সংস্কৃতি | The Daily Ittefaq

চিরকালের বৈশাখ

চিরকালের বৈশাখ
হাসান আজিজুল হক১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ইং ০৯:২৬ মিঃ
চিরকালের বৈশাখ
আকবরের সময়ে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা মিলে একটা সুবে বাংলা হয়েছিল। সেটা বহুকাল টিকল। ঔপনিবেশিক শাসনেও সেটা অক্ষত ছিল বহুকাল। পহেলা বৈশাখ হচ্ছে নববর্ষের উত্সবের দিন। কৈশোরে বিশাল মাঠে চলে যেতাম। সে মাঠ ছিল সবুজ, আর বিশাল আকাশ। সে মাঠে যাওয়ার আগে দেখে নিতাম একবার, আকাশে মেঘ জমেছে কি-না। কালবৈশাখী হবে কি-না। পয়লা বৈশাখ থেকেই আরম্ভ হয়ে যেত কালবৈশাখী। এটা মনে থাকার কারণ হচ্ছে, চৈত্রসংক্রান্তির দিনে, শেষ দিনে আমাদের পাশের গ্রামে একটা বি শাল পুজোর আয়োজন হতো এবং তারপরই একটা মেলা বসতো। মেলাটা হতো পয়লা বৈশাখে। খুব বড় মেলা। এই মেলার স্মৃতি নিয়ে আমি অনেক কথা লিখেছি এবং ভবিষ্যতে আরও কিছু লেখার প্রত্যাশা করি। আমি জানতাম, মেলা যেদিন থেকে শুরু হবে কালবৈশাখীও সেদিন থেকে শুরু হবে এবং তাই-ই হতো। আর দেরিও হতো না তেমন। ঠিক যেমন বসন্ত চলে গেল, বৈশাখ এসে প্রবেশ করল। এটা পরিষ্কার বোঝা যেত।
 
কালবৈশাখীর সময় মেলায় যাব, মেলাতে তো প্রতিদিন যাওয়া হতো না; পয়সা কিছু জোগাড় হলে যেতাম। মেলায় যাব, বিকেলবেলা আকাশ একেবারে নীল, তীব্র রোদ। সেই সময় সাবধানে বেরুতে হতো। কারণটা হচ্ছে বোশেখ মাসের দুপুরবেলা বাবা চাইতেন ঘুমুতে হবে। ঘুম আসুক বা না আসুক, দুপুরবেলা ঘর অন্ধকার করে বাবা শুইয়ে রাখতেন। তখন মনে হতো বন্দিশালায় আটকে পড়েছি। খুব খারাপ লাগত। তখন গরম বা শীতকাল কোনো কিছু মানতে ইচ্ছে করত না। ফলে আমি অপেক্ষা করতাম, কখন রোদ পড়ে আসবে। কয়েক আনা পয়সা পেয়েছি, এটা নিয়ে মেলাতে যাব আর কি। বিকেলে যখন বের হব, আকাশ অত্যন্ত পরিষ্কার। কোনো মেঘ নেই। তৈরি হব, ঠিক সেই সময় পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে অথবা উত্তর-পূর্ব কোণও হতে পারে একটুখানি, খুব সামান্য বিদ্যুতের মতো আভাস দেখা গেল। এটাই হচ্ছে কুলক্ষণ। এরই মধ্যে আকাশের কোণে বিদ্যুতের মতো চিড়িক চিড়িক আলো বিচ্ছুরিত হতে লাগল। সে এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার, মেঘটাকে চিরে একটা বিদ্যুতের রেখা ঝিলিক দিয়ে চমকে উঠছে। পাঁচ মিনিট সময় লাগত না, কেমন করে সমস্ত আকাশ মেঘে ঢেকে গেল; পশ্চিমাকাশে প্রথমে এবং হুড়হুড় করে সমস্ত আকাশ। তারপর বিকট শব্দ, যেন কোথাও অনেকগুলো লোক একসঙ্গে শব্দ করছে, ওখানে তো গাছপালা কম, বিশাল মাঠ—একেকটা গাছ যেন মহীরুহ, উন্মুক্ত মাঠ দিয়ে, অনেক সময় মাঠেই থেকে যেতাম, সেই বিশাল মাঠ পেরিয়ে আসতাম কালবৈশাখীকে উপেক্ষা করে। যে দেখেনি সে এই অভিজ্ঞতাটা টের পাবে না। ধুলো আসছে, বাতাসে শুকনো পাতা কিছু আসছে আর একটা প্রকাণ্ড বেগ, সেই বেগটার কথা ভাবা যায় না।
 
আমাদের সময় মেলা হলো, সে মেলায় ঢুকে প্রথম যে জিনিসটা পেতাম, তা হলো তালের শাঁস। তালের শাঁসের পসরা পেরিয়ে গেলে পাওয়া যেত হরেক রকমের মিষ্টান্ন, তারপর মাটির পাতিল, কলসি, এরকম নানা জিনিস। কী বিশাল বিশাল পাতিল যে ছিল তা বলে বুঝানো যাবে না। এসব পাতিলে মাকে রাঁধতে দেখতাম। ১৯৫৪ সালে আমরা যখন শহরে আসি, তার আগ পর্যন্ত গ্রামে মা মাটির বাসনে রান্না করতেন বলেই দেখে এসেছি। এরপর মেলায় আরেকটি জিনিস আমাদের ভীষণভাবে আকর্ষণ করত, তা হলো বিপুলাকার চরকি। এটায় চড়ে আমরা প্রায় আকাশ ছুঁয়ে ফেললাম। কী বিশাল ছিল এর অবয়ব। এরকম একটা উত্সবের আবহ ছিল সে সেময়ের বৈশাখে দিনে। আমরা প্রাণভরে তা উপভোগ করতাম।
 
লেখক : কথাসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩০
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৭
মাগরিব৬:০২
এশা৭:১৫
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৭