সংস্কৃতি | The Daily Ittefaq

অপরাজেয় ভাস্কর

পথিকৃৎ
অপরাজেয় ভাস্কর
আসিফুর রহমান সাগর০৭ জুন, ২০১৭ ইং ১১:৪৯ মিঃ
অপরাজেয় ভাস্কর
 
শিল্পীর ভালোবাসা, দ্রোহ চেতনা যেন মিশে আছে ভাস্কর্যের গায়ে। হাতুড়ির প্রতিটি ঘা দিয়ে তিনি যেন প্রাণ-সঞ্চার করতে চেয়েছেন অপরাজেয় বাংলার পরতে পরতে। তরুণ শিল্পী সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ ভাস্কর্য ‘অপরাজেয় বাংলা’ নির্মাণের সময় গ্লাভস ব্যবহার করেননি। কারণ, মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে যে কষ্ট করেছিলেন তা নিজে উপলব্ধি করতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই অপরাজেয় বাংলা এখন বাংলাদেশের মুখ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
 
জন্মের আগেই নিজের চরিত্র প্রকাশ করতে পারে কে! ‘অপরাজেয় বাংলা’ নির্মাণের কাল থেকেই হয়ে উঠেছিল মানুষের প্রতিবাদের প্রতীক। এ ভাস্কর্য প্রতিবাদের প্রেরণার যেমন প্রতীক, বাঙালির শৌর্যের বীরত্বেরও প্রতীক। বাঙালির ইতিহাসের মতোই এর নির্মাণ পর্বটিও ছিল লড়াইয়ের। নির্মাণের সময়ই এ ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার জন্য মৌলবাদীরা আন্দোলনে নামে। আর সে আন্দোলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে ভেসে যায়।
 
অশুভের বিরুদ্ধে বাঙালির অপরাজেয় পরিচয়ের ইতিহাসকে অমরতায় গেঁথেছেন ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। কংক্রিটে বাঙালির ইতিহাসের, শিল্পের জাদুময় স্পর্শ বোলান তিনি। তখন সেটা হয়ে ওঠে জাতির প্রেরণার, প্রতিবাদের প্রতীক। হয়ে ওঠে বাংলার মানুষের অপরাজেয় চরিত্রের প্রতীক।
 
এ ভাস্কর্য প্রসঙ্গে ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেছিলেন, অপরাজেয় বাংলা বাংলাদেশের মুখ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এর পেছনে আবদুল্লাহ খালিদের নিরলস পরিশ্রম কাজ করেছে। তবে যে মানসিকতা থেকে অপরাজেয় বাংলা করা হয়েছিল তা এখনো দেশ থেকে চলে যায়নি। বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এখনো বিরাজ করছে। তাদের নির্মূল করতে পারিনি। স্বাধীন বাংলাদেশে এই অপশক্তি এই ভাস্কর্যকে অপসারণের চেষ্টা করেছিল। আমাদের সমবেত চেষ্টায় তাদের প্রতিহত করতে হবে। এই কাজ দিয়ে শিল্পী আবদুল্লাহ খালিদ অমর হয়ে থাকবেন। অপরাজেয় বাংলা আজীবন বাঙালির শৌর্যের, বীরত্বের চিরকালীন প্রতীক হয়ে থাকবে।
 
কোনো অনুষ্ঠানে না ডাকলে নিজে থেকে ভাস্কর্যের কাছে খুব একটা যেতে চাইতেন না শিল্পী আবদুল্লাহ খালিদ। অপরাজেয় বাংলার গায়ে শিল্পীর নাম না থাকার ‘অপমান’ মিশে ছিল। মনে ছিল দেশের মানুষের কাছ থেকে খুব একটা ‘উত্সাহ’ না পাবার ক্ষোভ। ছিল আরো অনেক কাজ না করার আক্ষেপ। যেসব কাজ করেছেন তাঁর অবর্তমানে সেগুলোর সংরক্ষণ ঠিকমতো হবে কি-না সে নিয়েও দুশ্চিন্তা ছিল। তার বিপরীতে ছিল ‘অপরাজেয় বাংলা’ নির্মাণের অহংকার।
 
তাঁর প্রসঙ্গে ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান বলেন, খালিদ অনেক জেদি প্রকৃতির ও সাহসী একজন মানুষ ছিলেন। সাহসিকতার সঙ্গে তিনি ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন। ‘অপরাজেয় বাংলা’র কারণে তিনি বেঁচে থাকবেন আজীবন।
 
অপরাজেয় বাংলা নির্মাণের সময়ই তা জাতির ঘুমিয়ে থাকা বিবেক ধরে নাড়া দেয়। সেটা ১৯৭৫ সাল, সেই অন্ধকার সময়। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর রাজনৈতিক কারণে নির্মাণ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল এই ভাস্কর্যের। সেই ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার জন্য মৌলবাদীদের আন্দোলন শুরু হয়। সেই আন্দোলন রুখে দিতে মানুষ নেমে আসে পথে। সেই থেকে বাংলাদেশের যেকোনো আন্দোলনে কেন্দ্রভূমি হয়ে ওঠে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ।
 
অপরাজেয় বাংলার তাত্পর্য
 
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করে। তাদের সম্মিলিত প্রতিরোধ ও আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হয়। সর্বস্তরের মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণের প্রতীকী চিহ্নই ‘অপরাজেয় বাংলা’। এর তিনটি মূর্তির একটির ডান হাতে দৃঢ় প্রত্যয়ে রাইফেলের বেল্ট ধরা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। এর চোখেমুখে স্বাধীনতার চেতনা-উদ্দীপনা নিরাপোস। এর মডেল ছিলেন আর্ট কলেজের ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা বদরুল আলম বেনু। থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে সাবলীল ভঙ্গিতে দাঁড়ানো অপর মূর্তির মডেল ছিলেন সৈয়দ হামিদ মকসুদ ফজলে। আর নারী মূর্তির মডেল ছিলেন হাসিনা আহমেদ। স্বাধীনতার এ প্রতীক তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন গুণী শিল্পী ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ।
 
প্রয়াত সাংবাদিক মিশুক মুনীর এর ব্যখ্যা দিয়েছেন খুব সুন্দর করে। তিনি বলেছিলেন, অপরাজেয় বাংলা দেশের মানুষের কাছে পৌঁছাতে কোনো লিফলেটের দরকার পড়েনি। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, হোয়াটএভার ইট ইজ, যাদেরই রাজনৈতিক কোনো বক্তব্য রাখার প্রয়োজন হতো, কোথায় হবে? অপরাজেয় বাংলায় হবে। এই যে একটা ইউনিভার্সেল এক্সেপটেন্স, এটা ৭৮, ৮৫, ৮৮ কন্সট্যান্টলি হয়েছে। এরকম উদাহরণ হয়তো খুব কমই আছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অ্যাক্রস দ্য প্ল্যাটফর্ম, একই ভেন্যু, একই ইমেজ, একই ফিলিংস থেকে রিলেট করছে, গ্রেট অ্যাচিভমেন্ট।
 
অপরাজেয় বাংলা নির্মাণের কাল
 
ফার্স্টএইড বাক্স কাঁধে একজন সেবিকা, সময়ের প্রয়োজনে রাইফেল কাঁধে তুলে নেয়া গ্রীবা উঁচু করে ঋজু ভঙ্গিমায় গ্রামের টগবগে তরুণ এবং দু হাতে রাইফেল ধরা আরেক শহুরে মুক্তিযোদ্ধা—এই হলো অপরাজেয় বাংলা। এই নামটি দিয়েছিলেন তত্কালীন দৈনিক বাংলার সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী।
 
১৯৭২-৭৩ সালে ডাকসুর ভিপি ছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং জিএস ছিলেন মাহবুব জামান। ১৯৭৩ সালে ডাকসুর উদ্যোগে একটি স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। শিল্পী তিনটি ডিজাইন করেছিলেন। এটি নির্বাচন করা হয়। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এটি অনুমোদন দেন। কাজ শুরু হয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দীর্ঘ সময় এর নির্মাণকাজ বন্ধ থাকে। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে ধর্মীয় উগ্রপন্থিরা ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলার স্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদ্রের প্রতিরোধে সেই অপচেষ্টা ভেস্তে যায়। ১৯৭৫ সালের পর অনেকদিন অপরাজেয় বাংলার নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। ১৯৭৯ সালের ১৯ জানুয়ারিতে পূর্ণোদ্যমে আবার কাজ শুরু হয়। ১৯৭৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় এ ভাস্কর্যের উদ্বোধন করা হয়। ৬ ফুট বেদির ওপরে নির্মিত এ ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১২ ফুট আর প্রস্থ ৮ ফুট।
 
প্রয়াত মিশুক মুনীরের ক্যামেরার হাতেখড়ি এই অপরাজেয় বাংলার নির্মাণপর্বের ছবি তোলার মধ্য দিয়ে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সেসব ছবি নিয়ে একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। সেসব ছবিতে ধরা আছে এই ভাস্কর্য নির্মাণের ঐতিহাসিক সব মূহূর্ত।
 
বেঁচে থাকবেন তাঁর কাজে
 
গ্রীন রোডে শিল্পীর নিরাভরণ বাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তাঁর পেইন্টিং, ভাস্কর্য। দেয়ালে ঝুলছে ছবি, তাঁর নিজেরই। রয়েছে এসএম সুলতানের ছবিও। তাঁর স্ত্রী উম্মে কুলসুম দুই ছেলেকে নিয়ে এখানেই থাকেন। এক মেয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর স্ত্রী বলছিলেন, সারাজীবন তো ছবি এঁকে আর ভাস্কর্য গড়েই কাটিয়ে দিলেন। এসব বিক্রি বা টাকার পেছনে ছোটেননি। আমি মানা করেছি। টাকা দিয়ে কী হয়। একটু অভাব না হয় থাকল। কিন্তু তিনি তো বেঁচে থাকবেন তাঁর কাজে। টাকার পেছনে ছুটলে শিল্প হয় না।’
 
গত মে মাসের ২০ তারিখে মৃত্যুবরণ করেন সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। চিকিত্সার কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু পুত্রশোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি শিল্পী। ছেলের শোকে ভেঙে পড়েছিলেন। শিল্পী দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগেছিলেন।
 
 
আরো যত কাজ
 
শুধু অপরাজেয় বাংলাই নয়, ৭৫ বছর বয়সী সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন কেন্দ্রের সামনে স্থাপন করা ম্যুরাল ‘আবহমান বাংলা’ এবং ১৯৯৫-১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধান দপ্তরের সামনে টেরাকোটার ভাস্কর্যও নির্মাণ করেন। এছাড়া তাঁর কাজের মধ্যে রয়েছে ‘অঙ্কুর’, ‘অঙ্গীকার’, ‘ডলফিন’ এবং ‘মা ও শিশু’। শিল্পকলা ও ভাস্কর্যে গৌরবজনক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আবদুল্লাহ খালিদ ২০১৪ সালে শিল্পকলা পদক এবং ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন।
 
১৯৪৫ সালে সিলেট জেলা শহরে জন্ম নেওয়া আবদুল্লাহ খালিদ ১৯৬৯ সালে তত্কালীন ইস্ট পাকিস্তান কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফ্টস (বর্তমান চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে চিত্রাঙ্কণ বিষয়ে স্নাতক এবং পরে ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিত্রাঙ্কণ ও ভাস্কর্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাস্কর্য বিভাগে শিক্ষকতা দিয়ে আবদুল্লাহ খালিদ তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭২ সালে সেখানকার প্রভাষক থাকাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুর উদ্যোগে কলাভবনের সামনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ‘অপরাজেয় বাংলা’র নির্মাণের দায়িত্ব পান।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৪ আগষ্ট, ২০১৭ ইং
ফজর৪:১৯
যোহর১২:০১
আসর৪:৩৪
মাগরিব৬:২৮
এশা৭:৪৩
সূর্যোদয় - ৫:৩৭সূর্যাস্ত - ০৬:২৩