সংস্কৃতি | The Daily Ittefaq

ভালোর মাসপয়লা

ভালোর মাসপয়লা
ইমরান উজ-জামান১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ইং ১১:৪৮ মিঃ
ভালোর মাসপয়লা
মা খুব সকালে ঘুম থেকে তুলে দিতেন। নিজহাতে গোসল করাতেন। সরিষার তেল গায়ে মাখিয়ে দিয়ে, নতুন কাপড় পরিয়ে দিতেন। এরপর বলতেন, যাও—
 
আজকে মাসপয়লা, কারো সঙ্গে খারাপ কথা বলা যাবে না, কারো সঙ্গে ঝগড়া করা যাবে না। মাসপয়লার দিন ঝগড়া করলে সারাজীবন ঝগড়া করতে হবে।
 
আগে থেকেই মা বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার করে রাখতেন। বাবা মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বাড়ির উঠানে পা দিয়েই হাঁক ছাড়তেন—কই গো, উগুড়-এ পটাশ আছে নামিয়ে দাও। উগুড় হলো ঘরের ভিতরে যেকোনো একপাশে শস্য রাখার মাচান। বাবা মুন্সীরহাট থেকে হাটবারে পটাশ এনে রেখে দিয়েছেন। পটাশ হলো কাঠির মাথায় রঙিন কাগজে মোড়ানো ইটের গুঁড়ার সঙ্গে বারুদ পেঁচানো। যা ফোটালে ফটাস করে আওয়াজ হয়। মা পটাশ উগুর থেকে এনে হাতে দিতেন। ঘরের ছনছায় রাখা ইটের সঙ্গে আঘাত করে ফোটানো হতো সেই পটাশ। সেই সময় গ্রামে মসজিদ ছাড়া কোনো দালান ছিল না। ঘরের টিনের চালের গড়ানো বৃষ্টির পানি যেখানটাতে পড়ে, সেই জায়গাটাকে ছনছা বলে। পানি পড়তে পড়তে গর্ত হয়ে যায় বলে সেই জায়গাটাতে ইট রাখা হতো। সেই ইটের ওপর প্রথম পটাশটা ফাটাতাম আমরা। কাঠিতে ধরে রঙিন কাগজে মোড়ানো অংশটা ইটের ওপর আঘাত করলে ফটাস করে একটা আওয়াজ হতো। এই হলো পটাশ ফোটানো। আবার কখনো পিঁড়ির ওপর আঘাত করে পটাশ ফোটানো হতো। পটাশ নিয়ে সারা গ্রাম ঘুরে প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে বাড়ি এসে বিশেষ খাবার খেতে বসতাম। ঘরে পোলাও অথবা বিশেষ কোনো রান্না হতো। মা বলতেন মাসপয়লায় ভালো কিছু খেতে হবে, তাহলে সারা বছর ভালো কিছু রিজিকে জুটবে।
 
এই যে ভালো দেখা, ভালো শোনা, ভালো খাওয়া আর ভালো স্বভাব চর্চা করার প্রচলন। এটাই চিরকালীন বাঙালিয়ানা। ভালোর উত্স খুঁজতে গেলে কিন্তু প্রকৃতির কথাই মনে পড়ে। আসলে প্রকৃতি থেকেই আমরা ভালোর চর্চা শিখেছি। আমরা নতুন বছর আগমনের বার্তাবাহক প্রকৃতির পাতা ঝরার মর্মরধ্বনি থেকে বিভাগী হতে শিখেছি। আবার নতুন পাতার পবনের তালে পতপত শব্দে নতুন আশায় বুক বেঁধে মাসপয়লা আবাহনে মনোনিবেশ করেছি। ভালো খেতে ভালো পড়তে গিয়ে বর্ণিল রঙের চর্চা করেছি। বিক্রমপুর অঞ্চলের নকশা পিঠা নন্দনচর্চার উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়। 
 
ঘর, ঘরের চৌকাঠ ও ঘরের পিঁড়া মাসপয়লায় নকশা করার প্রচলন ছিল। চালের গুঁড়া পানির সঙ্গে মিশিয়ে সফেদ রঙের মিশ্রণ করে, সেই মিশ্রণের রঙে ঘরের চৌকাঠ ও পিঁড়া নকশা করা হতো। এই সময়ে গ্রাম্য প্রকৃতির একমাত্র ফুল ডুমুর হলো মাসপয়লা বরণের প্রধান অনুষঙ্গ। তার ব্যবহারও মাসপয়লার আগমন পথকে সুশোভিত করত। হিন্দু ধর্মের ধর্মীয় অনুষঙ্গ  লক্ষ্মীসরাকে প্রথম পটশিল্পচর্চা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। এর আগে মানব শরীরে আলপনা বা এখন যাকে উল্কি বলে তার প্রচলন ছিল। দারু বা কাঠের নন্দনচর্চার প্রচলন আছে ঘরের চৌকাঠে। হিন্দু বাড়িতে ঘরের দরজা ও চৌকাঠে কালি অথবা অন্য দেবতার প্রতিকৃতি আঁকা ও মুসলমান বাড়িতে ফুল পাখি, লতা-পাতা আকার প্রচলন আছে এখনো। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের মাচান ঘরেও পাখির পালক দিয়ে চৌকাঠ সাজানোর প্রচলন আছে। ঘরের ভেল্কি অথবা নৌকাতে টিন কেটে সজ্জিত করার প্রচলন এখনো আছে।  
 
এছাড়া বছরের প্রথম দিনে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যে হালখাতা খোলা হয় তাতেও রঙের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। হালখাতা অনুষ্ঠানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গাঁদা ফুল দিয়ে সাজানো হয়। খাতার প্রথম পাতায় সিঁদুর পানিতে মিশিয়ে পয়সা দিয়ে ছাপ দেয়া হয়। সঙ্গে থাকে গাঁদা ফুল, বুনো টগর, বেলপাতা, ধান, দূর্বা, কলাপাতা ও মাটির ঘট সবকিছুর আছে নিজস্ব রঙ। যাকে বাংলায় নন্দনের চর্চার শুরু বলা যায়।        
 
ধারণা করা যায় পৃথিবীর প্রথম রঙের নন্দন ধারণা প্রকৃতিপ্রাপ্ত খাদ্যসামগ্রী থেকে এসেছে। ঢেঁড়স, করলা, টমেটো, শসা, বেগুন প্রতিটি সবজি বা ফল প্রত্যেকের আছে নিজস্ব রং। যেমন—চালের গুঁড়ার তৈরি রং সাদা, ঢেরস সবুজ, টমেটো লাল।  দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে মাসপয়লায় পাঁচন খাওয়ার প্রচলন আছে। সেখানেও দেখা যায় সবজির রঙের বাহার।
 
পুরনো বছরকে সগৌরবে বিদায় দিতে দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই আয়োজন থাকে। ঢাকা অঞ্চলের কালিকাচ, লালকাচ, কুলা নামানি, উত্তরাঞ্চলে একসময় জং গানের আসর বসত, আর পাহাড়ি অঞ্চলের গৌড়া নৃত্য তেমনি বর্ষবিদায়ী আয়োজন। সারাদেশের চড়ক পার্বণেও আছে জরা আর কুটিলতা থেকে মুক্ত হওয়ার এক দুর্নিবার আকুতি। জরা বিদায়ের শেষে মাসপয়লায় সকলে ভালোর উত্সবে মাতে। প্রতিটি জেলা তো বটেই, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও বসে মাসপয়লার মেলা।
 
একবিশ্বধারণা, যন্ত্রের অত্যাধিক ও অপরিকল্পিত ব্যবহার মানুষকে অস্থির করে রাখছে প্রতিনিয়ত। প্রযুক্তির নানা জটিলতার কারণে মানুষ সামাজ ও প্রকৃতির ওপর আস্থা রাখছে না। তাই নন্দনচর্চায় যুক্ত হয়েছে যন্ত্র। যন্ত্রের ব্যবহারের ফলে নন্দন ও শিল্পচর্চায় নতুনত্ব এসেছে বটে, তবে ভালোবোধ বা আন্তরিকতাবোধ কমেছে। শিল্পচর্চার কাঁচামাল যখন প্রকৃতি থেকে নিয়ে পুরো শিল্পটা সম্পন্ন হয় তখন শিল্পটা শিল্পীর নিজস্ব থাকে। শিল্পের কাঁচামাল যত বিভাজিত বাজার থেকে সংগৃহীত হয় শিল্প তত বাজারব্যবস্থার ওপর জিম্মি হয়ে পড়ে। 
 
ব্যাপারটা এভাবে বলা যায়—একজন চারুশিল্পী যখন একটা ছবি আঁকেন, তাঁকে ক্যনভাস, রং ও তুলি এমনকি পানির পটটা পর্যন্ত বাজার থেকে কিনতে হয়। কাজেই সে প্রতিটা জিনিসের জন্য বাজারের কাছে জিম্মি। আগের দিনে কিন্তু এমন ছিল না। একজন শিল্পী তার ব্যবহূত সব অনুষঙ্গ প্রকৃতি থেকে নিজে সংগ্রহ করত। যেমন—গাছের ফল, বাকল ও পাতা থেকে রং সংগ্রহ করত, রঙের তুলি করা হতো গরুর লেজের চুল কেটে কাঠিতে লাগিয়ে। ক্যানভাস করা হতো পাটের তৈরি চট দিয়ে। কাজেই পুরো শিল্পটাতে তার নিজস্বতা থাকত।
 
পয়লা বৈশাখ অথবা মাসপয়লা তো বটেই প্রাত্যহিক জীবনে ভালোর চর্চা অবচেতনেই চর্চিত হতো। মসপয়লার দিন চন্দন ফোঁটার কথা বলা হতো। বলা হতো লক্ষ্মীর কথা।
 
আবার মায়ের কথায় ফিরে আসি—
 
মা নতুন কাপড় পরিয়ে যখন ভালোর উপদেশবাণী শোনাতেন, আমি বলতাম, মা, আমাকে সুন্দর লাগছে না?
 
মা বলতেন, এমনে বলতে নাই মুখ লাগে। তোর মুখে ফুলচন্দন পড়ুক।
 
পাশ থেকে বাবা বলতেন, এভাবে বললে ঘর থেকে লক্ষ্মী চলে যায়।
 
আমার মা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, এমনকি রাতে উঠে তাহাজ্জুত নামাজও পড়তেন। এই ফুলচন্দনে কোনো হিন্দুয়ানির ছোঁয়া নাই। আছে বাংলার চিরকালীন পবিত্রতা আর শুভকামনা। আমার বাবা সারাজীবনে মুখে ব্লেডের ছোঁয়া রাখেননি। কারণ হজরত মোহাম্মদ (সা.) কোনোদিন মুখমণ্ডলে ব্লেড ছোঁয়ান নাই। বাবা আমাদের বাড়ির মসজিদে নিয়মিত আজান দিতেন। কাজেই বাবার এই লক্ষ্মী হিন্দু দেবতা লক্ষ্মী নয়, বাঙালির চিরকালীন জীবনের শুভ ও ভালোর রূপক। আমাদের সব সময় ভালোর সঙ্গে থাকতে হবে। ভালোর চর্চা করতে হবে। তাহলে ব্যাক্তিজীবন, পরিবার, সমাজ অথবা রাষ্ট্রে ভালো ও শুভ বিরাজ করবে। 
 
যে মানুষটা সকল ভালোর দিশারি, সেই রবি ঠাকুরের ভাষায় বলতে হয় এই মাসপয়লায়—‘নতুন প্রাণ দাও, প্রাণসখা, আজি সুপ্রভাতে।’
 
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩০
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৭
মাগরিব৬:০২
এশা৭:১৫
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৭