সংস্কৃতি | The Daily Ittefaq

গতি চালকের গল্প...

গতি চালকের গল্প...
নুরুল করিম১৩ জানুয়ারী, ২০১৮ ইং ১২:৫৭ মিঃ
গতি চালকের গল্প...
 
এক সময় জমিদার টাইপ মানুষদের প্রধান বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি নতুবা ঘোড়া। রাস্তায় বের হলেই দেখা মিলতো ঘোড়া সওয়ারীদের। কিন্তু বর্তমান সময়ে ঘোড়াকে যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করাটা কারো কাছে অদ্ভুত ব্যাপার মনে হবে, আবার কারো কাছে হাস্যকর! আবার বিভিন্ন কাজে ঘোড়া ব্যবহার করে সাম্প্রতিক সময়ে খবরের কাগজে উঠেছেন বেশ কয়েকজন! গতবছরের ৫ নভেম্বর ভারতের রাজস্থানে মহেশ পল্লিবল নামের এক যুবক আইফোন কিনতে মার্কেটে যান ঘোড়ার গাড়িতে করে। সেটা নিয়ে ভারত-বাংলাদেশসহ নানা দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো একাধিক কলামে খবর ছেপেছে।
 
আমি যখন ছোট ছিলাম তখনো আমার পাশের বাড়ি বেশ কয়েকজন ঘোড়া নিয়ে বাজার করতে যেতেন। তাদের নিয়ে কখনো কোনো খবর তো দূরে থাক, চা দোকানে আলোচনাও হয়নি! ঘোড়া নিয়ে আইফোন কেনা নয় শুধু, ঘোড়ায় করে ভিক্ষা করেও আলোচনায় এসেছিলেন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মরিচপুরান ইউনিয়নের উল্লারপাড় গ্রামের বৃদ্ধ শহর আলী মীর ওরফে সইট্টা ফকির। ওই উপজেলায় সইট্টা ফকিরকে ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষা করতে দেখা যায়! আর এই ঘোড়া তিনি কিনেছেন স্থানীয় মাথাফাটা বাজার গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বিনা সুদে ৬ হাজার টাকা লোন নিয়ে। উদ্দেশ্য ভিক্ষা করা। বয়সের ভারে সইট্টা ফকির আগের মতো চলতে-ফিরতে পারেন না। দু-এক টাকা ভিক্ষায় বৃদ্ধা স্ত্রীকে নিয়ে চলতেও পারেন না। সংসারের ঘানি টানতে হিমশিম খেতে হয়। শখের ব্যাপারটি তো আছেই। তাই প্রবাদ নয়, বাস্তবে ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষা করেন সইট্টা ফকির। এতে রোজগারও এখন ভালো। এখন দু-এক টাকা ভিক্ষা নেয় না, কমপক্ষ ৫ টাকা দিতে হয় তাকে। ঘোড়া আর সংসার মিলে ভালোই আছেন শখের এ মানুষটি।
 
এক সময় মায়েদের শখ ছিল ছেলে ঘোড়ার গাড়িতে চড়বে। কিন্তু এখনকার যুগে এসে ক’জন মায়ের শখ থাকে বলুন! গতবছরের ২৭ নভেম্বর ঘোড়া চড়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে খবরের কাগজ ও টেলিভিশনের পর্দায় জায়গা করে নিয়েছিলেন রাজশাহীর তানোর উপজেলার আসিফ। বাড়িতে পোষা ঘোড়া আছে। তাই শিশুকাল থেকেই বাড়িতে থাকা ঘোড়ার লালনপালন করে আসিফ। ঘোড়াও যেন তাকে চিনে রেখেছেন মালিক হিসেবে। তাই তো ঘোড়া পিঠেই চড়ে এসেই পিএসসি পরীক্ষা দিয়েছে আসিফ। প্রতিটি পরীক্ষা দিতে আসিফ ঘোড়ার পিঠে চড়ে কেন্দ্রে আসতো। তার ঘোড়াই চড়ে আসা পরীক্ষা কেন্দ্রজুড়ে শিশু পরীক্ষার্থীদের কাছে ছিল অন্যরকম আনন্দের। পরীক্ষা শেষে প্রবেশপত্র, কলম নিয়ে গাছে বেঁধে রাখা ঘোড়া পিঠে উঠে বসলে তাকে দেখতে জড়ো হতো শতশত মানুষ! কিন্তু এক সময় এমন দৃশ্য দেখা মিলতো হরহামেশা। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে ঘোড়া এখন ব্যবহূত হচ্ছে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবেও! দিল্লিতে আম আদমি পার্টি (এএপি) সরকারের চালু করা জোড়-বিজোড় পদ্ধতিতে গাড়ি চালানোর প্রতিবাদে বিজেপির এক এমপি ঘোড়ায় চড়ে সংসদে এলেন। ২০১৬ সালে কাণ্ডটি করেছেন বিজেপি এমপি রাম প্রসাদ শর্মা। ব্যাঙ্গাত্মক কায়দায় ঘোড়ার গায়ে তিনি কাগজ দিয়ে লিখেছেন, ‘দূষণমুক্ত যানবাহন’।
 
তবে দূষণমুক্ত এই বাহনটি এখনো দেশের গুটিকয়েক মানুষ ব্যবহার করছে যানবাহনের বদলে। তার মধ্যে একজন পাবনার চাটমোহর উপজেলার আবু তালেব। প্রায় ৯০ বছর ধরে তিনি ঘোড়াকে নিজের বাহক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে, তা এক অনন্য রেকর্ডও বটে! জন্মের পরই ছেলের জন্য ঘোড়া কিনে এনেছিলেন বাবা। ২ বছর বয়সে বসতে শেখার পর থেকে বাবার কোলে উঠে ঘোড়ায় চড়া শুরু। ৮-১০ বছর বয়সে নিজেই সওয়ার হওয়া শুরু করেন ছোট ঘোড়ায়। ২০ বছর বয়সে সরকারের টিকাদান কর্মসূচিতে চাকরি পেয়েছিলেন। ঘোড়ায় চড়া যাবে না বলে তা ছেড়ে দেন। পৈতৃক জমি দেখাশোনা ও কৃষিকাজ করে জীবিকা চালাচ্ছেন তিনি।
অনেকে ঘোড়াকে এখন ব্যবহার করেন নির্বাচনী প্রচারণায়। বিয়ে করার ক্ষেত্রেও ঘোড়ার ব্যবহার চোখে পড়ে মাঝেমধ্যে। তবে এখন ঘোড়ার ব্যবহার শুধু প্রতিযোগিতা ও ছবি তোলার বিষয়! সমুদ্র সৈকতে গেলে দেখা মেলে কিছু ঘোড়া। কেউ একজন দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। পর্যটকরা দু-একশ’ টাকার বিনিময়ে তুলে নেন ছবি। ব্যস! এইতো, ঘোড়ার জায়গাটা এখন শো-অফে!
 
বর্তমানে গ্রামঞ্চলের হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু, কিশোর-কিশোরীসহ সব ধরনের শ্রেণি-পেশার মানুষকে একটু আনন্দ-বিনোদন দিতে আয়োজিত হয় আগের যুগে হারিয়ে যাওয়া রাজা-বাদশাদের একমাত্র চলার বাহন ঘোড়া। গত ১৬ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা। এবারের প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয় জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ি উপজেলার সাইফুল ইসলাম। গবিন্দাসী ইউনিয়নের ছাব্বিশা গ্রামে ঐতিহ্যবাহী এই খেলা অনুষ্ঠিত হয়। ঘোড়দৌড় উপভোগ করতে সেসময় ভিড় করেন হাজারো দর্শক। দর্শকদের উপস্থিতি দেখে বোঝা যায় কতটা জনপ্রিয় এই খেলা! দর্শকদের দাবি, যেন প্রতিবছর আয়োজন করা হয় প্রতিযোগিতাটি। অন্যদিকে আয়োজকরা বলছেন, পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে রক্ষা করা হবে এর ধারাবাহিকতা।
 
গত ৫ জানুয়ারি বগুড়ার সারিয়াকান্দির আমতলী সুখদহ নদীসংলগ্ন মাঠে
 
ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা শেষ হয়েছে। ৪ দিনব্যাপী এই প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন অঞ্চলের ১৭টি ঘোড়া অংশগ্রহণ করে। ঘোড়দৌড়কে কেন্দ্র আমতলী সুখদহ নদীর ওপর মেলা বসে। ২ জানুয়ারি প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে শেষ হয় ৫ জানুয়ারি রাতে। শেষদিন বিকেলে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত দৌড় হয়। ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা দেখতে মাঠে ভিড় করে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। এবারের ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ঘোড়া লালন শাহের সওয়ারী মোহাম্মদ মোস্তাকিম রহমান (১০)।  মোস্তাকিম জানায়, তার বাড়ি বগুড়ার ধুনট উপজেলার ফরিদপুর গ্রামে। এ গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে সে। তৃতীয় শ্রেণি থেকে এবার চতুর্থ শ্রেণিতে উঠেছে। ঘোড়া লালন শাহ তার নানা। নানার কাছেই তার হাতেখড়ি। ঘোড়সওয়ারী হতে তার খুব ভালো লাগে। গত ২ বছর ধরে সে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। শীতকালে তার এই কাজ করতে বেশ ভালো লাগে। এবার সে এ নিয়ে প্রায় ১০/১২টি মেলায় অংশ নিয়েছে। বিজয়ী হয়েছে বেশ কয়েকটিতে।
 
২০১৬ সালে দিনাজপুর সদর থানার সালকি গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলাম। তখন ঘোড় সওয়ার সবুজের সাথে দেখা। কথা হলো তার সাথে। সেই বছর ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অনেকগুলো পুরস্কার জিতেছে সে। নিজের এলাকা ছাড়াও অনেক দূরের খেলাতেও অংশগ্রহণ করে জিতে এনেছে প্রথম পুরস্কার। সেবার ঘোড়দৌড়ে প্রথম পুরস্কার হিসেবে পেয়েছে দুটি গরু, একটি ছাগল, দুটি মোবাইল ফোন। আরো অনেক পুরস্কার হয়তো পেতো, কিন্তু বিধি বাম হওয়ায় আর সম্ভব হয়নি। দিনাজপুর পাঁচকুড় এলাকায় ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে তার ঘোড়া পায়ে ব্যথা পায়, যে কারণে বিভিন্ন এলাকায় পরের খেলাগুলোতে আর যোগদান করা সম্ভব হয়নি। তখন সবুজ হাসিমুখেই আমাকে তার বড় সাফল্যের কথা জানালো। বগুড়ার মেয়ে ঘোড় সওয়ার মারিয়াকে সে পরাজিত করে প্রথম পুরস্কার নিয়েছে। মারিয়া এই প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়েছিল। এটা তার বড় সাফল্য। কিন্তু এত সাফল্য যার ঘোড়দৌড় খেলায়, সেই সবুজের নিজের ঘোড়া নেই। তার গ্রামেরই শহীদ মেম্বারের ঘোড়ায় সে ঘোড় সওয়ার হিসেবে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। বিনিময়ে পায় কিছু অর্থ।
 
অন্যের ঘোড়া চালিয়ে ঘোড়া সওয়াররা মজা পান না। তারা চান নিজের ঘোড়া, যেটা দিয়ে ঘুরে বেড়াবেন গ্রাম-গ্রামান্তরে।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২১ জানুয়ারী, ২০১৮ ইং
ফজর৫:২৩
যোহর১২:১০
আসর৪:০২
মাগরিব৫:৪০
এশা৬:৫৬
সূর্যোদয় - ৬:৪২সূর্যাস্ত - ০৫:৩৫