সংস্কৃতি | The Daily Ittefaq

বৈশাখের প্রাণের মেলা

বৈশাখের প্রাণের মেলা
মোকারম হোসেন১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ইং ০৮:৫০ মিঃ
বৈশাখের প্রাণের মেলা
বর্তমানে বৈশাখী মেলা আমাদের ঐতিহ্য চেতনার অংশ হয়ে উঠেছে। বর্ষবরণকে ঘিরে যে নানামুখী আয়োজন তার প্রধান অনুষঙ্গ বৈশাখী মেলা। এই মেলা এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। দেশেও বেড়েছে ব্যাপ্তি। বর্তমানে বর্ষবরণকে ঘিরে নানামুখী আয়োজন বাঙালির অন্যতম লোকউত্সবে পরিণত হয়েছে। প্রাণের এই উত্সবের রয়েছে সুদীর্ঘ এক ইতিহাস। এই জনপদে নববর্ষের সূচনা হয় পয়লা বৈশাখে বাংলা সনের প্রবর্তনের সময় থেকেই। অর্থাত্ ৯৬৩ হিজরি সনের ২৮ রবিউল-আখের মোতাবেক ১০ অথবা ১১ মার্চ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে বাংলা সন গণনার তারিখ কার্যকর হয়। এই সন প্রবর্তনের পূর্বেও বঙ্গদেশে ‘লক্ষ্মণ সেন’ প্রচলিত গণনা পদ্ধতি বলবত্ ছিল। স্বয়ং ‘আকবারনামা’য় এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
 
নববর্ষে ঐতিহ্যগতভাবে বৈশাখী মেলা, খেলাধুলা, গঙ্গায় স্নান, পুণ্যাহ, হালখাতা, ঘোড়দৌড়, ভূমিকর্ষণ, রকমারি স্বাদের খাবার, নতুন পোশাক-পরিচ্ছদ, নৃত্য, যাত্রা ইত্যাদির আয়োজন হয়। এটি এখন নববর্ষের ঐতিহ্যিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। প্রসঙ্গত বিখ্যাত লোকসংস্কৃতি গবেষক শামসুজ্জামান খান উল্লেখ করেন— ‘বাংলা সন’ প্রবর্তিত হওয়ার পর বাঙালির প্রাচীন উত্সব-অনুষ্ঠান, মেলা, লৌকিক খেলাধুলা, হালখাতা, পুণ্যাহ প্রভৃতি এ সনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে কোনো বাধা সৃষ্টি হয়নি। অর্থাত্ বাঙালির লোকজীবনের সাংস্কৃতিক ধারাকে বাংলা সন বিচ্ছিন্ন না করে বরং জোরদার করেছে।
 
বৈশাখজুড়েই ছোট-বড় নানা ধরনের মেলা বাংলাদেশের নানা স্থানে অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। সাধারণত গ্রামাঞ্চলের বট বা অশ্বত্থের নিচেই এসব মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এতে লোকশিল্পের চমত্কার সমাবেশ ঘটে। সাধারণত স্থানীয় লোকদের উদ্যোগেই এসব মেলার আয়োজন হয়। ইদানীং সরকারি উদ্যোগেও বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রাজধানী কিংবা শহরকেন্দ্রিক মেলাগুলোতেই বেশি বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। পাশাপাশি এসব স্থানে বিনোদনের ব্যবস্থাও বিবেচ্য বিষয়।
 
বৈশাখী মেলা সাধারণত এক দিন থেকে তিন দিন অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক সপ্তাহও স্থায়ী হয়। আবার কোথাও কোথাও একমাসের জন্যও মেলা বসে। বস্তুত বৈশাখী মেলা বাঙালির সার্বজনীন উত্সবের এক ভগ্নাংশ মাত্র। বর্তমানে এটি একটি সাংস্কৃতিক লোক-উত্সবে পরিণত হয়েছে সারা দেশে।
 
এ দেশে জমিদারি খাজনা আদায়ের লক্ষ্যেই সম্ভবত বৈশাখী মেলার পত্তন ঘটে। অনেকের ধারণা, খাজনা আদায়কে একটি আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য মূলত চৈত্রসংক্রান্তির মেলার উত্পত্তি হয়েছিল। বৈশাখী মেলা বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির আয়নাবিশেষ। ধারণা করা হয় যে এর বয়স ১৫০ থেকে ৬০০ বছরের পুরোনো। বর্তমানে বাংলাদেশে মেলার সংখ্যা ১৬০০ থেকে ১৮০০টি। আর বৈশাখ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত মেলার সংখ্যা ৩০০-৩৫০টি। এগুলো অবশ্যই প্রাচীন এবং যেকোনো নির্দিষ্ট স্থান ঘিরে আয়োজিত হয়।
 
বর্তমানে অধিকাংশ শহরে বেশ পরিকল্পিতভাবে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হলেও মূলত এ ধরনের মেলা অতিমাত্রায় গ্রামকেন্দ্রিক। গ্রামেই এসব মেলার আবেদন বেশি। গ্রামেগঞ্জে কৃষক, তাঁতি, কামার, কুমোর, ময়রা, স্যাকরা এবং অন্য শিল্প ও কারিগরেরা যেসব সামগ্রী তৈরি করে বৈশাখী মেলায় তা প্রদর্শন ও বিক্রির সুযোগ পায়। গ্রামীণ কৃষিজাত পণ্য, কুটিরশিল্পজাত পণ্য, মিষ্টান্ন দ্রব্য, মাটির তৈরি শিল্পসামগ্রী প্রভৃতি নিয়ে ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা মেলায় দোকান সাজিয়ে বসে। বাঁশ ও তালপাতার রঙিন বাঁশি, ভেঁপু, ডুগডুগি, একতারা, দোতারা, বেলুন, লাটিম, মার্বেল, ঘুড়ি-লাটাই, চরকি, পুতুল, কাঠের ঘোড়া, মাটির হাঁড়ি-বাসন, কলস, পুঁতির মালা, চুড়ি ইত্যাদি জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসে দোকানিরা। এছাড়া আছে কাঠের আসবাব খাট-পালঙ্ক, চেয়ার-টেবিল, চৌকি, আলনা, আলমারি, পিঁড়ি, ঢেঁকি, গাড়ির চাকা প্রভৃতি। কামারশালায় তৈরি নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক জিনিসও মেলায় পাওয়া যায়। ময়রারা তৈরি করে নানা রকম মিষ্টান্ন দ্রব্য খাজা, মণ্ডা, ছাঁচের মিঠাই, বাতাসা, কদমা, জিলাপি, নকুলদানা ইত্যাদি। এসব আগে যেমন ছিল এখনো তেমনি মেলার প্রচলিত রীতিকে ধরে রেখেছে। মুড়ি, মুড়কি, খই, চিড়ে, মোয়া, তিলের লাড্ডু, বুট, চানাচুর, মটরভাজা এখনো মেলায় প্রিয় খাবার।
 
একসময় বৈশাখী মেলার প্রধান ক্ষেত্র ছিল গ্রাম। কালক্রমে মেলার স্থান গ্রাম থেকে শহরে বিস্তৃত হয়েছে। পয়লা বৈশাখ বর্ষবরণের দিন হিসেবে সারা দেশ সাংস্কৃতিক উত্সবে পরিণত হয়েছে। ধীরে ধীরে রাজধানী ঢাকা হয়ে উঠেছে এই উত্সবের কেন্দ্রস্থল। ছায়ানট, বাংলা একাডেমি, নজরুল একাডেমি, শিশু একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ঢাকায় নববর্ষের উত্সব উদযাপিত হয়ে আসছে। আগে বৈশাখী মেলার মূল কেন্দ্র ছিল বাংলা একাডেমি। বাংলা ১৩৮৫ সন থেকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সংস্থা (বিসিক) ধানমন্ডি মাঠে নিয়মিত বৈশাখী মেলার আয়োজন করে আসছে। এই মেলার ব্যাপ্তিকাল ৭ দিন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত বিসিক-এর বৈশাখী মেলা দেশব্যাপী মানুষের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগিয়েছে।
 
কিছু কিছু বৈশাখী মেলা বেশ প্রাচীন ও আদৃত। ঐতিহ্যবাহীও বটে। চট্টগ্রামে বৈশাখী মেলার অন্যতম পর্ব ‘জব্বারের বলি খেলা’। একদিনের এই বলি খেলা উপভোগ করতে সমবেত হয় অসংখ্য মানুষ। চৈত্রের শেষে চট্টগ্রামের বৌদ্ধসম্প্রদায় আয়োজন করে ‘মহামুনির মেলার’। এই মেলা বর্ষবরণেরই অংশ। চট্টগ্রামের আদিবাসী মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরাদের বর্ষবরণ উত্সব পরিচিত সাংগ্রাই, বিজু বা বিহু নামে।
 
কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়ার চান্দলা গ্রামের বৈশাখী মেলা একটি বিখ্যাত মেলা। এই মেলা বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোকর্ণঘাট, ভাদুঘর, খড়মপুর, নবীনগর প্রভৃতি স্থানে বৈশাখী মেলা জমে ওঠে। তিতাস নদীর তীরে ভাদুঘরের মেলা বসে বৈশাখের ১৪ তারিখ। হাজার হাজার মানুষ আসে এই মেলায়।
 
উত্তরবঙ্গের উল্লেখযোগ্য বৈশাখী মেলার মধ্যে দিনাজপুরের আমবাড়ির মেলা, বগুড়ার গাঙনগর মেলা, পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির শীতলী মেলা, রংপুরের সিন্দুরমতি মেলা, যশোরের নিশিনাথতলার মেলা ও কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার বিত্তিপাড়ায় ঘোড়াপীরের আস্তানায় ওরস উপলক্ষে বৈশাখ মাসে বিশেষ মেলা বসে। এই মেলা চলে মাসব্যাপী। বরিশালে বাকালের মেলাও বিখ্যাত। এমন অসংখ্য মেলায় মুখরিত থাকে বৈশাখের দিনগুলো। আমাদের সংস্কৃতির অনিবার্য উত্সব হিসেবে বৈশাখ বেঁচে থাকবে অনন্তকাল।
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩৩
যোহর১১:৫১
আসর৪:১২
মাগরিব৫:৫৫
এশা৭:০৮
সূর্যোদয় - ৫:৪৮সূর্যাস্ত - ০৫:৫০