রাজধানী | The Daily Ittefaq

দেশে অন্ধত্বের ঝুঁকি নিয়ে জন্ম নেয় সাড়ে ১২ ভাগ শিশু

দেশে অন্ধত্বের ঝুঁকি নিয়ে জন্ম নেয় সাড়ে ১২ ভাগ শিশু
মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ২৯ আগষ্ট, ২০১৮ ইং ০২:১৩ মিঃ
দেশে অন্ধত্বের ঝুঁকি নিয়ে জন্ম নেয় সাড়ে ১২ ভাগ শিশু
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সামনে কথা হয় কম বয়সি মা রোকেয়া বেগমের সঙ্গে। তার তের মাস বয়সি কন্যা আনিকার চোখ দেখিয়ে ফিরছিলেন তিনি। রোকেয়া বেগম বলেন, ডাক্তার বলেছে, ‘আমার বাইচ্চার দুটা চোখই প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। জন্মের পর পরই চিকিত্সা নেয়ার দরকার আসিলো। এখন আর কিছুই করার নেই। জন্মের পর থেকে চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল, আর চোখ খুলতে পারতো না। সবাই কইতো, বাইচ্চা ছোড হইছে হ্যার লাইগ্যা চোখ ফুটতে সময় লাগবো। এরপর গ্রাম্য ডাক্তার দিয়া চিকিত্সা লইছি, শহরে ডাক্তার দেখাতে চাইছি কিন্তু আমার সাথে আসার মানুষ আছিল না। মেয়ের বাপে থাকে বিদেশে। আমি শ্বশুর বাড়িতে শাশুড়ির লগে থাহি...।’
 
শুধু আনিকা নয়; এমন অনেক শিশু শুধু অসচেতনতায় দৃষ্টি হারাচ্ছে। বাংলাদেশে অন্ধত্ব শিশুস্বাস্থের জন্যে এক মারাত্মক সমস্যা। কেননা, দেশে অন্ধত্বের ঝুঁকি নিয়ে জন্ম নিচ্ছে সাড়ে ১২ শতাংশ শিশু। শুধু তাই নয়, ছানিজনিত অন্ধত্বের শিকার হচ্ছে প্রতি তিন জনে একজন শিশু এবং প্রতি মিনিটে একজন শিশু অন্ধত্ববরণ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের ছানিসহ অন্যান্য চোখের সমস্যা যে হারে বাড়ছে তাতে করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে চক্ষু চিকিত্সকের সংখ্যা বাড়াতে না পারলে, শিশু অন্ধত্বের হার আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে পারে।
 
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ভিট্রিও রেটিনা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. দীপক কুমার নাগ বলেন, চোখের সমস্যা কেবল বড়দের হয় না, ছোটদেরও হয়। জন্মের পরেই নবজাতকের চোখের সমস্যা হতে পারে। তবে সময়মত ধরতে না পারলে কিংবা চিকিত্সা নিতে না পারলে, শিশু অন্ধ হয়েও যেতে পারে। তিনি বলেন, ২৪, ২৮ বা ৩০ সপ্তাহের যেসব অপরিণত শিশু জন্ম নিচ্ছে তাদের চোখের গঠন পরিপূর্ণ হয় না। পরিপূর্ণ চোখ গঠন হওয়ার আগেই শিশু ভূমিষ্ট হচ্ছে। যে কারণে চোখের ভেতরে রেটিনার রক্তনালীগুলো ৯ মাস বয়সের মধ্যে তৈরি হয়। সেগুলো আর তৈরি হতে পারে না। শিশু জন্মের পরে এই যে অপরিপক্ক রেটিনা, তা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। যে কারণে শিশু সারা জীবনের জন্যে অন্ধ হয়ে যেতে পারে।
 
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভে অনুযায়ী, বছরে যত শিশুর জন্ম হয় তার মধ্যে ২৯ ভাগ কম ওজন নিয়ে জন্মায়। সুতরাং সঠিক সময়ে চিকিত্সা না হলে তাদের প্রত্যেকের চোখের দৃষ্টি হারিয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে। তিনি বলেন, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মানুষের অজ্ঞতা, শিশু চক্ষু বিশেষজ্ঞের স্বল্পতা এবং পুষ্টিহীনতা ও ছানিজনিত জটিলতায় দৃষ্টিহীন হচ্ছে শিশুরা। তবে সঠিক সময়ে চিকিত্সা দিলে অর্ধেকের বেশি শিশুর ক্ষেত্রে এসব সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
 
গবেষণায়ও দেখা গেছে; দৃষ্টিহীন মানুষের ৮০ শতাংশ গ্রামে বাস করে। যাদের ৯০ ভাগ দরিদ্র। যাদের চিকিত্সা নেওয়ার সাধ্য নেই। অন্যদিকে ৯০ ভাগ চক্ষু চিকিত্সক ও তাদের সহযোগীদের বাস শহরে। সারা বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়াও ১২টি শিশু অন্ধত্ব নিবারণ কেন্দ্র রয়েছে। ঢাকায় ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল ও জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে অন্ধ রোগীদের চিকিত্সা দেওয়া হয়। অরবিস ইন্টারন্যাশনাল ৯টি চক্ষু হাসপাতালের মাধ্যমে অন্ধত্ব নিবারণে কাজ করছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, পাহাড়তলী, ময়মনসিংহ, মৌলভীবাজার, দিনাজপুর, রংপুর, কুমিল্লা, সিলেট, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ এবং চাঁদপুরে আরো একটি করে কেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে।
 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ অন্ধত্ব বরণ করছে। যার মধ্যে ৪৮ হাজার শিশু-কিশোর। বাংলাদেশে প্রতি হাজারে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ শিশু অন্ধত্বের শিকার। দেশে প্রায় ১৩ লাখ শিশুর দৃষ্টিত্রুটি রয়েছে যার মধ্যে এক লাখ ৫৩ হাজারেরও বেশি শিশু ক্ষীণদৃষ্টি সমস্যায় আক্রান্ত। আর ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রেই অন্ধত্বের মূল কারণ ছানি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু অন্ধত্ব শুধু বাংলাদেশেই নয়, এটি বৈশ্বিক শিশু স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক সমস্যা।
 
অরবিস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সিনিয়র মেডিক্যাল অফিসার মো. লুত্ফুল হুসাইন বলেন, আমাদের দেশে শিশু অন্ধত্বের প্রধান কারণ ছানি। পুষ্টিহীনতা ও ছানিজনিত জটিলতায় দৃষ্টি হারাচ্ছে অসংখ্য শিশু। ছানি ছাড়াও রয়েছে চোখে আঘাত জানিত সমস্যা, দৃষ্টিস্বল্পতা, রোটিনোপ্যাথি অব প্রি-ম্যাচুরেটি অন্যতম। তবে যেসব শিশু সময়ের আগেই কম ওজন নিয়ে জন্মাচ্ছে তাদের জন্মের ২৮ দিনের মধ্যেই চোখ রেটিনা বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করা জরুরি।
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩০
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৭
মাগরিব৬:০২
এশা৭:১৫
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৭