রাজধানী | The Daily Ittefaq

মাঠে সাবের-আব্বাস

মাঠে সাবের-আব্বাস
জাপার প্রার্থী হতে পারেন অধ্যাপক দেলোয়ার
শামছুদ্দীন আহমেদ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ইং ০০:২৩ মিঃ
মাঠে সাবের-আব্বাস

দেশের অন্যান্য সংসদীয় আসনের মতো রাজধানী ঢাকার অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা খিলগাঁও-সবুজবাগ-মুগদা-বাসাবো-নাসিরাবাদ-মান্ডা-দক্ষিণগাঁও-মানিকনগর নিয়ে গঠিত ঢাকা-৯ আসনেও একাদশ সংসদ নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক নানামুখী তত্পরতা শুরু করে দিয়েছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা, বাড়িয়েছেন জনসংযোগ। অলিগলি, ফুটপাত, চা দোকান, হাট-বাজার, বিপণিবিতান, রিকশা-অটোরিকশা স্ট্যান্ড এবং পাড়া-মহল্লায় গড়ে ওঠা নানা নামের ক্লাব-সমিতি-সোসাইটি থেকে শুরু করে স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালতেও আড্ডা-আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে আগামী জাতীয় নির্বাচন।

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ও নানা বয়সের এ সব লোকজনের আলোচনায় কান পেতে মাঠের তরতাজা অনেক তথ্য জানা গেল। এলাকার আওয়ামী লীগ দলীয় বর্তমান সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী সম্পর্কে বেশিরভাগ লোকের মন্তব্য- ব্যক্তি সাবেরকে নিয়ে মোটাদাগে কোনো অভিযোগ নেই, তার পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিও প্রায় প্রশ্নাতীত। এলাকায় উন্নয়ন কাজেরও কমতি নেই। তবে সিংহভাগ মানুষেরই অভিন্ন কথা— এলাকায় সাবেরের দেখা মেলা ভার। ভোটার বা এলাকার অন্যরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনে এমপির দেখা পান না। নির্বাচনী আসনে বসবাস না করে সাবের চৌধুরীর বাসা পরীবাগে হওয়ায় এ সমস্যা আরো প্রকট হয়েছে। মুগদার স্থানীয় লোকমান হোসেন যিনি নিজেও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমর্থক তার মন্তব্য, ‘মানুষ ভালো, ব্যক্তিত্ববান; কিন্তু দরকার হলে দেখা পাওয়া মুশকিল।’

এলাকার ভোটারদের এমন অভিযোগ অকপটে স্বীকার করলেন সাবের হোসেন চৌধুরীও। গতকাল বুধবার ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘স্বীকার করি আমার সাথে তাদের দেখা-সাক্ষাত্ কম হয়েছে। এ জন্য আমি দুঃখিত। এর একটি বড় কারণ ছিল আমি আইপিইউ’র (ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন) প্রেসিডেন্ট ছিলাম, সে কারণে অন্যত্র ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। তবে এখন আর সেরকম হচ্ছে না, যতটুকু পারছি এলাকার মানুষজনকে সময় দিচ্ছি। ফেসবুক, টুইটার ও মোবাইল ফোনেও সার্বক্ষণিক আমার সঙ্গে ভোটারদের যোগাযোগ আছে। এ ছাড়া পুরো এলাকার উন্নয়ন কাজসহ নানা সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেয়ার জন্য আমি এলাকাভিত্তিক কয়েকটি কমিটি ও কার্যালয় করে দিয়েছি। কাজেই কোনো কাজ কিন্তু আটকে নেই।’

সাবের চৌধুরীর ওপরই ভরসা আওয়ামী লীগের: সাবের চৌধুরী সম্পর্কে ভোটারদের মন্তব্য যাই থাকুক না কেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কথা বলে আভাস মিলেছে, আগামীতেও সাবেরেই ভরসা রাখতে চায় দলটি। বিএনপিসহ সব দল নির্বাচনে এলে প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীকে মোকাবিলায় সাবের চৌধুরীর বিকল্প আপাতত দেখছে না আওয়ামী লীগ।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাবের হোসেন চৌধুরী, এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দ্বিতীয়বার এমপি হন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপিবিহীন ভোটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হন। তিনি উপমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাসের কাছে তিনি পরাজিত হন। এ দিকে সাবের হোসেন চৌধুরী ছাড়াও এই আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন সরকার পলাশ মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।

সক্রিয় মির্জা আব্বাস: একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে ঢাকা-৯ আসনে দলের মনোনয়ন চাইবেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। সর্বশেষ তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ২০০১ সালের নির্বাচনে। বিএনপি সরকারের তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ছিলেন। আইনি জটিলতার কারণে ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে তিনি অংশ নিতে পারেননি। যার কারণে ওই বছর নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসনে বিএনপির টিকিটে লড়েছিলেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এবং বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের মাঠে দেখা যাবে ঢাকার রাজনীতির এই দাপুটে খেলোয়াড়কে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি নির্বাচনে গেলে ঢাকা-৯ আসনের পাশাপাশি ঢাকা-৮ আসনেও দলের মনোনয়ন চাইবেন মির্জা আব্বাস। মতিঝিল ও রমনার একাংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-৮ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ওয়ার্কার্স পার্টি সভাপতি ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মির্জা আব্বাস নির্বাচন করতে না পারায় ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন সাবেক ছাত্রনেতা ও বর্তমানে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেল। উল্লেখ্য, ঢাকা ৮ ও ঢাকা-৯ এই দুটি আসন মিলে আগে একটি আসন ছিল (প্রাক্তন ঢাকা-৬)। সেনা সমর্থিত ১/১১-এর সরকারের সময় ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে এটিকে ভেঙে দুটি আসন করা হয়। মির্জা আব্বাস সর্বশেষ সেই অখণ্ড আসনেরই সংসদ সদস্য ছিলেন।

এ ব্যাপারে মির্জা আব্বাস ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘যেহেতু আগে একটি আসন ছিল এবং আমি সেটির এমপি ছিলাম সেই কারণে স্বভাবতই আমি বর্তমান দুটি আসন থেকেই দলের মনোনয়ন চাইবো।’

নির্বাচনে আসতে পারেন আফরোজা আব্বাস:ঢাকা-৯ আসনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে অনেকের সঙ্গে কথা বলে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেল যে, কোনো কারণে বিএনপি দুই আসনে মির্জা আব্বাসকে মনোনয়ন দিতে না চাইলে সেক্ষেত্রে একটি আসনে আব্বাসকে এবং অপরটিতে তার স্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাসকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা জানান, এক্ষেত্রে মির্জা আব্বাসেরও সায় থাকবে। আবার দুটি আসনেই যদি আব্বাস নির্বাচন করেন এবং জয়ী হন তাহলেও পরবর্তীতে উপ-নির্বাচনে তিনি একটি আসন স্ত্রী আফরোজাকে ছেড়ে দেবেন।

ঢাকা-৯ আসনের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ও মত-পথের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতা মির্জা আব্বাসের প্রতি এক ধরনের বাড়তি দরদ রয়েছে এলাকার ভোটারদের। এর সবচেয়ে বড় কারণ তিনি জন্ম থেকেই এই এলাকায়, তার পৈত্রিক বাড়িও এখানে, এলাকায় রয়েছে আত্মীয়-স্বজনের লম্বা চেইন। সেই সুবাদে স্থানীয়দের একাংশের মত, ‘আব্বাস এলাকার ছেলে। সংসদ সদস্য কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকুন আর না থাকুন- প্রয়োজনে আব্বাসকে কাছে পেতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না।’

মির্জা আব্বাসের প্রতি স্থানীয়দের এই দরদকে নিজের কাজ দিয়ে আরও গাঢ় করে তুলেছেন আফরোজা আব্বাস। আরও অনেক আগে থেকেই স্থানীয়দের কাছে আফরোজা পরিচিত হয়ে উঠলেও সারাদেশব্যাপী ফোকাসে আসেন ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির হয়ে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মাধ্যমে। বর্তমানে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভানেত্রী হওয়ায় আলোচিত জাতীয় রাজনীতিতেও। এর আগেও স্বামী আব্বাস যখনই নির্বাচন করেছেন তখনও ভোটারদের দ্বারে-দ্বারে গেছেন তিনি। মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা ও বিনয়ী আচরণ আফরোজাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র অবস্থান।

জাপার প্রার্থী হতে পারেন অধ্যাপক দেলোয়ার :আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে ঢাকা-৯ আসনে আগামীতে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান।  দলমত, বয়স ও শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে এলাকায় তিনি পরিচিত ‘দেলোয়ার ভাই’ হিসেবে। স্থানীয় ভোটারদের কয়েকজন জানান, অধ্যাপক দেলোয়ার জাপার রাজনীতি করলেও সব দলের লোকজনের কাছেই তার মোটামুটি গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।  তিনি সাধ্যমতো মানুষকে সহযোগিতা করেন। অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘দল মনোনয়ন দিলে আমি ঢাকা-৯ আসনে নির্বাচন করবো।’

এলাকার বড় সমস্যা মাদক:ঢাকা-৯ আসনের আওতাভুক্ত অনেক এলাকা বেশ ঘনবসতিপূর্ণ ও ঘিঞ্জি। এলাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন মাদক। হাত বাড়ালেই ইয়াবা-গাঁজা-ফেনসিডিলসহ নানা ধরনের মাদক মেলে। বলতে গেলে এলাকাটি মাদকে ধুঁকছে। কিছু এলাকায় কয়েকটি রাস্তা অপ্রশস্ত হওয়ায় রিকশাজটও ভোগাচ্ছে স্থানীয়দের।

আসনটি খোদ রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে হলেও নাসিরাবাদে মানুষকে এখনও পারাপার হতে হয় বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়ে। এই এলাকায় তেমন রাস্তা-ঘাটও নেই। বর্ষাকালে ডুবে যায় রাস্তাঘাট ও অলি-গলি। বৌদ্ধমন্দির থেকে মানিকদা এলাকায় প্রায় পাঁচ লাখ লোকের বসবাস হলেও এলাকার রাস্তা-ঘাট সরু। এছাড়া বাসাবো থেকে নন্দিপাড়া রাস্তাটির উন্নয়নকাজ চলছে বহুদিন ধরে, প্রায় চার মাস রাস্তাটি বন্ধ থাকায় স্থানীয়দের দুর্ভোগ চরমে। দক্ষিণগাঁও এলাকায়ও রাস্তার সংকটে হাঁটা দুষ্কর।

এসব ব্যাপারে স্থানীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘নাসিরাবাদ আগে ইউনিয়ন ছিল, এখন সিটি করপোরেশনভুক্ত হয়েছে। রাস্তা-ঘাটসহ এই এলাকার সার্বিক উন্নয়নে ৮০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই কাজ শুরু হবে।’ আর মাদকের বিষয়ে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমাদের নীতি জিরো টলারেন্স। এ ব্যাপারে এলাকার প্রতিটি থানাকে আমি বলে রেখেছি যেন কাউকে কোনো ছাড় না দেওয়া হয়।

ইত্তেফাক/নূহু

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩৪
যোহর১১:৫১
আসর৪:১১
মাগরিব৫:৫৪
এশা৭:০৭
সূর্যোদয় - ৫:৪৮সূর্যাস্ত - ০৫:৪৯