রাজধানী | The Daily Ittefaq

সড়কে নৃশংসতার মূলে চালকদের মাদকাসক্তি

সড়কে নৃশংসতার মূলে চালকদের মাদকাসক্তি
আবুল খায়ের১৯ মে, ২০১৮ ইং ০১:২০ মিঃ
সড়কে নৃশংসতার মূলে চালকদের মাদকাসক্তি

সড়কে নৃশংসতার মূলক কারণ চালকদের মাদকাসক্তি। নেশার ঘোরে বেপরোয়া বাস চালান অধিকাংশ বাসচালক। ফলে সড়কে নৃশংসতার ঘটনা ঘটছে, বাস চাপায় অহরহ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। হাত-পা বিচ্ছিনের ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু চালকরা মাসকাসক্ত থাকায় তাদের মনুষ্যত্ববোধ নেই। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীতে প্রায় ৫ হাজার চালক রয়েছেন। এরমধ্যে টেম্পো, বাস ও ট্রাক চালক আছে। অধিকাংশ চালক মাদকাসক্ত হওয়ায় তার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছেন না। আর কোনোভাবে থামানো যাচ্ছে না বাসের অসম প্রতিযোগিতা। প্রতিদিন ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা স্টিয়ারিং ধরে বসে থাকার শক্তি জোগাতে ইয়াবা ও গাজা সেবন করেন অধিকাংশ বাসচালক। বিষয়টি ওপেন-সিক্রেট হলেও প্রতিরোধ বা প্রতিকারের কোনো উদ্যোগ নেই। সম্প্রতি ঢাকায় বেশ কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনায় হাত-পা বিচ্ছিন্ন হওয়াসহ মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠেছে।

গত বুধবার রাজধানীতে এক বাইক চালক নাজিম উদ্দিনের বুকের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে গেছে এক বাস চালক। ঘটনাস্থলে নাজিম নিহত হন। এর আগে যাত্রীবাহী দুই বাসের রেষারেষিতে হাত হারান তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজীব হোসেন। টানা দুই সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে অবশেষে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। রাজীব হোসেনের করুণ মৃত্যু সবাইকে নাড়া দিলেও মৃত্যু মিছিল থামেনি বরং বেড়েই চলেছে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই বেপরোয়া এক যাত্রীবাহী বাসের চাপায় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় গৃহকর্মী রোজিনার পা। ২০ এপ্রিল রাতে বিআরটিসির দোতলা বাসের চাপায় ডান পা হারানো গৃহকর্মী রোজিনা আক্তার মারা যান ২৯ এপ্রিল। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সকাল সকাল রাজপথে নেমেছিলেন লালবাগ জোনের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. দেলোয়ার হোসেন। ট্রাফিক আইন অমান্য করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি বাস উল্টো পথে চলছিল। বাসটি থামানোর পর পুলিশের সঙ্গে উল্টো তর্কে জড়ান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বাসচালক ও হেলপার। একপর্যায়ে চালক বেপরোয়া হয়ে বাসটি চালাতে থাকেন। এ সময় বাসের চাকায় পিষ্ট হয় ট্রাফিক ইন্সপেক্টর দেলোয়ারের পা। বৃহস্পতিবার রাতে মারা গেলেন কমিউনিটি পুলিশের সদস্য আলাউদ্দিন সুমন। আলাউদ্দিন ১২ মে হানিফ ফ্লাইওভারে দায়িত্ব পালন করছিলেন। যাত্রাবাড়ী থেকে ছেড়ে আসা তারাবো পরিবহনের একটি বাস তাকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। বাসের চাকা তার বাঁ পায়ের ওপর দিয়ে চলে যায়। একটি রেন্ট-এ-কার কোম্পানির গাড়িচালক রাসেল সরকার এখনো যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন অ্যাপোলো হাসপাতালে। হানিফ ফ্লাইওভারের যাত্রাবাড়ীতে গ্রিন লাইন পরিবহনের একটি বাস তার গাড়িকে ধাক্কা দেয়। এ নিয়ে বাসের চালক ও রাসেলের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। এ সময় গ্রিন লাইন পরিবহনের চালক বাস চালানো শুরু করেন। তখন রাসেল সরতে গেলে ফ্লাইওভারের রেলিংয়ে আটকে পড়েন। তার পায়ের ওপর দিয়েই বাস চলে যায়। এতে তার বাঁ পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ৫ এপ্রিল সকালে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় বিকাশ পরিবহনের দুটি বাস পাল্লা দিয়ে চলছিল। আয়েশা খাতুন তার ছয় বছর বয়সী মেয়েসহ ওই দুই বাসের মধ্যে চাপা পড়েন। রিকশাচালক ও আয়েশা খাতুনের মেয়ে অক্ষত থাকলেও আয়েশা খাতুনের মেরুদন্ড ভেঙে যায়। তিনি সাভারের সিআরপিতে চিকিত্সাধীন। সড়কে এমন নৃশংসতার বহু নজির রয়েছে।

মহাসড়কে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি আশঙ্কজনকভাবে বেড়ে চলেছে। এই দুর্ঘটনার বেশিরভাগ কারণ হচ্ছে চালকরা মাসকাসক্ত। মনোরোগ বিজ্ঞানীরাও একই মতামত প্রকাশ করেছেন।

মিরপুর, গুলিস্তান ও মোহাম্মদপুর এলাকার টেম্পো, বাস ও ট্রাক চালান এমন তিন জন সম্প্রতি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি হয়েছেন। ওই তিন চালক ছামাদ, রানা ও নুর হোসেন ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে জানান, সড়কে গাড়ি চালাতে মাদকাসক্ত হওয়া যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গাড়ির মালিকরাই তাদের ইয়াবায় আসক্ত বানায়। সুস্থ হয়ে ওঠা এক টেম্পো চালক তার মালিককে বলেন, আমাকে মাদকাসক্ত বানালেন কেন? মালিকের সাফ জবাব, ইয়াবা এমন জিনিস, খেলে আর কোথাও যেতে পারবি না। গাড়ি তোকে চালাতেই হবে। কিছু কিছু মালিক চালকদের দিয়ে ইয়াবা পাচার করেন। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফ এলাকা থেকে এক শ্রেণীর নাইট কোচ, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চালক মাদকের চালান ঢাকায় নিয়ে আসে। টেকনাফ থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে ১৪টি পয়েন্টে পুলিশকে উেকাচ দিতে হয়। চালকরা বলেন, একটা চালান আনলে তারা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যে টাকা পায়, তা ৫/৭ দিন গাড়ি চালানোর চেয়ে অনেক বেশি। এ জন্য চালকরা ঢাকায় মাদক পাচারে জড়িয়ে পড়ছে। এই মাদক পাচার করতে গিয়ে নিজেও আসক্ত হয়ে পড়ছে। অনেক মাদক ব্যবসায়ী কৌশলে নাইট কোচ, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের চালকদের আসক্ত বানিয়েছে। আর অন্য এলাকায় চালকরা ঢাকা থেকে মাদক নিয়ে যান। এভাবে সারাদেশে ইয়াবাসহ মাদক পাচার হচ্ছে। আর ঢাকার মধ্যে টেম্পো চালকরা এক জাগয়া থেকে অন্য জায়গায় মাদক পাচার করছে। ওই তিন চালক বলেন, আমরা এখন বৌ-বাচ্চাদের খেতে দিতে পারি না। গাড়ি চালিয়ে যে টাকা আয় করি মাদকের পিছনে ব্যয় হয়ে যায়। এ জীবন থেকে তারা সুস্থ জীবনে বাঁচতে চায়।  অন্যদিকে ট্রাক চালকদের ৩/৪ দিন সড়কে থাকতে হয়। এ কারণে তারা বেশি করে ইয়াবায় আসক্ত।

জানা গেছে, ঢাকায় গণপরিবহনের ৮০ ভাগ চালক ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবহন শ্রমিকরা নানা রকম চাপের মধ্যে থেকে গাড়ি চালান, এবং এর সাথে ইয়াবা গ্রহণ যোগ হয়ে নৃশংস দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারের দুই জন শিক্ষক জানান, ‘একজন চালক যদি ইয়াবা সেবন করে গাড়ি চালায় তাহলে সে নিজেকে খুব অ্যাক্টিভ বোধ করবে। সে নিজেকে অতি আত্মবিশ্বাসী বোধ করবে। এর ফলে সে বিপদজনকভাবে অন্য গাড়িকে ওভারটেক করতে পারে। রাস্তার ঝুঁকিগুলোকে তার ঝুঁকি মনে না-ও হতে পারে। তার পারসেপশন রিয়্যাকশন টাইমটা বেড়ে যাবে। অর্থাত্ একটা ঝুঁকি দেখার পর তার প্রতিক্রিয়া হবে একটু দেরিতে - দেখা যাবে ব্রেক চাপছে বা গাড়িটা কন্ট্রোল করছে একটু দেরিতে।’

অনেকে অভিযোগ করেন, এদেশে চালকদের কোন নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা বা নিয়োগ পদ্ধতি না থাকায় যে যত বেশি ট্রিপ নিতে পারে সেটাই তাদের লাভ। এটাই অনেক ক্ষেত্রে তাদের ইয়াবাসহ নানা মাদক সেবনের প্রধান কারণ। চালকদের কর্মঘন্টা একটা নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কর্মকর্তারা বলেন, ‘ইউরোপ, আমেরিকার কর্মঘন্টার সাথে যদি আপনি বাংলাদেশের পরিবহন সেক্টরকে মেলাতে যান, তাহলে সেটাতো আপনি পারবেন না। একটি বাস বা ট্রাক উত্তরবঙ্গে যেতে গেলে কত ঘণ্টা লাগে? সেখানে কি কর্মঘন্টা ঠিক রাখা সম্ভব? তারা বলেন, মাদকাসক্ত চালকদের কাউন্সেলিং করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বাস মালিক ও সাধারণ মানুষ সকলের সমন্বয়ে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কাজ করলে সুফল পাওয়া যাবে। মালিক সমিতির পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়েছে, অনেক চালকই মাদকাসক্ত। তারা বলেন, চালকদের নেশা পথ থেকে ফেরাতে হবে। চালকদের কোনো জবাবদিহি নেই। তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী জানান, চালকদের মধ্যে মাদকাসক্ত আছে এটা আমরা জানি। তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি এবং বাংলাদেশ ট্রাক-কার্ভার্ডভ্যান মালিক সমিতি যৌথ উদ্যোগে কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু করেছি।

ট্রাফিক পুলিশ বিভাগ বলছে, চালক যদি ইয়াবা সেবন করে সেটা দ্রুত সনাক্ত করার জন্য কী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে- তা জানার উদ্যোগ নিয়েছেন তারা।

এদিকে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজ বলছে, ২০১৭ সালে পরিবহন খাতে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক মারা গেছে, যার সংখ্যা ৩০৭ জন। মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জানান, মাদকাসক্তের কারণে সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ কারণে দুর্ঘটনা বাড়ে। মাদকাসক্ত চালকদের নিজেদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কেন্দ্রীয় মাদক নিরাময় কেন্দ্র ঢাকার একজন চিকিত্সক জানান, যেহেতু চালকরা মাদক গ্রহণ করে তাই তাদের বিবেকবোধ কাজ করে না। দুর্ঘটনা বা ধর্ষণের ঘটনায় তাদের (মাদকাসক্ত চালক) অনুভূতি হয় না। রামপুরা রোডের বাসচালক শহীদ জানান, ইয়াবা খেলে ভালো লাগে। ১৬ থেকে ১৮ ঘন্টা বাসের স্টিয়ারিংয়ে বসে থাকতে হয়, ইয়াবা খেলে সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। তাছাড়া গাড়ির গরম, যাত্রীদের উত্তেজনা আর ট্রাফিক পুলিশের হয়রানি এসব সামাল দিতে ইয়াবা ছাড়া চলে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, চালকদের নিয়মের মধ্যে আনার ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা রয়েছে, যা পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের পাশাপাশি যাত্রীদের সচেতন হতে হবে।

ইত্তেফাক/নূহু

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫১
আসর৪:১২
মাগরিব৫:৫৬
এশা৭:০৯
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫১