সংস্কৃতি | The Daily Ittefaq

শাহ আব্দুল করিমের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী

শাহ আব্দুল করিমের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী
অনলাইন ডেস্ক১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ইং ০৯:২৯ মিঃ
শাহ আব্দুল করিমের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী
ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি, মালজোড়া, বিচ্ছেদ প্রভৃতি ভাটি অঞ্চলে বিকশিত গীতধারা। এতে কবিয়াল ও বাউলরা লিপিবদ্ধ করেছেন মাটি ও মানুষের কথা। তেমনই একজন শাহ আবদুল করিম। মহান এ ব্যক্তিত্বের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী শনিবার। তিনি ২০০৯ সালের এ দিনে মারা যান।
 
শাহ আব্দুল করিমের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর পরিবার এবং বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এ উপলক্ষে শাহ আব্দুল করিম ফাউন্ডেশন শনিবার সকাল ১১টায় দিরাই থানা পয়েন্টে, সুনামগঞ্জে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্মিত ভবনটির নাম বাউল একাডেমি, মদনপুর (দিরাই রাস্তা) মোড় ও দিরাই থানা পয়েন্টকে শাহ আব্দুল করিম চত্বর এবং দিরাই-ধল রোডকে শাহ আব্দুল করিম রোড নামকরণের দাবিতে মানববন্ধন করার কথা রয়েছে।
 
মানববন্ধন শেষে একই দাবিতে দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে স্মারকলিপি দেয়া হবে। বেলা ৩টায় সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি শাহ আব্দুল করিমের মৃত্যুদিবস উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করবে। শাহ আব্দুল করিম পরিবারের পক্ষ থেকে জোহরের নামাজের পর মিলাদ মাহফিল, বিকাল ৩টায় আলেচানা সভা এবং সন্ধ্যার পর থেকে করিম ভক্তদের উদ্যোগে সারা রাত ‘করিম গীতি’র আসর চলবে।
 
শাহ আবদুল করিম
 
সিলেট অঞ্চলে অনেক গীতিকবি ও শিল্পীদের জন্মস্থান। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে এক কৃষক পরিবারে ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শাহ আব্দুল করিম জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লালন ফকির, হাছন রাজা, রাধারমন, শীতালং শাহ, আরকুম শাহ, দূরবীন শাহ, উকিল মুন্সী, শেখ বানুকে মনেপ্রাণে লালন করে গান বুনেছেন, গান গেয়েছেন। তার রক্ত ও চিন্তাভাবনা জুড়ে ছিল দেশপ্রেম, স্বাধীনতা ও মাটির গন্ধ। সে সব গান দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের আনাচে-কানাচে পৌঁছে গিয়েছে।
 
তার রচিত দেড় হাজার গানের মধ্যে সংগ্রহে আছে মাত্র ৬শ’। শাহ আব্দুল করিম মালজোড়া, বিচ্ছেদ, ধামাইল, জারি, সারি, দেহতত্ত্ব, মুর্শিদি, ভাটিয়ালি ও গণ সঙ্গীতসহ নানা ধারার গান রচনা করেছেন। এর মধ্যে- বন্ধে মায়া লাগাইছে, গাড়ি চলে না চলে না, আমার বন্ধুয়া বিহনে গো, আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম, বসন্ত বাতাসে সইগো, কোন মেস্তরি নাও বানাইছে কেমন দেখা যায়, আইলা না আইলা নারে বন্ধু, মানুষ হয়ে তালাশ করলে মানুষ হওয়া যায়, সখি কুঞ্জ সাজাওগো, আমি কূলহারা কলঙ্কিনী, কেমনে ভূলিবো আমি বাঁচি না তারে ছাড়া, রঙের দুনিয়া তোরে চাই না ইত্যাদি গান দেশে-বিদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তার প্রকাশিত গ্রন্থ ৭টি— আফতাব সঙ্গীত (১৯৪৮), গণ সঙ্গীত (১৯৫৭), কালনীর ঢেউ (১৯৮১), ধলমেলা (১৯৯০), ভাটির চিঠি (১৯৯৮), কালনীর কূলে (২০০১) ও শাহ আব্দুল করিম রচনাসমগ্র (২০০৯)। তার মৃত্যুর পর প্রকাশ হয় সুমনকুমার দাশ সম্পাদিত ‘শাহ আব্দুল করিম স্মারকগ্রন্থ’। শাহ আব্দুল করিমের ১০টি গান ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে বাংলা একাডেমি। তাকে নিয়ে প্রামাণ্য চিত্র ‘ভাটির পুরুষ’ নির্মাণ করেছেন শাকুর মজিদ। শাকুরের লেখা নাটক ‘মহাজনের নাও’র ৮৮টি প্রদর্শনী করেছে সুবচন নাট্য সংসদ। এ ছাড়া তাকে নিয়ে বেশ কিছু বই লেখা হয়েছে।
 
শাহ আবদুল করিম কৃষক পরিবারের অভাব অনটনের মাঝে বেড়ে ওঠলেও সঙ্গীতের মায়া তিনি ত্যাগ করতে পারেননি। দিনে রাখালের কাজ করে রাতে পড়াশুনা শিখতে নৈশ-বিদ্যালয়ে যেতেন। অক্ষরজ্ঞানের পর তার মন আর লেখাপড়ায় বসে না। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আত্মীয়-স্বজনের আশ্রয়ে বেড়ে ওঠেন। এসময় তিনি গুরুদের সঙ্গে বর্ষা মওসুমে হাওড় অঞ্চলে গান গেয়ে বেড়াতেন। একদিন ওস্তাদের কথা রাখতে গিয়ে বিয়ে করেন আফতাবুন্নেছাকে। আব্দুল করিম স্ত্রীকে ডাকতেন ‘সরলা’ নামে। ১৯৯৭ সালে মারা যান সরলা। জনশ্রুতি আছে, গানের অনুষ্ঠানে থাকায় সরলার মুত্যুকালে আব্দুল করিম পাশে থাকতে পারেননি। পরে খবর পেয়ে বাড়িতে যান এবং ‘তোমরা কুঞ্জ সাজাওগো, আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে’ ‘কেমনে ভূলিবো আমি বাঁচিনা তারে ছাড়া’ এই গানগুলো রচনা করেন। সরলার কবর শোবার ঘরের সামনে দিয়েছেন। ইচ্ছানুযায়ী শাহ আবদুল করিমকে সরলার কবরের পাশে দেয়া হয়।
 
তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সরলা না থাকলে আমি বাউল শাহ আব্দুল করিম হতে পারতাম না। সরলা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। আমার বাউল জীবনের মুর্শিদজ্ঞান সরলা।’
 
ঊনিশ শতকের বড় বড় আন্দোলনে সক্রিয় চরিত্র হিসেবে দেখা গেছে তাকে। এর মধ্যে আছে ৫৪ এর নির্বাচন, ৬৯ এর গণ-অভ্যূত্থান, ৭০ এর নির্বাচন ও ৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। তার গণসঙ্গীতে জেগেছিল জনতা। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর কাগমারী সম্মেলনে গানে গানে যোগ দিয়েছেন তিনি। ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয়পাত্র। পেয়েছেন রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার (২০০০), একুশে পদক (২০০১), লেবাক এ্যাওয়ার্ড (২০০৩), মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা (২০০৪), চ্যানেল আই মিউজিক এ্যাওয়ার্ড আজীবন সম্মাননা (২০০৫), বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতি সম্মাননা (২০০৬), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননা (২০০৮), খান বাহাদুর এহিয়া পদক (২০০৮), এনসিসি ব্যাংক এনএ সম্মাননা (২০০৯) ও হাতিল এ্যাওয়ার্ড (২০০৯)।
এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২২ অক্টোবর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৪৪
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫০
মাগরিব৫:৩০
এশা৬:৪৩
সূর্যোদয় - ৫:৫৯সূর্যাস্ত - ০৫:২৫