সংস্কৃতি | The Daily Ittefaq

ছাপা অক্ষরের পাঠঘর

ছাপা অক্ষরের পাঠঘর
নুরুল করিম২০ জানুয়ারী, ২০১৮ ইং ১১:১২ মিঃ
ছাপা অক্ষরের পাঠঘর
 
ঢাকা শহরের পাবলিক জায়গাগুলোতে বইপড়ার দৃশ্য চোখে পড়ে না বললেই চলে। বইয়ের বদলে সবার হাতে থাকে মোবাইল। কেউ ফেসবুকে আছে, কেউ গান শুনছে কানে ইয়ারফোন গুজে...। বাসের মধ্যে ফোন নিয়ে এ প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের এমন দৃশ্যে দেখা যায় হারহামেশা! পার্কগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। পার্কে আড্ডা, প্রেম আর ফটোশুটের দৃশ্যগুলো প্রতিনিয়ত আমরা চোখে দেখলেও বইপড়ার দৃশ্য একেবারেই দেখি না। পার্ক বা পাবলিক বাসে বইপড়ার কথা তুললে অনেকেই বলে ওঠেন, এটা বইপড়ার জায়গা নাকি? বইপড়ার জন্য তো বাসা-বাড়িই যথেষ্ট! 
 
অথচ রুশদের সবচেয়ে ভালো বন্ধু বই। কথিত আছে, যে রুশরা হলো, বিশ্বের সবচেয়ে পড়ুয়া জাতি। কনস্তান্তিন বেলমন্ত, ভালেরি ব্রিউসভ, ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি, মারিনা সভেতায়েভা, বরিস পাস্তের্নাক, আলেক্সান্দ্র কুপ্রিন, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ইভান বুনিন, লেওনিড আন্দ্রেইভ, ফিওদোর সলোগুব, আলেক্সি রমিজভ, ইয়েভজেনি জামিয়াতিন, আন্দ্রে বেলিসহ আরো কত কত বিখ্যাত লেখক রাশিয়াকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন সম্মানী এক কাতারের উচ্চস্থানে। আমাদের দেশে দূরপাল্লার বাসে বা ট্রেনে কারো হাতে কদাচিত্ বই দেখা যায়। কিন্তু লোকাল বাসে দাঁড়িয়ে কাউকে বই পড়তে দেখা যায় না। কিন্তু রাশিয়ানরা যেখানে যান সেখানেই বইয়ের মাঝে ডুব দেন। হোক সেটা লোকাল বাস, মেট্রোরেল কিংবা যাত্রী ছাউনি। বই পড়ুয়া এমন মানুষের সংখ্যা এক-দুজন নয়, শতশত, হাজার হাজার। ২০০৮ সালে রাশিয়ায় বই নিয়ে জরিপ হয় এবং তাতে দেখা যায়, ৫৪ শতাংশ মানুষ নিষ্ঠার সঙ্গে বই পড়েন, ৪০ শতাংশ মানুষ নিয়মিত বই কেনেন, ৭০ শতাংশ পরিবারে ব্যক্তিগত পাঠাগার আছে। অথচ আমাদের দেশের কয়টি গ্রামে পাঠাগার আছে? গ্রামের কথা বাদ দিলাম, পাঠাগার নেই এমন ইউনিয়নও আমাদের দেশে আছে।
 
কয়েকদিন আগে জার্মান ঘুরে আসা এক বড় ভাইয়ের সাথে কথা হলো। চা-আড্ডাকালে তিনি শুধু জার্মান ভ্রমণের কথাই বলতে লাগলেন আমাকে। তার পুরো গল্পের বেশিরভাগই ছিল বই নিয়ে। তার কথায়, জার্মানরা বই না পড়ে থাকতে পারে না। রাস্তাঘাট, বাস, ট্রেন, নৌকা সব জায়গাতেই দেখা যায় বই পড়ুয়াদের। আমাদের যেমন চা ছাড়া একদম চলে না তাদেরও বই ছাড়া চলে না একদম! ফেসবুকে আপনি যখন বইয়ের ছবি আপলোড দেবেন দেখবেন কত বন্ধু বলছে, ইশ! আমার যদি থাকতো? অনেক বুক রিডার গ্রুপে দেখি, লাইব্রেরির ছবি দিলেই লোকজন আফসোস করে, আহা! আমি যদি যেতে পারতাম এখানে। কিন্তু মানুষ যায় কই? আর পড়েই বা কই? চায়ের দোকান, হাটে, মাঠ-ঘাটে অনেকের সাথেই তো আমাদের সামাজিকতা। হাতে বই দেখলেই প্রশ্ন, এখানে এসেও তোকে বই পড়তে হবে? আর সত্যজিত্ রায়ের সিনেমা হীরক রাজার দেশের ডায়লগ সবাই দেয়-জানার কোনো শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই! হীরক রাজার দেশে সিনেমার কথা বলতে বলতে মনে পড়ে গেল সিনেমার কিছু দৃশ্যের কথা। ছোটবেলা থেকেই আমি সিনেমাপ্রেমী। বাংলা, হিন্দি কিংবা তামিল ছবিতে তখন একটা দৃশ্য খুবই কম ছিল। লাইব্রেরিতে নায়িকা বই নিয়ে যাচ্ছেন, নায়কের হাইয়ে লেগে বইগুলো মাটিতে পড়ে গেল। তারপর নায়ক-নায়িকা দু’জন মিলে বইগুলো তুলছেন! সেই থেকে প্রেম শুরু। কিন্তু বর্তমানে সেই দৃশ্যের বালাই নেই বললেই চলে। এখনকার সিনেমায় প্রেম হয় ফেসবুকে চ্যাট করতে গিয়ে, কোথাও ঘুরতে গিয়ে। সিনেমা দেখেও বর্তমানে বোঝা যায়, বইপড়া সংস্কৃতিটা আমাদের দেশে এখন নেই বললেই চলে।
 
আমাদের আশেপাশের মানুষদের কমন ডায়ালগ আগে খুব পড়তাম, হুমায়ূন আহমেদ, সমরেশ, সুনীল। এখন আর পড়ি না, পড়ার অভ্যেস নেই। সময় না পেলে ভিন্ন কথা। কিন্তু আগে পড়ার অভ্যেস ছিল এখন নেই তার মানে হলো, সেই মানুষ কোনোকালেই ভালোবেসে পড়তো না। আমরা কোনোকালেই পড়ুয়া জাতি না। আমাদের পাঠভ্যাসও যতদূর পাঠ্যপুস্তক কেন্দ্রিক। আগেও তাই ছিল, এখনো তাই। কমছে শুধু কোয়ালিটি পাঠকের সংখ্যা। আমরা কিছু বইকে ‘পাঠ্যবই’ নাম দিয়ে প্রকারান্তরে অন্য বইগুলোকে ‘অপাঠ্য বই’ বলি। রুশদের কাছে ‘পাঠ্যবই’ বলে আলাদা কিছু নেই, সব বই-ই পাঠ্য। বই তারা পাঠ করে জীবনকে বোঝার জন্য, জীবনকে সুন্দরভাবে উদযাপন করার জন্য। স্কুল-কলেজের বইয়ের ভার ও ভয়ে কাবু হতে হয় না তাদের। ভ্রমণ ব্যাগে তো থাকবেই, অফিসের ব্যাগেও টিফিন, পানি, ছাতার সঙ্গে একটি বই থাকবে না এটা অবিশ্বাস্য। তবে এটা ঠিক যে, রাশিয়া বা জার্মানির মতো আমাদের দেশে বইঘর নেই। যেখানে নিজের মতো করে বই পড়বে, আড্ডা দেবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় বেশকিছু বইঘর গড়ে উঠেছে। যেখানে আপনি বিনা পয়সায় বই পড়তে পারবেন, ইচ্ছে করলে কিনতে পারবেন। এছাড়া সাহিত্য আড্ডা দেওয়ার মতো রয়েছে নির্ধারিত জায়গা। পুস্তক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে বাতিঘর, বেঙ্গল বই ও দীপনপুর অন্যতম।
 
দীপনপুর
 
বইয়ের দোকানের কথা বললেই চোখের সামনে দিব্যি ভেসে ওঠে সারিসারি বইয়ের দৃশ্য। দোকানটি খুব অল্প-সল্প জায়গার মধ্যে। কোথাও খানিক অন্ধকার, আবার কোথাও ঝকঝকে আলোর সমাহার। দাঁড়িয়ে ভালোমতো বই পরখ করে কিনবেন অনেক সময় সেই সুযোগও পাওয়া যায় না। কেননা পেছনেই দাঁড়িয়ে আছেন আরো সব ক্রেতা। তাদেরকেও তো সুযোগ দিতে হবে! কিন্তু দীপনপুরে গেলে আপনার এই ধারণাটা সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে। দীপনপুর হচ্ছে এমন একটি বইয়ের ভুবন যেখানে বাংলাদেশের সব স্বনামধন্য প্রকাশনীর উল্লেখযোগ্য বইয়ের সমাহার থেকে পছন্দের বইটি খুুঁজে পাবেন। দীপনপুরে বই আছে প্রায় ১০ হাজার। এককাপ চা বা কফির সঙ্গে বইটি বসে পড়তেও পারবেন। প্রয়োজনীয় বইটি খুঁজে না পেলে অর্ডার দিয়ে যাবেন, যথা সময়ে তা আপনার বাড়িতে পৌঁছে দেবে দীপনপুরের বাসিন্দারা। অনলাইনে বই অর্ডারের সুবিধা রয়েছে। বইয়ের রাজ্য ছাড়াও রয়েছে ‘দীপনতলা’ নামে অনুষ্ঠানস্থল। চাইলে যে কেউ এখানে সাহিত্য, কবিতাপাঠ, বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে পারবে। রয়েছে ‘ক্যাফে দীপাঞ্জলি’। এখানে বইপড়া ও দেখার পাশাপাশি চা, কফি ও ফ্রেশ জুস পাওয়া যাবে। পাওয়া যাবে স্বাস্থ্যসম্মত নাশতা। রয়েছে শিশু-কিশোরদের জন্য স্বপ্নরাজ্য ‘দীপান্তর’। শিশুরা এ কর্নারে বই পড়তে পারবে, আঁকতে পারবে, খেলতেও পারবে।
 
২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর ঘাতকের হাতে প্রাণ যাওয়া প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনের। দীপনের দীপশিখা জ্বালিয়ে রেখেছেন তার স্ত্রী ‘দীপনপুর’ নামে বইয়ের একটি বিশাল বুকশপ প্রতিষ্ঠা করে। দীপনের স্ত্রী ডা. রাজিয়া রহমান জলির উদ্যোগ এবং কয়েকজন বন্ধুর সহযোগিতায় ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে দৃশ্যমান হয়েছে ‘দীপনপুর’।
 
কোন ধরনের ক্রেতারা দীপনপুরে আসেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. রাজিয়া রহমান বলেন, ‘শোবিজ তারকারা যেমন নাতি-নাতনী নিয়ে আসেন তেমনি আপাদমস্তক কালো বোরখায় ঢাকা কনজারভেটিভ পরিবারের মেয়েরাও আসেন। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার ছাত্ররাও আসেন। পেশাজীবী মানুষজন আসেন। এছাড়াও বসে বসে লেখাপড়ার সুযোগ থাকায় গবেষণা করছেন এমন গবেষকরাও আসেন। তারা নানা বই ঘেঁটে নোট তৈরি করেন। প্রয়োজন মনে করলে বই কেনেন, না হলে বসে বসে পড়েন।’
 
ডা. রাজিয়া রহমান আরো বলেন, ‘দীপনপুরে দীপান্তর নামে শিশুদের জন্য বিশেষ জায়গা আছে। এখানে বাচ্চারা ছবি আঁকতে পারে। খেলাধুলা করতে পারে। বইও পড়তে পারে। পাঠক পড়তে পড়তে ইচ্ছে করলো চা, কফি বা স্ন্যাকস খাবে, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার হাতের কাছে পাচ্ছে। নামাজঘর আছে। বসে বইপড়ার ব্যবস্থা আছে। কেউ ইচ্ছে করলে সারাদিন বসে বই নোটও করতে পারবে।’
 
দীপনপুর নিয়ে কাজ করেন আলমগীর আমি। তিনি বলেন, ‘এই জায়গাটা আসলে একইসাথে একটি লাইব্রেরি এবং একটি ক্যাফে। শুধু তাই নয়, একদম জিরো পেমেন্টে এখানে বসে আপনি বই পড়তে পারবেন নিজের ইচ্ছেমতো। তাই বই পড়ুয়াদের স্বর্গই বলা যায় দীপনপুরকে। এখানে বসে বই পড়তে আপনার কোনোরকমের এন্ট্রি ফি বা মেম্বারশিপের হ্যাপা পোহাতে হবে না। অন্যদের বিরক্ত না করে নিজে বসে বই পড়ুন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত, কেউ ঘাটাতে আসবে না আপনাকে। সপ্তাহের প্রতিটি দিন, এমনকি ছুটির দিন, হরতাল সবসময়েই খোলা দীপনপুর, সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত।’
 
বেঙ্গল বই
 
বইয়ের মাঝে ডুব দিতে চাইলে যেতে পারেন বেঙ্গল বইয়ে। যেখানে দেশি-বিদেশি বই বিক্রির সাথে পড়ুয়াদের জন্য ভিন্ন আমেজ আর আড্ডার ব্যবস্থাও রয়েছে। বেঙ্গল বইয়ের প্রথম তলায় রয়েছে তরুণদের জন্য আড্ডা দেওয়ার ব্যবস্থা। এখানে বসে পড়া যাবে পুরোনো বই। পছন্দ হলে কোনো বই নিয়েও যাওয়া যাবে, সেটি ফেরতও দিতে হবে না। তবে তার একটা বিনিময়মূল্য হিসেবে নিজের সংগ্রহ থেকে দুটি বই এখানে দিয়ে যেতে হবে। তরুণরা যেন এই জায়গাটাকে নিজের জায়গা ভাবতে পারে সেজন্যই এ ব্যবস্থা। একটা দেওয়া-নেওয়ার জায়গা তৈরি করা। তার পাশেই রয়েছে একটি উন্মুক্তস্থান, যেখানে সাহিত্য, কবিতাপাঠ, বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে পারবে।
 
বাংলাদেশের ২৫টি ও ভারতে ১৫টি প্রকাশনার বই পাওয়া যাবে এখানে। গল্প, উপন্যাস থেকে শুরু করে মিলবে শিল্পকলা, সাহিত্য, স্থাপত্যবিষয়ক বইও। বাংলাদেশের প্রকাশিত যেকোনো বই ২০ শতাংশ ছাড়ে কিনতে পারবেন। তবে ভারতীয় বইয়ের ক্ষেত্রে বইয়ের মূল্যের দ্বিগুণ পরিশোধ করতে হবে। বেঙ্গল বইয়ের মার্কেটিং বিভাগের হাসিব বলেন, ‘এখানে মোট ১২ হাজারের মতো বই রয়েছে। তবে আমাদের পরিকল্পনা ছিল ৫০ হাজার বই রাখা। বই প্রদর্শনীর মতো রাখতে গিয়ে ১২ হাজারের মতো রাখতে পেরেছি।’
 
বেঙ্গল বই কর্তৃপক্ষ জানান, বেঙ্গল বইয়ে মিলবে দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য সব প্রকাশনীর উল্লেখযোগ্য বই। প্রশস্ত আঙিনায় বসে পড়া যাবে বই বা সাময়িকী। পড়তে পড়তে সেই বই বা ম্যাগাজিনটি পছন্দ হলে বাড়িতে নিয়েও যাওয়া যাবে। বইপড়া ও দেখার পাশাপাশি চা, কফি ও ফ্রেশ জুস পাওয়া যাবে। পাওয়া যাবে স্বাস্থ্যসম্মত নাশতা। রয়েছে শিশু-কিশোরদের জন্য স্বপ্নরাজ্য ‘আকাশ কুসুম’। শিশুরা এই কর্নারে বসে বই পড়তে পারবে, আঁকতে পারবে। খেলতেও পারবে।
 
বেঙ্গল বইয়ের তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলাজুড়ে আছে দেশি-বিদেশি বই। দোতলা মূলত বই কেনার জায়গা। নানা ধরনের বই এখান থেকে সবাই কিনতে পারবেন। দোতলার বারান্দায় বসে কফি খেতে খেতে গল্প করা যাবে। অসুস্থ বা প্রতিবন্ধীরা হুইলচেয়ারে পুরো জায়গা ঘুরে নিজের পছন্দমতো বই কিনতে পারবেন। তৃতীয় তলাটা বাচ্চাদের। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘আকাশ কুসুম’। বাচ্চাদের বইপড়া, খেলাধুলার ব্যবস্থা আছে এখানে। মিলবে পাঠ্যপুস্তকও। খাতা, কলম, পেন্সিলও পাওয়া যাবে। মিলবে ছবি আঁকার কাগজ, তুলি, রঙ। মাঝে মাঝে বাচ্চাদের জন্য এখানে হবে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান। বাবা-মায়েদের জন্য আছে ম্যাগাজিন পড়ার ব্যবস্থা।
 
বইয়ের পাশাপাশি আছে লেখাপড়ায় সহায়ক নানা আকর্ষণীয় সামগ্রী।  বেঙ্গল বইয়ে নিয়মিত পাঠচক্র, কবিতাপাঠের আসর, নতুন লেখা ও লেখকের সঙ্গে পরিচিতিমূলক সভা, প্রকাশনা উত্সব, চিত্র ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজন থাকছে। ছুটির দিনগুলোয় প্রিয়জনদের নিয়ে বাগানে বসে চলতে পারে আড্ডা।
 
বাতিঘর
 
বইপোকারা চট্টগ্রামে বেড়াতে গেলে ‘বাতিঘর’-এ ঘুরে আসতে ভুল করেন না একদম! বাতিঘরে ঢুকলেই চমক। জাহাজের কেবিনে হালকা সুরে বাজছে দূর সমুদ্রের গান। মেঝেতে কাঠের পাটাতন, ছাদে ঝুলছে নোঙর ফেলার মোটা রশি, ঈষত্ পড়ে রয়েছে পণ্যবাহী কনটেইনার। জানালায় চোখ দিলে মনে হবে এ যেন এক সমুদ্রগামী জাহাজ, ফেনিল ঢেউ পাড়ি দিয়ে ছুটছে আলোকের সন্ধানে। আসলে এ হলো শিল্পের মায়া, অভ্যন্তরীণ সজ্জার এক  প্রদর্শনী। এটি কোনো জলযান নয়, এটি একটি বইয়ের দোকান, এর নাম বাতিঘর। জাহাজের আদলে দোকানের অভ্যন্তরীণ সজ্জায় তুলে ধরা হয়েছে রূপসি চট্টগ্রাম তথা বন্দরনগর চট্টগ্রামকেই। ঢাকার বইপোকাদের জন্য ‘বাতিঘর’ এখন রাজধানীতে। বইপোকাদেরই দেখে পড়ে বই কেনার সুযোগ করে দিতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভবনের অষ্টম তলায় যাত্রা শুরু করে বইয়ের দোকান ‘বাতিঘর’। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা শাখার বিষয়াবলির পাশাপাশি খেলাধুলা, রাজনীতি ও সমকালীন বিজ্ঞান, দর্শন আর লোকসংস্কৃতির ওপর রচিত লক্ষাধিক বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে এখানে। ভ্রমণ, বাংলা ও বাঙালি ও বিশ্বসভ্যতার বিকাশ, ইতিহাস, সমাজ চিন্তা, রাজনীতির নানা বিষয় নিয়ে সাজানো হয়েছে ভ্রমণ ও প্রবন্ধ কর্নারটি। যারা কবিতা ভালোবাসেন তাদের জন্য রয়েছে কবিতা কর্নার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, আসাদ চৌধুরীসহ বাংলার শত কবির কাব্যগ্রন্থ পাওয়া যাবে এখানে। লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস গবেষকদের জন্য রয়েছে লোকসংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, থিয়েটার, শিল্প ও স্থাপত্য ও ইতিহাস কর্নার। বাতিঘরে আরো রয়েছে সাংবাদিকতা, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও গণিত, খেলাধুলা, কল্পবিজ্ঞান, রম্য রচনা, রহস্যগল্প কর্নার। রয়েছে লিটল ম্যাগাজিন, সাহিত্য সাময়িকী কর্নার ও ক্যাফে। বাতিঘরের কর্ণধার দীপঙ্কর দাশ বলেন, ‘এটা সবার জন্য উন্মুক্ত। এখানে এসে পাঠকরা তাদের পছন্দের বই নিয়ে পড়তে পারবেন। বাতিঘরে রয়েছে একটি ছোট্ট মঞ্চ, যেখানে বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান করা যাবে। এক কথায়, আমাদের দেশে বই পড়ুয়া বাড়াতে বাতিঘর আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।’ অভ্যন্তরীণ সজ্জায় মুঘল স্থাপত্য বিশেষত লালবাগ কেল্লার আদলে নির্মিত ঢাকার বাতিঘর-এ পাঠকরা তাদের পছন্দের বই নিয়ে পড়তে পারবেন বইঘরে বসেই। তাদের জন্য চেয়ারগুলো সাজানো হয়েছে মুঘল রীতি অনুযায়ী। যে পেয়ালায় চা আসবে, তাও নির্মিত হয়েছে মুঘল রীতির কারুকার্যে।   ছোট্ট মঞ্চটি নির্মিত হয়েছে লালবাগ কেল্লার পরীবিবির মাজারের আদলে। লাল ইটের দেয়ালের মতো সাজানো হয়েছে বইঘরের দেয়াল। সেলস কর্নারটি সাজানো হয়েছে ফতেহপুর সিক্রির মতো করে, যেখানে বসে গান করতেন সঙ্গীতজ্ঞ তানসেন। শিশু কর্নারটি সাজানো হয়েছে কাঁচ ও কাঠ খোদাইয়ের বাহারি নকশায়। ‘বাতিঘর’ থেকে একসঙ্গে ৫ হাজার টাকার বই কিনলে দেওয়া হবে একটি প্রিভিলেজ কার্ড। এই কার্ডটি দিয়ে গ্রাহক ১ বছর বই কেনায় মূল্য ছাড় পাবেন। তবে গ্রাহকরা এখান থেকে কোনো বই বাসায় নিয়ে পড়তে পারবেন না।
 
ঢাকা শহরে আমরা বাচ্চাদের জায়গা দিতে পারি না। স্কুলগুলো কারাগারের মতো। তাই তাদের জন্য জায়গা করতে এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। বাতিঘরের কর্ণধার দীপংকর দাস আমার সাহায্যে এগিয়ে না এলে এই জায়গা করা সম্ভব ছিল না। তার পরামর্শেই এই জায়গা করা। দীপনপুরের মধ্য দিয়ে আমরা দীপনের স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করবো। আগামী প্রজন্ম যেন জানতে পারে তার কথা, তার আত্মত্যাগের কথা।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৬
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৩
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬