রাজধানী | The Daily Ittefaq

মাটির বাগান ইটের ছাদে

মাটির বাগান ইটের ছাদে
শুরুতেই এমন কিছু সবজি নির্বাচন করুন যা খুব সহজেই অল্প পরিশ্রমে চাষ করা যায়। তাই শুরুতে বারমাসি সবজি, শীতকালীন কিছু সবজি, অথবা শাক যেমন পুঁই শাক, ডাঁটা শাক, টমেটো, মুলা, গাজর, লাল শাক মরিচ, ধনে পাতা, পেঁয়াজ, রসুন, মিষ্টি কুমড়া, ইত্যাদি চাষ শুরু করতে পারেন
মুন্না রায়হান১৩ জানুয়ারী, ২০১৮ ইং ০৯:২৬ মিঃ
মাটির বাগান ইটের ছাদে
 
ফুল ভালবাসে না এমন মানুষ কি খুঁজে পাওয়া যাবে? কিংবা টাটকা শাকসবজি, ফল খেতে পছন্দ করে না কে? আর এসবই যদি নিজের বাড়ির ছাদে বা ব্যালকনিতে শোভা পায় তাহলে কেমন হবে? নাগরিক ব্যস্ততার যান্ত্রিক পীড়ন থেকে একটু প্রশান্তি পেতে কিংবা এক টুকরো সবুজ ছোঁয়ার আশায় বাড়ির ছাদ বা বারান্দায় এখন অনেকেই করছেন শখের বাগান। নিজের একটু ইচ্ছা আর সামান্য শ্রম দিলেই কিন্তু আপনার বাড়ির ছাদ হয়ে উঠতে পারে একখণ্ড সবুজের আঙিনা। গ্রামের উর্বর মাটিতে যে ফুল, ফল কিংবা সবজি বাগান আমরা দেখে মুগ্ধ হই, আগ্রহ থাকলে তাকে তুলে আনা সম্ভব শহরের বহুতল ভবনের ছাদেও।  নিজেদের হাতে ফলানো যেতে পারে বিষমুক্ত শাক, সবজি, ফলমূল। এভাবে মেটানো যেতে আমাদের দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদাও।
 
উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে গাছ কাটা হচ্ছে। এতে শুধু আমরা কেন সারা পৃথিবীর মানুষই সমস্যায় পড়বে। কারণ, গাছ ছাড়াতো আমরা বাঁচতে পারবো না। ইতিমধ্যে অনেক প্রাণী পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে পর্যাপ্ত গাছ না থাকার কারণে। কিন্তু জায়গা কোথায় গাছ লাগানোর? এক্ষেত্রে বাড়ির ছাদই হতে পারে গাছ লাগানোর সবচেয়ে ভালো জায়গা।
 
এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকা শহরের প্রায় ৬০ শতাংশ জায়গা কংক্রিটের কাঠামো যা মূলত শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছে। ঢাকার পরিবেশ দূষণ বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় অনেক বেশী। অধিক জনসংখ্যা, অতিরিক্ত নগরায়ন, যানবাহন, জলাধার ও গাছপালা কমে যাওয়াই এর মূল কারণ। ১৯৮৯ সালে ঢাকা শহরের গাছপালার পরিমাণ ছিল ২৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। যা ধীরে ধীরে কমে ১৯৯৯ ও ২০০৯ সালে যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ ও ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ১৯৮৯ সালে ঢাকা শহরের বাৎসরিক গড় তাপমাত্রা ছিল ১৮-২৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস। যা ২০০৯ সালে বেড়ে হয়েছে ২৪-৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াস।
 
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচারাল বোটানি বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পরিবেশ সুরক্ষায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে শহরাঞ্চলে বাড়ির ছাদে বাগান করার বিকল্প নেই। পৃথিবীর অনেক দেশে এখন ছাদে বাগান করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহম্মেদ নিজেও তার বাড়ির ছাদে বাগান করেছেন। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, গাছের অভাবে শহর উত্তপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা শহরেই আমরা যদি কোন উদ্যানে প্রবেশ করি তাহলে সেখানে এক রকম তাপমাত্রা আর সেখান থেকে বের হলে তাপমাত্রা কমপক্ষে ২ থেকে ৩ ডিগ্রী বেশী। এতেই বোঝা যায় আমাদের জন্য গাছ কতটা প্রয়োজনীয়। গাছের অভাবে পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি আমাদের বাড়ির ছাদে গাছ লাগাই তাহলে খুব সহজেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার উদ্যোগে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ২৫০টি ছাদ বাগান করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ছাদ বাগানে ফুল, ফল, শাকসবজি সব কিছু করা সম্ভব বলে তিনি জানান।
 
বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচারাল বোটানি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুব ইসলাম গতকাল ইত্তেফাককে  বলেন, বিভিন্ন প্রকারের ছাদ বাগানকে বিবেচনায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানি বিভাগের ছাদে ছাদ বাগানের একটি মডেল তৈরি করা হয়েছে। যেখানে বাগানের মোট ক্ষেত্রফলের সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ রাস্তা, ১০ শতাংশ বসার জায়গা, ৪০ শতাংশ শাকসবজি, ১০ শতাংশ ফুল ও শোভাবর্ধক গাছ, ২০ শতাংশ ফল, মসলা ও ঔষধি এবং ৫ শতাংশ অন্যান্য গাছের জন্য বিবেচনায় রেখে বাগানের মডেলটি ডিজাইন করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কি ধরনের টেকনোলজি ব্যবহার করে আমরা ছাদ বাগানকে বিজ্ঞানসম্মত ও বাণিজ্যিকভাবে সফল করতে পারি তা নিয়ে কাজ করছি।  যাতে তাজা শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ার পাশাপাশি বাড়তি আয় করা যায়। তিনি বলেন, ছাদ যত ছোটো- বড়ই হোক বাগান করা যাবে। এত ছাদের কোন ক্ষতি হবে না। শুধু দরকার সঠিক পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন। পছন্দের সবজি বাগান করা গেলে অর্গানিক শাকসবজি ও ফলমূল পাওয়া সম্ভব বলে তিনি জানান।
 
ছাদে গাছ লাগানোর পদ্ধতি:বাড়ির ছাদ, বারান্দায় শখের বাগান করতে খুব বেশি প্রস্তুতি বা সময়ের প্রয়োজন নেই। ছাদে বাগান তৈরির সময় মনে রাখতে হবে বাগানের জন্য ছাদের যেন কোন প্রকার ক্ষতি না হয়। হাফ ড্রামের তলদেশে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য এক ইঞ্চি ব্যাসের পাঁচ-ছয়টি ছিদ্র রাখতে হবে। ছিদ্রগুলোর ওপর মাটির টবের ভাঙা টুকরো বসিয়ে দিতে হবে। ড্রামের তলদেশে এক ইঞ্চি পরিমাণ ইটের খোয়া বিছিয়ে তার ওপর বালু দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। সমপরিমাণ দোঁআশ মাটি ও পচা গোবরের মিশ্রণ দিয়ে ড্রামটির দুই-তৃতীয়াংশ ভরার পর হাফ হ্রাম অনুযায়ী ড্রাম প্রতি মিশ্র সার আনুমানিক ৫০-১০০ গ্রাম প্রয়োগ করে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে এবং সম্পূর্ণ ড্রামটি মাটি দিয়ে ভর্তি করে নিতে হবে। ১৫ দিন পর ড্রামের ঠিক মধ্যে ‘মাটির বল’ পরিমাণ গর্ত করে কাঙ্ক্ষিত গাছটি রোপণ করতে হবে। এ সময় চারা গাছটির অতিরিক্ত শিকড়/মরা শিকড়গুলো কেটে ফেলতে হবে এবং খেয়াল রাখতে হবে বলটি যেন ভেঙে না যায়। রোপিত গাছটিকে খুঁটি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে। রোপণের পর গাছের গোড়া ভালোভাবে পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে। এছাড়া আরও বিভিন্ন পদ্ধতিতে ছাদ বাগান করা সম্ভব।
 
কোন ফুল, ফল, সবজি নির্বাচন করবেন: শুরুতেই এমন কিছু সবজি নির্বাচন করুন যা খুব সহজেই অল্প পরিশ্রমে চাষ করা যায়। তাই শুরুতে বারমাসি সবজি, শীতকালীন কিছু সবজি, অথবা শাক যেমন পুঁই শাক, ডাঁটা শাক, টমেটো, মুলা, গাজর, লাল শাক মরিচ, ধনে পাতা, পেঁয়াজ, রসুন, মিষ্টি কুমড়া, ইত্যাদি চাষ শুরু করতে পারেন। এছাড়া প্রায় সব ধরনের ফলই আপনি ছাদ বাড়ানে চাষ করতে পারবেন। আম, আলুবোখরা, দারচিনি, জামরুল, জাম্বুরা, সফেদা, বেল, নীল কৃষ্ণচূড়া, জাপানি চেরি ফল, করমচা, আপেল, গোলমরিচে লেবু, থাইল্যান্ডের জাম, লটকন, লেবু, কলা, পেঁপে, সফেদা, জলপাই, বাতাবি লেবু, চেরি ফল, নাশপাতি, আতা, পেয়ারা, কমলা, মালটা, কামরাঙ্গা, কতবেল, ড্রাগন, মিষ্টি তেঁতুল, বেদেনা ইত্যাদিও চাষ করা যেতে পারে। এছাড়া প্রায় সব ধরনের ফুলের গাছই ছাদ বাগানে চাষ করা সম্ভব।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২২ জানুয়ারী, ২০১৮ ইং
ফজর৫:২৩
যোহর১২:১০
আসর৪:০২
মাগরিব৫:৪১
এশা৬:৫৭
সূর্যোদয় - ৬:৪২সূর্যাস্ত - ০৫:৩৬