রাজধানী | The Daily Ittefaq

৩২ নম্বরে মন্ত্রী-এমপিসহ শতাধিক মানুষ হত্যার পরিকল্পনা

৩২ নম্বরে মন্ত্রী-এমপিসহ শতাধিক মানুষ হত্যার পরিকল্পনা
আদালতে এক জঙ্গির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
আবুল খায়ের২২ মার্চ, ২০১৮ ইং ২৩:১৩ মিঃ
৩২ নম্বরে মন্ত্রী-এমপিসহ শতাধিক মানুষ হত্যার পরিকল্পনা

‘১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে মন্ত্রী-এমপিসহ শতাধিক মানুষের হত্যার পরিকল্পনা করেছিল জঙ্গিরা। বড় আকারের একটি বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এ হত্যাযজ্ঞ চালানোর টার্গেট ছিল। বোমা তৈরিও হয়েছিল। এমনকি নব্য জেএমবির আত্মঘাতী দলের সদস্য সাইফুলের হাতে ওই বোমা পৌঁছে দেওয়া হয়।’ রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিও-তে বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্তে গ্রেফতারকৃত এক জঙ্গির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ তথ্য উঠে এসেছে। এ ব্যাপারে আদালতে চার্জশিট দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এসব জঙ্গি গ্রেফতারে জড়িত একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ইত্তেফাককে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুদের প্ররোচনায় মানবতার দুশমনরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাসভবনে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হলেও সেদিন দেশে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা। প্রতি বছর ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু ভবনে আসেন এবং আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই শোকাবহ দিনে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা করে জঙ্গিরা। চেয়েছিল, যে কোন উপায়ে অনেক মন্ত্রী-এমপিদের এক সাথে হত্যা করে তাদের শক্তি জানান দিতে। তবে হামলার আগেই ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম-সিটিটিসি’র অভিযানে পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালের একটি কক্ষে নিজেই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হয় জঙ্গি সাইফুল। সিটিটিসি ইউনিট এই ঘটনায় বোমা তৈরির কারিগর এবং অর্থ সরবরাহকারীসহ ১০ জনকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃত মধ্যে আট জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তবে সর্বশেষ মোহাম্মদ তাজুল ওরফে ছোটন নামে এক জঙ্গিকে গত শুক্রবার গ্রেফতারের পর তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে সিটিটিসি। আর এসব জঙ্গিদের কাছ থেকে সেই নির্মমতার পরিকল্পনার ছকের চিত্র উঠে আসছে। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত জঙ্গিরা জানিয়েছে, ৩২ নম্বর পর্যন্ত না যেতে পারলেও রাসেল স্কয়ার পর্যন্ত গিয়ে আত্মঘাতি হামলা চালালেও তারা সফল হতো।

এ ঘটনায় রাজধানীর কলাবাগান থানায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে। এ মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সিটিটিসি’র একজন কর্মকর্তা জানান, ‘আমরা এই ঘটনার পুরো রহস্য উদ্ঘাটন করার চেষ্টা করছি। কারা, কেন এবং কী উদ্দেশ্যে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিল, তা আস্তে আস্তে বের হয়ে আসছে। এমনকি কারা অর্থ সরবরাহ করেছিল, তাও জানা গেছে। খুব শিগগিরই চাঞ্চল্যকর এই বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর চার্জশিট দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।’

পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সিটিটিসি ঘটনার দিন ১৫ আগস্ট সকালে রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল ঘেরাও করে রাখে। ওই হোটেলের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে আত্মঘাতী এক জঙ্গি অবস্থান করছে-এমন গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ঘেরাও করা হয়। পরে সিটিটিসি’র সোয়াট টিমের সদস্যরা অভিযান চালাতে গেলে আত্মঘাতী জঙ্গি দলের সদস্য সাইফুল ইসলাম নিজের কাছে থাকা বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়।

সিটিটিসি’র তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০১৬ সালে হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর পুলিশের জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রম জোরালো হয়। ধারাবাহিক অভিযানে কোনঠাসা হয়ে পড়ে নব্য জেএমবি। তাই তারা ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বড় হামলার প্রস্তুতি হিসেবে ১৫ আগস্টের জাতীয় শোক দিবসকে বেছে নিয়েছিল। যাতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রী-এমপিসহ শতাধিক মানুষকে একসঙ্গে হত্যা করা যায়। তাদের টার্গেট ছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে অংশ। অপরদিকে সিটিটিসি’র কর্মকর্তারা গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ, আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তি এবং গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে ইত্তেফাককে জানান, আত্মঘাতী জঙ্গি সদস্য সাইফুল পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তিন দিন আগে খুলনা থেকে ঢাকায় আসে। মিরপুরে এক বন্ধুর মেসে একরাত ছিল। পরদিন বোমাসহ হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে ওঠে। সেখান থেকে ১৫ আগস্ট সকালে ব্যাগ নিয়ে  ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যাওয়ার কথা ছিল তার। হামলা চালিয়ে শহীদ হওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিল সাইফুল।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, ১৫ আগস্ট শোক দিবসে ভয়াবহ এই হামলার পরিকল্পনাটা ছিল আকরাম হোসেন নিলয় নামে এক শীর্ষ জঙ্গির। এদিকে পান্থপথে বোমা হামলার অর্থের যোগানদাতা আকরাম হোসেন খান নিলয় (২৪) নামে জেএমবি’র আরেক সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। তার সঙ্গে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় অস্ত্র সরবরাহকারী জেএমবি’র হাদিসুর রহমান সাগর গ্রেফতার হয়েছেন। নিলয় গ্রেফতার হওয়ায় পান্থপথের বিস্ফোরণসহ নব্য জেএমবির আরও অনেক অজানা তথ্য জানা যাবে বলে সিটিটিসি’র কর্মকর্তারা জানান। গত বধুবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে বগুড়ার শিবগঞ্জ থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) উপ-কমিশনার মহিবুল ইসলাম খান। তাদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল উদ্ধার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে হাদিসুর রহমান সাগর (৩৬) জয়পুরহাটের সদর থানার কয়রাপাড়া পলিকাদোয়া গ্রামের হারুন অর রশিদের ছেলে এবং আকরাম হোসেন খান নিলয় কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থানার চারিগ্রামের আবু তোরাব খানের ছেলে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে হাদিসুর রহমান সাগর গুলশান হলি আর্টিজান হামলার অন্যতম সমন্বয়ক ও অস্ত্রের যোগানদাতা। সাগরকে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে।  আকরাম হোসেন খান নিলয় (২৪) জেএমবি’র মূল সমন্বয়ক ও অর্থদাতা। এছাড়া গত বছরের ১৫ আগস্ট রাজধানীর পান্থপথে জাতীয় শোক দিবসের র্যালিতে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে নিলয়ের নাম তদন্তে উঠে এসেছে। সাগর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। পান্থপথের ঘটনা ও হলি আর্টিজানের ঘটনা আলাদা জঙ্গি গ্রুপ কর্তৃক হলেও তাদের দর্শন এক।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলেন, এর আগে বগুড়া ও চাপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সাগরের অবস্থান রয়েছে- এমন তথ্য থেকে কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এরই সূত্র ধরে গত বছরের অক্টোবর মাসে যশোরের পাগলাদহ মালোপাড়ার একটি বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করে সাগরের স্ত্রী খাদিজা আক্তারকে গ্রেফতার করা। খাদিজার কাছ থেকেই সাগরের সম্ভাব্য অবস্থান জানতে পেরেছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা। সিটিটিসি সূত্রে আরও জানা যায়, গ্রেফতার হওয়া নিলয় জেএমবির অন্যতম শীর্ষ একজন অর্থদাতা। গুলশান হামলার পর থেকে জেএমবিকে সংগঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছিলো সে। সংগঠনে সে  ‘সে­ড উইলসন’ এবং ‘জ্যাক স্পেরো’ নামেও পরিচিত ছিল। এর আগে গত বছরের নভেম্বর মাসে নিলয়ের বাবা আবু তোরাব এবং মা ও বোনকে  গ্রেফতার করে সিটিটিসি। বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছেন। নিলয় ও তার পরিবারকে হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে বিস্ফোরণের অর্থের জোগানদাতা হিসাবে শনাক্ত করা হয়েছিল।

সিটিটিসির আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, জাতীয় শোক দিবসে হামলার জন্য যে বোমাটি আনা হয়েছিল, সেটি তৈরি করেছিল নব্য জেএমবির বোমা তৈরির কারিগর মামুন। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর উত্তরা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে সিটিটিসি। মামুনকে বোমা তৈরির উপকরণ সরবরাহ এবং আশ্রয় দিয়েছিল আইচান কবিরাজ ওরফে রফিক এবং লুলু সরদার নামে দুই জঙ্গি।

ইত্তেফাক/নূহু

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩০
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৭
মাগরিব৬:০২
এশা৭:১৫
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৭