের স্ত্রী পরিচয়ে প্রতারণা, ইকোসহ অাটক ২ মা কুইন পলাতক

উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের স্ত্রী পরিচয়ে প্রতারণা, ইকোসহ অাটক ২ মা কুইন পলাতক
আবুল খায়ের২০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং ২১:১৭ মিঃ
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের স্ত্রী পরিচয়ে প্রতারণা, ইকোসহ অাটক ২ মা কুইন পলাতক
রাজধানীতে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ সুন্দরী নারী অপরাধী চক্র সক্রিয়। ব্যাংকের এমডি-ডিএমডিসহ বিভিন্ন বড় বড় সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের নামে ভুয়া কাবিননামায় স্বামী বানিয়ে প্রতারণা চালাচ্ছে তারা। এছাড়া এসব সুন্দরী মহিলা দামি স্বর্ণালঙ্কার পরে আর দামি গাড়ি হাঁকিয়ে বিয়ের দাওয়াত কার্ড দেওয়ার কথা বলে টার্গেটকৃত বাড়িতে প্রবেশ করে। এরপর বাড়ির লোকজনের সঙ্গে ভাব জমিয়ে কৌশলে স্বর্ণালঙ্কার, টাকা পয়সাসহ মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। রাজধানীতে এমন অভিনব প্রতারণা অহরহ ঘটছে।
 
অবশেষে সম্প্রতি পুলিশ এক সুন্দরী মহিলা প্রতারককে গ্রেফতার করেছে। ইকো নামক এই নারী কুইন নামক আরেক মহিলাকে মা পরিচয় দিতেন। ইকো নিজের মুখে প্রতারণার কথা স্বীকার করেছেন। তার মা কুইনকে মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী দাবি করলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই মহিলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতার বন্ধুর স্ত্রী। তাদের গ্রামের বাড়ি বগুড়ার শাহজাহানপুরে। বর্তমানে তারা মোহাম্মদপুরস্থ লালমাটিয়ায় থাকেন। প্রতারণার অংশ হিসেবে তারা ২/৩ জন কর্মকর্তাকে নিজের কাপড় নিজে খুলে চিত্কার দিয়ে চাকরিচ্যুত করেন। সম্প্রতি এই দুই প্রতারকের একজন সরকারি উচ্চ পদস্থ এক কর্মকর্তাকে হেনস্থা করার প্রয়াসে ভুয়া কাবিননামা তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেন এবং নিজেকে উক্ত কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে দাবি করেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে রমনা থানায় একটি মামলায় ওয়ারেন্ট ইস্যু আছে। মগবাজারে কাজী মো. সেলিম রেজা বাদী হয়ে প্রতারণার মামলা দায়ের করেন।
 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইকো নামক এ মহিলা প্রতারকের সঙ্গে আছেন একশ্রেণির আইনজীবী, পুলিশ ও ভুয়া সাংবাদিক। ওই মহিলা প্রতারকের নামে ঢাকার বিভিন্ন থানায় একাধিক জিডি/মামলা আছে। বর্তমানে রমনা থানায় একটি মামলা আদালতে বিচারাধীন এবং একটি মামলা থানায় তদন্তাধীন আছে। ওই মহিলার কাছ থেকে পুলিশ ৫টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছে। প্রতারক ইকোর মা কুইন পলাতক আছেন। মগবাজারের কাজী আলহাজ্ব মাওলানা কাজী মোহাম্মদ সেলিম রেজা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন ১৩ ডিসেম্বর রমনা থানায়। উল্লিখিত মা-মেয়েই আসামি। সরকারি শীর্ষ কর্মকর্তার নামে যে কাবিননামা দেখানো হয়েছে এ ধরনের কোনো কাবিননামা এখানে করা হয়নি বলে কাজী মোহাম্মদ সেলিম রেজা মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন।
 
তাদের খপ্পরের শিকার সচিবালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনিও তাদের প্রতারণার শিকার। বিটিআরসির এক শীর্ষ কর্মকর্তাও তাদের হাত থেকে রেহাই পাননি। সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রতারণা করায় একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি তদন্তে নেমেছে। জানা গেছে, মা-মেয়ে ধরা পড়লেও তাদের সঙ্গে আরো অনেক সুন্দরী জড়িত। এরা ঢাকা শহরে অনেক বাড়ি-গাড়ির মালিক।
 
এদিকে এর আগে প্রতারণার শিকার হয়েছেন তানজিনা আক্তার নামের এক গৃহিণী। এ বিষয়ে হাজারীবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছে। বাড়ির বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যার দিকে এক মহিলা বাড়ির গেটে আসে। তার সারা গায়ে দামী স্বর্ণালঙ্কার। লম্বা। দেখতে খুবই সুন্দরী। বাড়িতে প্রবেশ করতে গেলে দারোয়ান বাধা দেয়। ওই গৃহিণীর আমেরিকা প্রবাসী ননদের বান্ধবী বলে পরিচয় দেয় ওই মহিলা। বিষয়টি দারোয়ান ওই গৃহিণীকে জানান। স্বাভাবিক কারণেই ভদ্রতার খাতিরে ওই গৃহিণী মহিলাকে বাড়িতে প্রবেশ করার অনুমতি দেন। মহিলা গৃহিণীর ফ্ল্যাটে গিয়ে হাজির হয়। ওই মহিলা গৃহিণীকে বলেন, রেডিসন হোটেলে তার ভাইয়ের বিবাহ অনুষ্ঠান হবে। তাই দাওয়াত দিতে এসেছেন। বিবাহর জন্য তারা আমেরিকা থেকে ঢাকায় এসেছেন। আলাপ আলোচনায় ওই মহিলা গৃহিণীর পরিবারের অন্যান্য সদস্য সম্পর্কেও নানা কিছু বলেন। যা সত্য। এতে করে গৃহিণীর মনে বিশ্বাস হয়। গৃহিণী ওই মহিলাকে ড্রইং রুমে বসতে দেন। ওই মহিলা গৃহিণীকে বলেন, ঈদের সময় ভাল করে সাজগোজ করবেন। গৃহিণী জানান, তার স্বামী বাইরে আছেন। তিনি এলে সাজগোজ করবেন।
 
এদিকে মহিলা বলেন, আমেরিকা থেকে আমার ভাই ও অন্য সদস্যরাও এসেছেন। তারাও আপনার বাসায় বেড়াতে আসছেন। তারা নতুন অতিথি। তারা এসে অগোছালো দেখলে খারাপ লাগবে। তাই গৃহিণীকে সাজার জন্য জোর করতে থাকেন। এক পর্যায়ে গৃহিণী স্বর্ণালঙ্কারের বাক্স বের করে সাজগোজ করতে থাকেন। ইতোমধ্যেই ভাব জমিয়ে ওই মহিলা ফ্ল্যাটের প্রতিটি রুমই দেখে নেয়। বাক্সে থাকা অনেক গহনার মধ্যে কিছু নিয়ে সাজগোজ করেন। বাকিগুলো বাক্সেই থেকে যায়। বাক্সটি পাশেই রেখে দেন। কারণ ওই মহিলার গায়ে যে পরিমাণ গহনা আছে, তার চেয়ে অনেক কম আছে ওই বাক্সে। ফলে ওই মহিলা গহনা হাতিয়ে নিতে পারে, সেটি গৃহিণীর কল্পনারও বাইরে।
 
সাজগোজ করার পর দুইজনে আবার গল্প করতে থাকেন। এ সময় মহিলা মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। কথাবার্তার ভাব অন্যরকম। ফোনে তার ভাইকে উদ্দেশ করে বলছেন, বিদেশ থেকে আনা উন্নতমানের চকলেট নিয়ে আয় বাচ্চার জন্য। বেশি দেরি করিস না। এমন আলাপ আলোচনার এক পর্যায়ে গৃহিণী ছোটখাটো প্রয়োজনের জন্য এক রুম থেকে অন্যরুমে যাতায়াত করছিলেন। এই ফাঁকে ওই মহিলা গহনার বাক্স নিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলে। এরপর অন্য একটি রুম থেকে বিদ্যুতের বিলের কাগজ নিয়ে আসে। সেই কাগজ একটি শপিং ব্যাগে ভরে। এ সময় গৃহিণী বাথরুমে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় ওই নারী কাগজের ব্যাগটি গৃহিণীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন, ব্যাগে চার হাজার ডলার আছে। ডলারগুলো রেখে দেন। আমি পরে এসে নিয়ে যাব। গৃহিণী তাতে রাজি হননি। গৃহিণী বলেন, যদি হারিয়ে যায়, তখন কি হবে। তখন ওই মহিলা বলেন, আমেরিকায় অনেক টাকা কামিয়েছি। জানি আপনি খুবই দায়িত্বশীল মানুষ। হারানোর প্রশ্নই আসে না। যদিও নিতান্তই হারিয়ে যায়, তাহলে আমার কোনো দাবি নেই। নেন, চট করে বাথরুম সেরে আসুন। বাথরুম থেকে বেরিয়ে গৃহিণী দেখেন বাড়িতে ওই মহিলা নেই।
 
সঙ্গে সঙ্গে নিচে থাকা দারোয়ানের কাছে গেলে মহিলা দ্রুত বেরিয়ে গেছেন বলে জানায়। পরবর্তীতে বাসায় রেখে যাওয়া ডলারের ব্যাগ তল্লাশি করে দেখা যায়, তার ভেতরে বাসারই বিদ্যুত্ বিলের সব কাগজ। আর বাড়িতে পরিবারের সবার স্বর্ণালঙ্কার রাখার পুরনো বড় বাক্সটি নেই। প্রায় ২০ লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে গেছে মহিলা।
 
জানা গেছে, এরা সংঘবদ্ধ অপরাধী। তারা নানা কৌশলে বাসায় প্রবেশ করে এ ধরনের অপরাধ করে থাকে। তবে এ ধরনের অপরাধে জড়িতরা টার্গেটকৃত ব্যক্তিদের সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেয়। আর সঙ্গে নিকট প্রতিবেশী ছাড়াও ঘনিষ্ঠ অন্যরা জড়িত থাকে। আর ভুয়া কাবিননামায় স্বামী পরিচয়ে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত চক্রটি খুবই শক্তিশালী। লোক-লজ্জার ভয়ে ভুক্তভোগী কেউই মুখ খুলতে চান না।
 
ইত্তেফাক/এমআই
 
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৪
মাগরিব৫:৫৮
এশা৭:১১
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫৩