রাজধানী | The Daily Ittefaq

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের দিনভর সংঘর্ষ

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের দিনভর সংঘর্ষ
ইত্তেফাক রিপোর্ট০৬ আগষ্ট, ২০১৮ ইং ২১:৩৪ মিঃ
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের দিনভর সংঘর্ষ
‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনে সোমবারও রাজধানীর তিনটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই আন্দোলন চলার নবম দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাঠে নামে। পুলিশ শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল ছুড়েছে। পুলিশ লাঠিচার্জ করলে এই তিনটি স্থানে অন্তত অর্ধশত শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের প্রায় ৬ ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। রামপুরায় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে স্থানীয় শ্রমিক লীগের কর্মীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা। শ্রমিক লীগের কর্মীদের ছোড়া ইটপাটকেলে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ভবনের অনেক জানালার কাঁচ ভেঙ্গে যায়। পুলিশের টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। শাহবাগে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করতে গেলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। পুলিশ টিয়ারশেল ছুড়ে ও জলকামান ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ৫ জন শিক্ষার্থীকে আটক করে। অপরদিকে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ অন্তত ২০ শিক্ষার্থীকে আটক করে। এ পরিস্থিতিতে ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় দুই দিন বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
 
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি: রবিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা প্রগতি সরণী অবরোধ করে রাখে। সোমবার সকাল ১১টার দিকে একদল শিক্ষার্থী বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে বেরিয়ে প্রগতি সরণী অবরোধ করতে চাইলে পুলিশ ধাওয়া দেয়। এর সূত্র ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে। এ সময় ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি ও এআইইউবিসহ আরও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যোগ দেয়। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত বসুন্ধরা গেটের সামনে বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করেন। এক পর্যায়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে। বসুন্ধরা গেটের সামনে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীরা পিছু হটতে শুরু করেন। পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করতে করতে গ্রামীণ ফোন সেন্টারের দিকে এগুতে থাকে। বেলা ২টার দিকে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে শিক্ষার্থীদের আবাসিক এলাকায় ঢুকিয়ে দেয়। ওই সময় ১৫ জন থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। এরপর পুলিশ বসুন্ধররা আবাসিক এলাকার গেটে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল ছুড়তে থাকে। এ সময় অনেক শিক্ষার্থী ফেসবুকে লাইভ করে পুলিশের ওপর হামলা করার ঘোষণা দেয়। 
পুলিশের রাবার বুলেট  ও টিয়ার শেলের মুখে টিকতে না পেরে শিক্ষার্থীরা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ব্যাংক এশিয়া গলি ও ব্র্যাক ব্যাংক গলিতে অবস্থান নেয়। বিকাল ৪টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলেও এই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল।
 
পুলিশের বাড্ডার জোনের সহকারী কমিশনার বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় ১০/১২ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের নাম পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপ-পরিচালক (জন সংযোগ) বিল্লাল হোসেন বলেন, সার্বিক ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন। সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা আটকা পড়েছিল। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বাসায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণ করতে মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বৈঠক করবে। 
 
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি: আফতাবনগরে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে লাঠি হাতে যুবকদের অংশ নিতে দেখা যায়। শিক্ষার্থী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, হামলাকারী যুবকরা স্থানীয় শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের লীগের কর্মী। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, আন্দোলনের মধ্যেই সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এক ছাত্রী ক্লাস শেষ করে বাসায় ফেরার সময় পথ আটকে দেয় ছাত্রলীগের কর্মীরা। আফতাবনগর পুলিশ ফাঁড়ির সামনে এই ঘটনা ঘটনার পর ওই ছাত্রী কাঁদতে কাঁদতে ক্যাম্পাসে ফিরে গেলে ছাত্ররা ঘটনাস্থলে যায় এবং মূল সড়কে অবস্থান নেয়। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা আফতাবনগরের পুলিশ ফাঁড়ির সামনে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এ সময় পাল্টা জবাবে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে বাড্ডা ও রামপুরা থানা থেকে আরও পুলিশ আসে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের সহপাঠীকে ছাত্রলীগের কর্মীরা একা অপমান করেছেন, মারধর করেছেন। অথচ ছাত্রী কোনো দোষ করেননি। কিন্তু বিষয়টি পুলিশ ফাঁড়ির সামনে ঘটলেও পুলিশ সদস্যরা কোনো প্রতিবাদ করেনি।
 
শিক্ষার্থীদের আফতাবনগরে জহিরুল ইসলাম সিটি আবাসিক এলাকায় প্রবেশের মূল সড়ক থেকে সরাতে পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। ওই সময় শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের সামনে অবস্থান নিলে একদল যুবক ধাওয়া করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ওই যুবকদের মধ্যে স্থানীয় শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের লীগের কর্মীরা ছিলেন। লাঠি হাতে অবস্থান নেওয়া যুবকদের পুলিশের সঙ্গেই অবস্থান করতে দেখা গেছে। শিক্ষার্থীরা ধাওয়া খেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে গেলে যুবকরা ইউনিভার্সিটির ভবন লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে ভবনের বেশ কয়েকটি জানালার কাঁচ ভেঙ্গে যায়। আহত চার শিক্ষার্থীকে ইউনিভার্সিটির উদ্যোগে গাড়িতে করে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। আহত শিক্ষার্থীদের বহন করা তিনটি প্রাইভেট কার বহিরাগত যুবকদের ভাংচুরের শিকার হয়। পরে শিক্ষার্থীরা ইউনিভার্সিটির ভিতর থেকে বহিরাগতদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। বিকাল সাড়ে ৩ টার দিকে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ফরাশ উদ্দিন ঘটনাস্থলে এসে শিক্ষার্থীদের শান্ত করেন। 
 
পুলিশেল মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার আনোয়ার হোসেন জানান, শিক্ষার্থীরা আফতাবনগরের পুলিশ ফাঁড়ির দিকে হামলা করতে এসেছিল। এর আগে তারা রাস্তায় অবস্থান নেয়। তাদেরকে প্রতিরোধ করে হটিয়ে দেওয়া হয়েছে।
 
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মহিউদ্দিন বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বজায় রাখতে মঙ্গলবার ও বুধবার দুইদিন ইউনিভার্সিটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। টিয়ারসেল ও ইটপাটকেলের আঘাতে অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। তবে আহতের সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ইউনিভার্সিটির অবকাঠামোর অনেক ক্ষতি হয়েছে। যেসব শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে আটকা পড়েন, তাদেরকে নিরাপদে বাসায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
শাহবাগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানান, সোমবার বেলা তিনটার দিকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ এর ব্যানারে একদল ছাত্র শাহবাগের দিকে যেতে চাইলে পুলিশ তাদের ওপর এসব প্রয়োগ করে। মিছিলটিতে ঢাবির বাম ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীসহ প্রায় ৩০০ সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী অংশ নেয়। বিক্ষোভ থেকে পুলিশ পাঁচজনকে আটক করে।
  
এর আগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দুপুর দেড়টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলে নিরাপদ সড়কের  দাবিতে আন্দোলনরতদের ওপর হামলার প্রতিবাদে স্লোগান দেয়া হয়। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কয়েকবার প্রদক্ষিণ করে শাহবাগ মোড়ের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় পুলিশ বাধা দিলে পুলিশের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা হয়। শিক্ষার্থীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়ে মারে। এরই একপর্যায়ে পুলিশ ছাত্রদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল ছোড়ে। এ সময় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে দুইপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পুলিশ টিয়ারশেলের পাশাপাশি জলকামান ও ফাঁকা গুলিও ছোড়ে। ঘটনাস্থল থেকে হোসাইন ইশাদী মাহমুদ ও আশরাফুল হক ইশতিয়াকসহ মোট পাঁচজনকে আটক করে পুলিশ। প্রায় আধাঘণ্টা ধরে শিক্ষার্থী-পুলিশ সংঘর্ষের পর বিকেল ৪টার দিকে শাহবাগ মোড়ের পরিস্থিতি শান্ত হয়। 
সমাজতান্ত্রি ছাত্র ফ্রন্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সাধারণ সম্পাদক সালমান সিদ্দিকী বলেন, বিনা উসকানিতে পুলিশ তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। ১০জন শিক্ষার্থী হামলায় আহত হয়েছে বলে জানান তিনি। 
 
এ বিষয়ে পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার মারুফ হোসেন সরদার সাংবাদিকদের বলেন, গত কয়েকদিন আমরা কোনো ব্যবস্থা নেইনি। অনেক ধৈর্য ধরে ছিলাম। আজ থেকে চেষ্টা করছি শাহবাগ মোড় ফ্রি রাখার জন্য। এ সব লোকজনকে বারবার অনুরোধ করা হয়েছে, কিন্তু তারা শোনেনি। এরপর যখন আমরা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছি, তখন তারা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেছে। যার প্রেক্ষিতে আমরা টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে তাদের ভেতরে সরিয়ে দিয়েছি।
 
ইত্তেফাক/এমআই
 
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৬
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৩
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬