রাজধানী | The Daily Ittefaq

নির্বাচন নিয়ে এখনো সংশয়

নির্বাচন নিয়ে এখনো সংশয়
রসিকের পর এবার ঢাকা সিটি মেয়র উপ-নির্বাচন
শামছুদ্দীন আহমেদ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং ০০:৪৬ মিঃ
নির্বাচন নিয়ে এখনো সংশয়

রংপুর সিটি করপোরেশনের (রসিক) নির্বাচনের পর এবার আলোচনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র পদে উপ-নির্বাচন। আইনি জটিলতার কারণে এই নির্বাচন নিয়ে এখনও সংশয় কাটেনি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপিসহ অন্যান্য দল এনিয়ে এখনও দ্বিধাদ্বন্দ্বে। তবে প্রার্থী বাছাইসহ নির্বাচনের প্রাথমিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে দলগুলো। এখন অপেক্ষা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তফসিল ঘোষণার, এরপর দলগুলো প্রার্থী ঘোষণা দিয়ে ভোটের মাঠে নামার প্রক্রিয়া শুরু করবে। ইসি জানুয়ারির মাঝামাঝি তফসিল ঘোষণা ও ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।

আইনি জটিলতার পাশাপাশি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ডিএনসিসি’র মেয়র পদে উপ-নির্বাচনের বিষয়ে আগ্রহী কি-না, এনিয়েও সন্দেহ-সংশয় বিরাজ করছে বিএনপিসহ বিভিন্ন দল-জোটে। তাদের ধারণা, একাদশ সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এই উপ-নির্বাচনের ঝুঁকি সরকারি দল নেবে কি-না, সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে। কারণ রাজধানীতে এই নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব সামগ্রিক রাজনীতিসহ একাদশ সংসদ নির্বাচনেও পড়বে। ফলাফল বিপক্ষে গেলে সেটি সরকারের জন্য সুখকর বার্তা দেবে না। এর ওপর রসিক নির্বাচনে মেয়র পদে হেরে যাওয়ায় এবং আগের তুলনায় নিজেদের ভোট অনেক কমে যাওয়ায় ডিএনসিসি নির্বাচনের বিষয়ে আওয়ামী লীগের অনাগ্রহ বাড়তে পারে। রসিক নির্বাচনের ফল ও ডিএনসিসি’র উপ-নির্বাচন নিয়ে শনিবার অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে।

তবে আওয়ামী লীগের অনাগ্রহের বিষয়টি অস্বীকার করে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ফারুক খান রবিবার ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘আমাদের কোনো অনাগ্রহ নেই। ডিএনসিসি নির্বাচনের বিষয়ে আমরা অত্যন্ত সিরিয়াস। আমরা মেয়র পদে ভালো প্রার্থী দেব এবং ইন্শাল্লাহ আমরা জয়ীও হবো।’

ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৮টি করে নতুন ৩৬টি ওয়ার্ড যুক্ত হওয়ায় ডিএনসিসি’র মেয়র পদে উপ-নির্বাচন নিয়ে আইনি জটিলতার প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যুক্ত ১৬টি ইউনিয়নকে ৩৬টি ওয়ার্ডে বিভক্ত করে গত জুলাই মাসের শেষদিকে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এর ফলে ঢাকা উত্তরে ১৮টি ওয়ার্ড যুক্ত হয়ে মোট ওয়ার্ড হয়েছে ৫৪টি। আর দক্ষিণে ১৮টি নতুন ওয়ার্ড যুক্ত হয়ে মোট ওয়ার্ড হয়েছে ৭৫টি। ইসি বলছে, মেয়র পদে উপ-নির্বাচনের সঙ্গে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে নতুন ৩৬টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদেও নির্বাচন হবে। তবে নতুন ভোটারদের প্রার্থী হতে পারা না পারা এবং নির্বাচিত হওয়ার পর কাউন্সিলরদের মেয়াদ নিয়ে অস্পষ্টতা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ইসি নির্বাচনের তফসিল দিলেও সংক্ষুব্ধ কেউ আদালতে মামলা ঠুকলে ভোট আটকে যেতে পারে- এমন সংশয় বিরাজ করছে। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে ২০১৫ সালে সর্বশেষ সিটি নির্বাচনের আগে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও মামলার কারণে দীর্ঘদিন প্রশাসক দিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন চালানো হয়েছিল। উল্লেখ্য, ডিএনসিসির উপ-নির্বাচন হলে নতুন মেয়রের মেয়াদ হবে তিন বছরের মতো, কারণ প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক এরমধ্যে দুই বছরের কিছু বেশি সময় মেয়র পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে শনিবার অনুষ্ঠিত দলটির প্রেসিডিয়াম বৈঠকে ডিএনসিসি’র মেয়র পদে উপ-নির্বাচনে দলের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন থেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে দিতে প্রধানমন্ত্রী ওই বৈঠকে দলীয় নেতাদের নির্দেশনা দেন।

বিষয়টি স্বীকার করে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ফারুক খান ইত্তেফাককে জানান, বৈঠকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন জনের নামও এসেছে। এরমধ্যে রয়েছেন- তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম, বিজিএমইএ’র আরেক সাবেক সভাপতি ও হা-মীম গ্রুপের মালিক এ কে আজাদ, আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ডা. এইচ বি এম ইকবাল, ব্যবসায়ী আবদুস সালাম মুর্শেদী, আওয়ামী লীগের ঢাকা উত্তর কমিটির সভাপতি ও ব্যবসায়ী এ কে এম রহমতুল্লাহ এমপি, চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী, আওয়ামী লীগের ঢাকা উত্তর কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদার ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র বর্তমান সভাপতি মহীউদ্দিন প্রমুখ।

ফারুক খান বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কাকে মনোনয়ন দেবে, প্রেসিডিয়াম বৈঠকে তা চূড়ান্ত হয়নি। নেত্রী (শেখ হাসিনা) সবার বিষয়ে খোঁজ নিতে বলেছেন। আমরা দলীয়ভাবে এবং বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে জরিপ চালাচ্ছি। যার বিষয়ে সবচেয়ে ভালো রিপোর্ট পাওয়া যাবে এবং যাকে মনোনয়ন দিলে জয়ী হতে পারবে তাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে। তবে এটা চূড়ান্ত হবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর।’ অবশ্য আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরাসরি দলের নেতা নন-তবে দলের সমর্থক একজন উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়ীকে মনোনয়ন দেয়ার সম্ভাবনা বেশি।

বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলামকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিক থেকে ইতোমধ্যে সবুজ সংকেত দেয়া হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। তবে বিষয়টি কেউ পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারেনি। আতিকুল ইসলামকে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী হিসাবে দেখতে চেয়ে গুলশান-বনানীসহ ডিএনসিসি এলাকার বিভিন্ন স্থানে পোস্টার-ব্যানারও লাগানো হয়েছে। এ ব্যাপারে আতিকুল ইসলাম রবিবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার নিজের কিছু বলা ঠিক হবে না। তবে আমার আগ্রহ আছে, প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন দিলে অবশ্যই নির্বাচন করবো।’ উল্লেখ্য, আতিকুল ইসলামের ভাই তাফাজ্জাল ইসলাম প্রধান বিচারপতি ছিলেন। তার নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আপিলের রায় দেন। তার আরেক ভাই মইনুল ইসলাম সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রধান ছিলেন।

বিজিএমইএ’র আরেক সাবেক সভাপতি ও হা-মীম গ্রুপের মালিক এ কে আজাদ ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, মেয়র পদে নির্বাচন করতে তিনি আগ্রহী, প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন দিলে তিনি নির্বাচন করবেন। মেয়র হতে পারলে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের অসমাপ্ত কার্যক্রম সম্পন্নের পাশাপাশি ঢাকা উত্তরকে ঘিরে তার নিজেরও কিছু পরিকল্পনা রয়েছে যেগুলো বাস্তবায়ন করতে চান। অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী গতবারও মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। এবারও তিনি আগ্রহী। কবরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমার আগ্রহ তো আছেই। কিন্তু সবকিছু নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর ওপর।’

সাতক্ষীরার সাবেক সংসদ সদস্য এইচএম গোলাম রেজাও মেয়র পদে উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন চান। নবম সংসদের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ওই সংসদে জাতীয় পার্টির (জাপা) হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী গোলাম রেজা বলেন, ‘বিএনপিসহ চারদলীয় জোট সরকারের শেষদিকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ও দেশের প্রায় সকল গোয়েন্দা সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে আমি ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে ১৪ দলের জনসভায় এরশাদকে উপস্থিত করতে পেরেছিলাম, যেখানে মহাজোটের ঘোষণা আসে। এর আগের ঘটনাপ্রবাহও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানেন। তাছাড়া আমি মনে করি আনিসুল হকের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করে আমি ডিএনসিসিকে এগিয়ে নিতে পারবো।’

এদিকে, ডিএনসিসি’র মেয়র পদে উপ-নির্বাচন হলে তাতে অংশ নেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। তবে কাকে প্রার্থী করা হবে সে বিষয়ে এখনও দলীয় ফোরামে আলোচনা হয়নি। দলটির সূত্রে জানা গেছে, গতবারের মেয়র পদপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল এবারও দলের আলোচনায় রয়েছেন। এ ব্যাপারে তাবিথের বক্তব্য পাওয়া না গেলেও তার বাবা ও বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ইত্তেফাককে বলেন, ‘নির্বাচন হবে কি-না সেটি এখনও নিশ্চিত নয়। তাছাড়া দল কাকে মনোনয়ন দেবে সেটা নিয়েও এখনও কথা হয়নি। তফসিল হোক, তারপর দল এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।

তাবিথ ছাড়াও গুলশান এলাকার বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেজর (অব.) কামরুল ইসলামের নামও আছে জোর আলোচনায়। কামরুল ইসলাম ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, এ ব্যাপারে দলীয় সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আমি চাই ভালো নির্বাচন হোক, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর জয়লাভের সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। আনিসুল হক অল্প সময়ে ভালো কাজ করেছেন, আমি মনে করি দলের ঊর্ধ্বে উঠে দেশকে ভালোবেসে কাজ করা উচিত। সেক্ষেত্রে দল যদি আমার চেয়েও ভালো কাউকে প্রার্থী করে আমার আপত্তি নেই। তবে যেহেতু আমি এ এলাকার তিনবার সংসদ সদস্য ছিলাম, সবকিছু চেনা-জানা, দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মী-সমর্থকরাও পরিচিত-সেই কারণে মনে করি আমি নির্বাচিত হতে পারলে ডিএনসিসি এলাকার জন্য আনিসুল হকের মতো কিছু কাজ করতে পারবো। তিনি বলেন, এ এলাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা যানজট ও জলাবদ্ধতা। জলাবদ্ধতা থাকলে সড়কগুলোও টেকসই হয় না। এখানকার খালগুলো পুনঃখনন করা দরকার। রাস্তাগুলোকে আরও প্রসস্ত করা দরকার। পার্কিংও এখানকার বড় সমস্যা, এর সমাধানে পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে। গুলশান-বনানীর ওপর চাপ কমাতে তেজগাঁও এলাকাকে পুরোপুরি বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। পাবলিক টয়লেট আরও বাড়াতে হবে। এসব কাজের জন্য স্বরাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতা অপরিহার্য।

বিএনপি ও ২০ দল সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি মেয়র পদে এককভাবে নাকি জোটগতভাবে লড়বে সেটিও এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। জোটগতভাবে লড়ার সিদ্ধান্ত নিলে সেক্ষেত্রে জোট শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থকেও প্রার্থী করা হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। পার্থ ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিএনপি এককভাবে নির্বাচন করলে একরকম হিসাব। আবার জোটগত হলে ভিন্ন চিন্তা। আবার জোটের বাইরে গিয়ে আরও বৃহত্তর পরিসরেও ভাবতে পারে বিএনপি। বিএনপি এককভাবে নির্বাচন করলে সেক্ষেত্রে মেজর কামরুল বা তাবিথ বা দলের অন্য কেউ প্রার্থী হতে পারেন। আর জোটগত হলে এবং জোট চাইলে আমিও প্রার্থী হতে পারি।’

ইত্তেফাক/নূহু

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৬
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৩
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬