সংস্কৃতি | The Daily Ittefaq

এই প্রজন্মকে বইপাগল বানিয়েছিলেন যিনি

এই প্রজন্মকে বইপাগল বানিয়েছিলেন যিনি
রিয়াদ খন্দকার১৩ নভেম্বর, ২০১৭ ইং ০৯:৩০ মিঃ
এই প্রজন্মকে বইপাগল বানিয়েছিলেন যিনি
 
একটা সময় পাঠ্যবইয়ের বাইরের সব বইকেই বলা হতো ‘আউট বই’। আর আউট বই পড়াটাকে পরিবারের কর্তারা ভাবতেন পড়াশোনার গোল্লায় যাওয়ার প্রধান হাতিয়ার। এই পশ্চাৎপদ মানসিকতার কর্তার ভয়ে ঘরের তরুণ বা তরুণীটিকে লুকিয়ে লুকিয়ে বই পড়তে হতো।
 
কখনো লেপের নিচে লুকিয়ে, কখনো পাঠ্যবইয়ের নিচে রেখে, কখনোবা আব্রাহাম লিংকনের মতো সন্ধ্যার পরে বাইরে কোনো ল্যাম্পপোস্টের নিচের আধো আলো আধো অন্ধকারে বসে। আর গল্পের বইসহ কখনো হাতেনাতে ধরা পড়লে বইয়ের জীবন তো পুরোপুরি শেষ হতোই সেইসঙ্গে পিঠে পড়ত কিছু উত্তম-মধ্যম। এই প্রজন্মকে এমন বইপাগল বানিয়ে ফেলার গোটা দায় ভার একজনেরই, তিনি হুমায়ূন আহমেদ।
 
 
প্রথমবার কোনো তরুণ যখন হুমায়ূন আহমেদের বই পড়া শুরু করবে তখন বুঝতেও পারবে না যে তার জগত্ ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই পরিবর্তিত হচ্ছে। বইয়ের পাতা যতই উল্টাচ্ছে, ততই গেঁথে যাচ্ছে ভিতরে। কখন যে আপনাকে হুমায়ূন আহমেদে পেয়ে বসবে টেরই পাবেন না। যার ফলে এই প্রজন্মের মাঝে হিমু হয়ে গেল একটি অনুভূতির নাম, মিসির আলি ও তার যৌক্তিক জগতটা নিয়ে জন্ম নিল অন্যরকম আকর্ষণ। সিরিয়াস সব বিষয় নিয়ে হিমুর ভয়ানক সব রসিকতা এবং অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা পড়ে উচ্চৈঃশব্দে হেসে ওঠেনি অথবা হিমু ও রুপার কথোপকথনে বিরহে পোড়েনি এমন তরুণ খুঁজে পাওয়া সত্যিই কষ্টকর। মিসির আলির যুক্তিগুলোতে তাজ্জব হয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলোকে আজও মিস করে এই প্রজন্ম। বইয়ের পোকা, স্বার্থহীন, রাজপুত্রের মতো চেহারার যুবক শুভ্রর প্রেমে পড়েনি এমন তরুণীর সংখ্যা অতি নগণ্য।
 
‘নন্দিত নরক’ ও ‘শঙ্খনীল কারাগার’—এ দুটো হুমায়ূন আহমেদের অত্যন্ত তরুণ বয়সে লেখা উপন্যাস। এ ছাড়াও তিনি লিখেছেন ‘মধ্যাহ্ন’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘কবি’, ‘মাতাল হাওয়া’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘বাদশাহ নামদার’, ‘শ্যামল ছায়া’র মতো উপন্যাসসমূহ। ‘নন্দিত নরক’ ও ‘শঙ্খনীল কারাগার’-এর পরে দীর্ঘদিন তিনি আর কিছু লেখেননি। পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে লেখেন প্যারাসাইকোলজির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সিক্যুয়েল উপন্যাস ‘দেবী’ ও ‘নিশীথিনী’।
 
এই দুই উপন্যাস দিয়েই জন্ম হয় বাংলা সাহিত্যের অসাধারণ এক চরিত্র মিসির আলীর। সুকঠিন যুক্তিবাদী ও অসাধারণ কোমল মনের একজন মানুষ তিনি। শুধু মিসির আলীই নয়, হুমায়ূন সৃষ্টি করেছেন হিমুর মতো এক অযুক্তিবাদী চরিত্র। হিমু আর কেউ নয়, মিসির আলীরই বিপরীত চরিত্র। মিসির আলীর প্রতিটা কাজ যেখানে হিসেবী, হিমু সেখানে চরম বেহিসেবী এক চরিত্র। এ ছাড়াও তার সৃষ্ট ‘অয়োময়’-এর মির্জা, ‘কোথাও কেউ নেই’-এর বাকের ভাই, ‘বহুব্রীহি’র মামা, নান্দাইলের ইউনুস, এইসব দিনরাত্রির ‘টুনি’ এই প্রজন্মের মানসপটে উজ্জ্বল হয়ে ভেসে আছে। হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত বাংলা সাহিত্যকে বিজ্ঞানমুখী করা।
 
বাংলা সাহিত্যে আধুনিক বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা, কল্পনার আমদানি তার হাত ধরে। তার লেখা ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’, ‘ফিহা সমীকরণ’ কিংবা ‘ইরিনা’ তরুণদের মন কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। শুধু বইয়ের জগত্ নয়। টেলিভিশনও দখল করে নেন তিনি। একের পর এক জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক রচনা করে মাত করে দেন মধ্যবিত্তকে। টিভি নাটকে হুমায়ূন আহমেদ এসে দেখিয়ে দিলেন সূক্ষ্ম রসবোধ কাকে বলে। তার নাটক দেখে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েনি, এমন তরুণ একজনও পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ আছে।
 
রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগে আধুনিক বাংলা উপন্যাসকে টেনে নিয়ে গেছেন মূলত ওপার বাংলার লেখকরা। বাংলা সাহিত্যে তরুণ পাঠককে উপন্যাসে টেনে রাখা লেখক হুমায়ূনের মতো যে আর আসেনি, সেটা পরিষ্কার করে বলা যায়। কলকাতাকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা বাংলা উপন্যাসকে তিনি একাই ঘুরিয়েছেন। এপার বাংলা ওপার বাংলায় প্রচুর তরুণকে তিনি পড়তে শিখিয়েছেন বা লেখনির গুণ দিয়ে পড়তে বাধ্য করেছেন।
 
শুধু আমিই না। হুমায়ূন আহমেদের সহজ-সরল আবেগী লেখার মাঝে আমি পুরো একটি জতিকেই বুঁদ হয়ে যেতে দেখেছি। দেখেছি কীভাবে একটা মানুষ শুধু ঘরে বসে কাগজে কলম ঘষেই, শত শত মানুষকে খালি পায়ে হলুদ পাঞ্জাবি পড়িয়ে পথে পথে হাঁটিয়েছেন। কীভাবে মানুষ তার নতুন লেখার জন্য অপেক্ষা করে থাকত, তা তো নিজেকে দিয়েই বুঝেছি। অনেকে বলে, বাংলাদেশের মানুষকে বই পড়তে শিখিয়েছেন হুমায়ূন। আমি বলব, শুধু বই পড়তেই না, এদেশের মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন তিনি। শিখিয়েছেন কীভাবে জোছনা দেখতে হয়। কোনো এক মধ্যাহ্নে কোনো চায়ের স্টল অথবা ভাত-মাছের হোটেলে একলা বসে ‘হাওয়া মে উড়তা যায়ে’ গানটিকে মিস করে কতজন মানুষ আমি জানি না। তবে এটা জানি, যারা মিস করে তাদের সেই অনুভূতির আড়ালের কারিগর আরেকজন। তিনি হুমায়ূন আহমেদ।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৩ নভেম্বর, ২০১৭ ইং
ফজর৪:৫৯
যোহর১১:৪৫
আসর৩:৩৬
মাগরিব৫:১৫
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:১৮সূর্যাস্ত - ০৫:১০