রাজধানী | The Daily Ittefaq

দীর্ঘকাল ঢাকায় থাকা ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু

দীর্ঘকাল ঢাকায় থাকা ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু
আবুল খায়ের২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং ১০:২৯ মিঃ
দীর্ঘকাল ঢাকায় থাকা ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু
বছরের পর বছর ধরে চর দখলের মতো ঢাকায় অবস্থানকারী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। প্রথম ধাপে ১০৬ চিকিৎসককে ঢাকার বাইরে বদলি করেছে সরকার। বদলিকৃত চিকিৎসকদের মধ্যে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, সিনিয়র কনসালটেন্ট ও জুনিয়র কনসালটেন্ট রয়েছেন। সরকারি এ আদেশে ঢাকার বাইরের সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালগুলোতে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার বাইরে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট প্রকট। সরকারি ৩১টি মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে ঢাকায় আছে মাত্র তিনটি। বাকি ২৮টি মেডিক্যাল কলেজ ঢাকার বাইরে। ঢাকার বাইরের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে গড়ে ৪০ ভাগ শিক্ষকের পদ শূন্য। এরমধ্যে মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি বিভাগের ৩০ ভাগ শিক্ষকের পদ শূন্য। এনাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, ফরেনসিক মেডিসিনসহ বেসিক সাইন্সের ৪০ ভাগ শিক্ষকের পদ শূন্য। উপজেলা পর্যায়ের ৫০ ভাগ সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞের অভাবে অপারেশন বন্ধ রয়েছে। জেলা পর্যায়ের অনেক হাসপাতালে মাঝে মধ্যে অপারেশন বন্ধ থাকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা ইত্তেফাকের কাছে এসব সত্যতা স্বীকার করেছেন।
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৯ বছরে একাধিক অনুষ্ঠানে চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার জন্য নির্দেশ দিয়ে আসছেন। সর্বশেষ গতকাল রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে সরকারি চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে থেকে যথাযথভাবে মানুষকে সেবা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ঢাকা ছাড়ুন, কর্মস্থলে থাকুন, নয়তো চাকরি ছেড়ে দিন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও কর্মস্থলে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ইত্তেফাককে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
 
জানা গেছে, রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে অনেক চিকিত্সক ৫ থেকে ১৬ বছর ধরে অবস্থান করছেন। অনেকে এমবিবিএস থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত হয়েছেন ঢাকায় থাকাকালে। আবার কিছু চিকিৎসকের প্রকৃত কর্মস্থল ঢাকার বাইরে হলেও তারা দীর্ঘদিন যাবৎ ওএসডি (স্বাস্থ্য অধিদফতর) ও রাজধানীর বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সংযুক্তি (অ্যাটাচমেন্ট) নিয়ে ঢাকায় কর্মরত রয়েছেন। তবে সবচেয়ে মজার বিষয়- এরা ঢাকার বাইরে থাকতে না চাইলেও বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার সপ্তাহের এই তিনদিন তারা প্রাইভেট প্রাকটিস করতে ঢাকার বাইরে যান। নানা অজুহাত দেখিয়ে তারা চলে যান। কেউ কেউ নামমাত্র হাজিরা দিয়ে চলে যান। এতে বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার ঢাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক সংকট থাকে।
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নরসিংদী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, টাঙ্গাইল, মুন্সিগঞ্জ, রংপুর, গাজীপুর— এসব এলাকার বেসরকারি ক্লিনিকগুলো চলে ঢাকার ডাক্তারদের দিয়ে। উল্লিখিত এলাকায় ঢাকার চিকিৎসকরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন। তবে বদলি করতে গেলে তারা আবার ওই এলাকায় যেতে চান না। অনেক ক্ষেত্রে কতিপয় বিএমএ ও স্বাচিপের নেতাদের ম্যানেজ করে তারা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় অবস্থান করেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় অবস্থানকারী চিকিত্সকদের অধিকাংশ যখন যে দল আসে সেই দল বনে যান। অনেক ক্ষেত্রে টাকার বিনিময়ে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেন তারা।
 
জানা গেছে, রংপুর মেডিক্যাল কলেজে ৮টি শিক্ষকদের পদ শূন্য। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে ১৬ জন শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এরমধ্যে ২১ জন সহযোগী অধ্যাপক রয়েছেন। কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজে (কুমেক) অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের ১১১টি পদের মধ্যে অর্ধেক অর্থাৎ ৫৫টি পদ শূন্য রয়েছে। অধ্যাপকের ২৪টি পদের মধ্যে ১৩টি, সহযোগী অধ্যাপকের ৩৫টির মধ্যে ১২টি ও সহকারী অধ্যাপকের ৫২টি পদের মধ্যে ৩০টি শূন্য।
 
ঢাকার সরকারি হাসপাতালের চারজন পরিচালক জানান, সাধারণ একটা অপারেশন, যেটা উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে করা সম্ভব। সেই অপারেশন করতে রোগীরা ঢাকায় এসে বসে থাকেন। অপারেশন করাতে গিয়ে দেড় থেকে ২ মাস রোগী ও তাদের স্বজনদের থাকতে হয়। এতে অনেক রোগী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া রোগীর চাপও বাড়ে ঢাকার হাসপাতালে। তবে উপজেলা পর্যায়ে ডাক্তার না পেয়ে তারা ঢাকায় আসতে বাধ্য হন। সরকারি আদেশের পূর্ণ বাস্তবায়ন চেয়ে হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষরা ইত্তেফাককে বলেছে, সরকার সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা এ আদেশের পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে চাই। এ আদেশ যেন লোক দেখানো না হয়।
 
ঢাকার চিকিৎসকদের বাইরে বদলির এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকার বাইরের মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষরা জানান, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে যন্ত্রপাতি কেনা হলেও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ জনবলের অভাবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষক সংকটের কারণে ছাত্র-ছাত্রীরা সুশিক্ষা এবং রোগীরা সুচিকিৎসা কিংবা যথাসময়ে চিকিত্সা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন। ঢাকার বাইরে ৭টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ঢাকা থেকে চিকিৎসকদের বদলির নির্দেশনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। এই নির্দেশনার ফলে ঢাকায় দীর্ঘদিন থাকার চিকিৎসকদের মানসিকতার অবসান ঘটবে।
 
ঢাকার বাইরের মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালসমূহে ছাত্র-ছাত্রী ও রোগীরা উপকৃত হবে। প্রসঙ্গত গত ২১ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে বদলিকৃত চিকিৎসকদের মাত্র এক সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে রাজধানীর বাইরের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করতে ওই ১০৬ চিকিৎসককে বলা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেয়া সময়সীমা ২৭ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে।
 
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি তারা ঢাকার বাইরের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ, জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে নিয়োগকৃত চিকিৎসকদের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে জানতে পারেন, বেতন ভাতা উত্তোলন করলেও শতাধিক চিকিত্সক কর্মস্থলে কাজ করেন না। তারা সকলেই নিজ নিজ কর্মস্থল থেকে নানা প্রভাব খাটিয়ে প্রথমে স্বাস্থ্য অধিদফতরে ওএসডি ও রাজধানীর বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে সংযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন।
 
পাশাপাশি তারা জানতে পারেন রাজধানীর বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে অতিরিক্ত চিকিত্সক চাকরি করছেন। সংযুক্তি নিয়ে কাজ করার ফলে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ, জেলা সদর ও উপজেলা হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ও শিক্ষকের সঙ্কট চলছে। লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে যন্ত্রপাতি কেনা হলেও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ জনবলের অভাবে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না। এসব কারণে দীর্ঘদিন যাবতৎ যারা ওএসডি ও সংযুক্ত হয়ে ঢাকার বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে কাজ করছেন তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে।
 
ইত্তেফাক/মোস্তাফিজ
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩০
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৭
মাগরিব৬:০২
এশা৭:১৫
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৭