সংস্কৃতি | The Daily Ittefaq

আজ সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী

আজ সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী
ইত্তেফাক রিপোর্ট২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং ০৯:৪৯ মিঃ
আজ সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী
 
সব্যসাচী লেখক, কথাশিল্পী, কবি সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দিবসটিকে নানা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে পালন করবে। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, চলচ্চিত্র, গান, অনুবাদসহ সাহিত্যে-সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর সাবলীল পদচারণার জন্য তাঁকে ‘সব্যসাচী’ লেখক বলা হয়ে থাকে। তার লেখকজীবন প্রায় ৬২ বছরব্যাপী বিস্তৃত।
 
মৃত্যুর আগে আশিতম জন্মদিনের বক্তৃতায় বলেছিলেন, কতটুকু গেলে স্বর্গ মেলে, আর কতদূর যেতে হবে? ইতিহাসের নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে আমার জীবন গেছে। এ দীর্ঘ পথচলার উপলব্ধি হচ্ছে, জীবন সবার ওপরে। জীবনের স্বাদ হচ্ছে বেঁচে থাকায়। অর্থপূর্ণ বেঁচে থাকায়। লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা।’
 
তিনি লেখায় কবিতায় সবসময় মানুষের মত বেঁচে থাকার কথা বলেছেন, বলেছেন অর্থপূর্ণ জীবনের কথা। বাঙালি হিসেবে অহংকারী হতে শিখিয়েছেন। কবিতায় লিখেছেন -
 
‘পরিচয়ে আমি বাঙালি, আমার আছে ইতিহাস গর্বের-/ কখনোই ভয় করিনাকো আমি উদ্যত কোনো খড়গের।
 
শত্রুর সাথে লড়াই করেছি, স্বপ্নের সাথে বাস;/ অস্ত্রেও শান দিয়েছি যেমন শস্য করেছি চাষ;
 
একই হাসিমুখে বাজায়েছি বাঁশি, গলায় পরেছি ফাঁস;/ আপোষ করিনি কখনোই আমি- এই হ’লো ইতিহাস।’
 
বাংলা সাহিত্যের এই সব্যসাচী লেখক গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর রাজধানী ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এর আগে তিনি প্রায় ৪ মাস লন্ডনের রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিলেন। ফুসফুসের সমস্যা দেখা দিলে ২০১৬ সালের ১৫ এপ্রিল তাকে লন্ডন নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার তার ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়ে।
 
‘কবিতার ধ্বনিসঙ্গীতে, নাটকের আলো আঁঁধার মঞ্চে, গল্পের অবিরাম বয়নে, এই দেশ ও মানুষের কথা বলেছেন তিনি। আর সোনার বাংলা স্বপ্নের বাংলা সংগ্রামী বাংলার কথা বলার মধ্য দিয়ে বিশ্বের সকল মানুষেরই কথা হয়ে রয়েছে তার রচনায়।
 
সৈয়দ হক ১৯৩৫ সালের ২৭শে ডিসেম্বর বাংলাদেশের কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। 
১৯৭০ সালে প্রকাশিত তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’, আধুনিক সময়ের কোন কবির এত দীর্ঘ কবিতা বেশ বিরল। তার এই কাব্যগ্রন্থের কারণে তিনি তখন আদমজী পুরস্কার লাভ করেন। তার আরেক বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘পরানের গহীন ভিতর’ দিয়ে তিনি তাঁর কবিতায় আঞ্চলিক ভাষাকে উপস্থাপন করেছেন।
তাঁর প্রথম লেখা একটি গল্প, যা ১৯৫১ সালে ফজলে লোহানী সম্পাদিত ‘অগত্যা’ নামে একটি ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দেয়ালের দেশ’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। ১৯৬৬ সালে তিনি মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।
 
সংক্ষিপ্ত জীবনী
 
১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর তিনি কুড়িগ্রাম মহকুমায় (বর্তমানে জেলা) এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সৈয়দ সিদ্দিক হোসেন ছিলেন একজন হোমিওপ্যাথ ডাক্তার। মায়ের নাম হালিমা খাতুন। এ লেখকের শিশু ও কৈশোরকাল এই কুড়িগ্রামে কেটেছে। তাঁর বাবা চাইতেন ছেলে ডাক্তারি পড়বে। কিন্তু তিনি ডাক্তারি পড়ার চাপ এড়াতে ১৯৫১ সালে ভারতের মুম্বাই পালিয়ে যান। সেখানে তিনি বছরখানেক একটি সিনেমা প্রডাকশন হাউসে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এরপর দেশে ফিরে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজের মানবিক শাখায়। পরে ১৯৫৪ সালে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। তবে ইংরেজি বিভাগে তাঁর পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনায় ইস্তফা দেন সৈয়দ শামসুল হক। এর কিছু দিন পরেই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দেয়ালের দেশ’।
 
বাবার মৃত্যুর পর ১৯৫৬-৫৭ সালে বেশ অর্থকষ্টে পড়ে যান সৈয়দ হক। ওই সময় অর্থের জন্যই তিনি শুরু করেন চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা। ১৯৫৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সৈয়দ হক ৩০টির মতো চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা করেন। সৈয়দ হকের লৈখা ‘মাটির পাহাড়’, ‘তোমার আমার’, ‘রাজা এল শহরে’, ‘শীত বিকেল’, ‘সুতরাং’, ‘কাগজের নৌকা’ ইত্যাদি চলচ্চিত্র দর্শকপ্রিয় হয়।
 
সৈয়দ হক চলচ্চিত্রের জন্য গানও রচনা করেন। ‘এমন মজা হয় না গায়ে সোনার গয়না’, ‘এই যে আকাশ এই যে বাতাস’, ‘তুমি আসবে বলে কাছে ডাকবে বলে’, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘তোরা দেখ দেখ দেখরে চাহিয়া’ ইত্যাদি গান সমৃদ্ধ করেছে বাংলা চলচ্চিত্রকে। তবে চলচ্চিত্র অঙ্গনে তাঁর এ ব্যস্ততার মধ্যেও থেমে থাকেনি সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা কিংবা ছোটগল্প রচনা। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ একদা এক রাজ্যে। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত লেখা তাঁর ছোটগল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘তাস’, ‘শীত বিকেল’, ‘রক্ত গোলাপ’ প্রভৃতি।
 
সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘এক মহিলার ছবি’, ‘অনুপম দিন’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’, ‘নীল দংশন’, ‘স্মৃতিমেধ’, ‘মৃগয়া’, ‘এক যুবকের ছায়াপথ’, ‘বনবালা কিছু টাকা ধার নিয়েছিল’, ‘ত্রাহি’, ‘তুমি সেই তরবারি’, ‘কয়েকটি মানুষের সোনালী যৌবন’, ‘নির্বাসিতা’, ‘খেলারাম খেলে যা’, ‘মেঘ ও মেশিন’, ‘ইহা মানুষ’, ‘বালিকার চন্দ্রযান’, ‘আয়না বিবির পালা’ প্রভৃতি। সৈয়দ হকের লেখা কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’, ‘বিরতিহীন উত্সব’, ‘প্রতিধ্বনীগণ’, ‘পরানের গহিন ভিতর’ উল্লেখযোগ্য।
 
বাংলা মঞ্চ নাটকেও শক্তিমান এক পুরুষ হিসেবে নিজের লেখনীর প্রমাণ দিয়েছেন সৈয়দ হক। তাঁর লেখা নাটকগুলোর মধ্যে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ এবং ‘নূরলদীনের সারা জীবন’ সমকালীন অভিপ্রায়ের এক দৃপ্ত প্রকাশ। সৈয়দ হকের লেখা অন্যান্য নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘গণনায়ক’, ‘ঈর্ষা’, ‘নারীগণ’, ‘উত্তরবংশ’ ইত্যাদি।
 
অগণিত পাঠকের ভালোবাসার পাশাপাশি দেশের প্রায় সব প্রধান পুরস্কারই তার করতলে শোভা পাচ্ছে। পেয়েছেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক। প্রাপ্ত পুরস্কারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো বাংলা একাডেমী পদক, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, পদাবলী কবিতা পুরস্কার, জাতীয় কবিতা পুরস্কার, আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার প্রভৃতি।
 
সৈয়দ হক স্মরণে অনুষ্ঠানমালা
 
সৈয়দ হকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর প্রাক্কালে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ‘সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম প্রয়াণবর্ষ স্মরণার্ঘ্য’ শিরোনামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। এ অনুষ্ঠানে চারুলিপি প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত ‘ফুলের গন্ধের মতো থেকে যাবো...সৈয়দ শামসুল হক’ স্মারকগ্রন্থ এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘তুমি আসবে বলে’-সৈয়দ শামসুল হকের গানের বইয়ের আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচিত হয়। বৈকুণ্ঠ আবৃত্তি একাডেমী কবির স্বরণে ৩০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাতটায় শিল্পকলা একাডেমিতে আলোচনা ও আবৃত্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩৩
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৩
মাগরিব৫:৫৭
এশা৭:১০
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫২