রাজধানী | The Daily Ittefaq

রাজধানী ও আশপাশে ইয়াবার কারখানা

রাজধানী ও আশপাশে ইয়াবার কারখানা
ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ
আবুল খায়ের০৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ইং ০০:২৮ মিঃ
রাজধানী ও আশপাশে ইয়াবার কারখানা

ইয়াবা সাম্রজ্য দিন দিন বেড়েই চলছে। গ্রাম-গঞ্জের পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে শহরের ওলি-গলি কোথাও বাদ নেই যেখানে হাত বাড়ালে ইয়াবা মেলে না। দৈনিক ইত্তেফাকের অনুসন্ধানে এমন চিত্র ফুটে উঠেছে, যা ইত্তেফাকে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে হাসপাতালেও মাদক বেচা-কেনা হচ্ছে। অর্থাত্ চিকিত্সা সেবার চেয়ে বেশি লাভবান ব্যবসা। এ কারণে এক শ্রেণির বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়গনিস্টিক ও হাসপাতালের মালিক মাদকের ব্যবসা বেছে নিছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল সন্ধ্যায় মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ধানমন্ডি ৫/এ মেডিনোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে ইয়াবা, ফেন্সিডিলসহ বিপুল পরিমাণ মাদক দ্রব্য জব্দ করেছে।  

এবার অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে নতুন তথ্য। এতোদিন মানুষ জানতো মিয়ানমার থেকে চোরাই পথে দেশে ইয়াবা আসে। তবে আশ্চর্য হওয়ার বিষয় হলো, খোদ রাজধানী ও আশেপাশের এলাকায় তৈরি হচ্ছে মরন নেশা ইয়াবা। আর অনভিজ্ঞদের দ্বারাই তৈরি হচ্ছে এসব। যারা তৈরি করছে তারাও জানে না এর ভয়াভহতা। এসব ইয়াবা সেবন করে মৃত্যুর ঝুঁকি আরো বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইয়াবা তৈরির মূল উপাদান মিথাইল অ্যামফিটামিন এবং ক্যাফেইন। একটি ট্যাবলেটে ৩০ থেকে ৩৫ মাত্রার মিথাইল অ্যামফিটামিন এবং বাকিটা ক্যাফেইন। তবে দেশে আটক বেশিরভাগ ইয়াবার ক্ষেত্রে সে পরিমাণ উপাদানের উপস্থিতি নেই। এসবের সাথে নানা ক্ষতিকর কেমিক্যাল ও বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির তৈরি ঘুমের ট্যাবলেট মিশানো হচ্ছে যেগুলো মৃত্যুর ঝুঁকি আরো বাড়ায়। অন্যদিকে যৌন উত্তেজনা বাড়াতে এসবের সাথে মিশানো হচ্ছে ভায়াগ্রাসহ নানা যৌন উত্তেজক ট্যাবলেটের গুড়ো। ইয়াবার মতো ভয়ঙ্কর মাদক তৈরির উপাদান আমদানির ওপর কড়া নজরদারি করা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, বিদেশ থেকে আসা ইয়াবার চেয়ে দেশে তৈরি ইয়াবায় বেশি নেশা হয়। ফলে মাদকাসক্তরা দেশে তৈরি ইয়াবার প্রতি আকৃষ্ট বেশি। কম দামে পেয়ে আসক্তরা দেশে তৈরি ইয়াবা বেশি কেনে। অন্যদিকে একটি চক্র রাজধানীতে নকল ইয়াবাও তৈরি করছে। বাজার থেকে ইয়াবার আকারে নানা ধরনের ট্যাবলেট কিনে তাতে রঙ আর ইয়াবার গন্ধ মিশিয়ে তা বিক্রি হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য, বিশেষজ্ঞ ও মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে চিকিত্সারত ইয়াবাসক্তদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, রাজধানী পুরান ঢাকা, শ্যামপুর, সূত্রপুর এলাকায় বুড়িগঙ্গার তীরে, সোয়ারিঘাট এলাকায়, লালবাগ, উত্তরা, দক্ষিণখান, কেরানিগঞ্জ, সাভার, টঙ্গি, নারায়নগঞ্জের বন্দর, ফতুল্লা ও সিদ্দিরগঞ্জ এলাকায় ১৪ থেকে ১৫ টি ইয়াবা কারখানা আছে। এসব এলাকায় ছোট  জায়গায় কিংবা একটি কক্ষে কারখানা স্থাপন করা হয়। বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরির আড়ালে তৈরি হয় ইয়াবা। যাতে সহজে লোকজনের চোখে না পড়ে।

নারায়নগঞ্জ বন্দরের হরিপুর এলাকায় ইয়াবা তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়ে ইয়াবা ট্যাবলেট তৈরির ৩টি মেশিন, ২’শ পিছ ইয়াবা তৈরির কেমিক্যাল, সিসি ক্যামেরা, ১ টি মনিটরসহ  ইয়াবা তৈরির কারিগর ও কারখানার মালিক মাদক সম্রাজ্ঞী লাকি আক্তারকে (৩২) মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের ইন্সপেক্টর জমিজ উদ্দিনের নেতুত্বে গ্রেফতার করা হয়।

বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হওয়া নকল ইয়াবা কারখানার মালিকরা জানান, সোডিয়াম বেনজোয়েট, ক্যাফেইন ও ভেনিলার পাউডার মিশিয়ে তারা নকল ইয়াবা তৈরি করেন। অনেক সময় ছোট আকারের ওষুধ কোম্পানি থেকে ইয়াবা সাইজের ট্যাবলেট তৈরি করিয়ে সে সব ট্যাবলেটে শুধু ইয়াবার ফ্লেভার (গন্ধ) মিশিয়ে তা ইয়াবা আকারে বিক্রি করা হয়। অবৈধ পণ্য হওয়ায় তা যাচাইয়ের সুযোগ না থাকায় ইয়াবা হিসেবে তা গ্রহণ করছে মাদকসেবীরা। ইয়াবার চাহিদা থাকার কারণে এক শ্রেণির প্রতারক দেশেই কারখানা খুলে ইয়াবা তৈরি করছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীসহ সারা দেশে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়া ইয়াবা নিয়ন্ত্রনে সরকারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম চোখে পড়ে না। প্রতিষ্ঠানটি নির্দিষ্ট দিবসকে কেন্দ্র কিছু কার্যক্রম চালালেও মাদক নিয়ন্ত্রনে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নেই বললেই চলে। এই প্রতিনিধি অতি সমপ্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরে গিয়ে কার্যক্রম দেখেছেন। এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেই বসলেন, ভাই অভিযান চালিয়ে কি হবে। দেশ ভাসছে ইয়াবায়। আমরা হাবুডুবু খাচ্ছি।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সারাদেশে ভয়ঙ্কর মাদক ইয়াবার ছোবল দিন দিন যেভাবে বাড়ছে, এখন যদি লাগাম টেনে না ধরা যায় তাহলে ভয়াভয় অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। কারণ তরুণ, যুব সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ ইয়াবা সেবন করছে। এর মধ্যে শিক্ষিত-অশিক্ষিত কোন ভেদাভেদ নেই। শিক্ষিত সমাজের মধ্যে রয়েছে স্কুল, কলেজ ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, মেডিক্যাল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের তথ্য মতে, এই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৫০ ভাগ ছাত্র-ছাত্রী ইয়াবায় আসক্ত। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ব্যাপকভাবে কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দিন দাবি করেছেন, তারা মাদক নিয়ন্ত্রনে জিরো টলারেন্স নীতিতে কার্যক্রম চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, ইয়াবার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনার পর আমরা সারা দেশে ব্যাপকভাবে কার্যক্রম শুরু করেছি।

ইত্তেফাক/নূহু

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৬
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৩
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬