শিক্ষাঙ্গন | The Daily Ittefaq

সুফিয়া কামাল হতে ছাত্রীদের বের করে দেয়া হয়নি : ঢাবি উপাচার্য

সুফিয়া কামাল হতে ছাত্রীদের বের করে দেয়া হয়নি : ঢাবি উপাচার্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার২০ এপ্রিল, ২০১৮ ইং ২২:৫৪ মিঃ
সুফিয়া কামাল হতে ছাত্রীদের বের করে দেয়া হয়নি : ঢাবি উপাচার্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কবি সুফিয়া কামাল হল থেকে মধ্যরাতে ছাত্রীদের বের করে দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান। তিনি বলেন, অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে হলের তিন ছাত্রীকে অভিভাবক ডেকে এনে তাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ফেসবুকে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগে এটি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
 
এদিকে, গভীর রাতে হল থেকে অভিভাবক ডেকে ছাত্রীদের বের করে দেয়ার ঘটনায় আতঙ্কে আছেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা। একাধিক শিক্ষার্থী ইত্তেফাকের কাছে এই দাবি করেছেন। তারা বলছেন, হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিতা রেজওয়ানা রহমান হলের ছাত্রীদের ডেকে ছাত্রত্ব বাতিল, গোয়েন্দা নজরদারি ও মামলার ভয় দেখিয়েছেন।
 
শুক্রবার সকালে উপাচার্য ড. মো. আক্তারুজ্জামান বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে সুফিয়া কামাল হল থেকে তিন ছাত্রীকে বের করে দেয়ার ঘটনায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। উপাচার্য বলেন, ‘মেয়েদের বের করে দেয়ার কথাটা গুজব। এর মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। হল থেকে কাউকেই বের করে দেয়া হয়নি।’
 
এরআগে বৃহস্পতিবার রাতে সুফিয়া কামাল হল থেকে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার লিজা, গণিত বিভাগের পারভীন ও একই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শারমীন শুভকে বের করে দেয়ার অভিযোগ উঠে। এই তিন ছাত্রী রাত ১০টা থেকে ১২টা ১৫ মিনিটের মধ্যে অভিভাবকসহ হল ত্যাগ করেন।
 
এছাড়া রাত সাড়ে বারোটার সময় দুইজন ছাত্রীর অভিভাবক হলের মধ্যে প্রবেশ করেন। হলের ভেতর প্রবেশের আগে সাংবাদিকদের তারা জানান, হল কর্তৃপক্ষ তাকে ফোন দিয়ে হলে এসে মেয়েকে নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এজন্য বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি এসেছেন। পরে ওই ছাত্রীর অভিভাবক হল হতে একা বের হয়ে যাওয়ার সময় বলেন, তার মেয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। সে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিল। এজন্য হল কর্তৃপক্ষ কোনো আন্দোলনে না যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে।
 
এ বিষয়ে সুফিয়া কামাল হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিতা রেজওয়ানা রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা স্বেচ্ছায় তাদের মেয়েদের হল থেকে নিয়ে গেছেন। এশা একজন শিক্ষার্থীর রগ কেটে দিয়েছিল বলে যে গুজব ১০ এপ্রিল ছড়ানো হয়েছিল, মোবাইল চেক করে ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করেছি। যারা ওই ঘটনায় জড়িত ছিল, তাদের অভিভাবকদের হলে ডেকেছি। তাদের ওই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভিডিওগুলো দেখানো হয়েছে। তখন অভিভাবকরা নিজেরাও লজ্জা পেয়েছেন এবং তারা স্বেচ্ছায় তাদের মেয়েদের নিয়ে গেছেন।
 
এদিকে, হল হতে গভীর রাতে ছাত্রীদের বের করে দেয়ার ঘটনায় ইয়াসিন আরাফাত নামে এক ছাত্র কবি সুফিয়া কামাল হলে রাতে অবস্থান নেন।  পরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কয়েকজন নেতাও সেখানে হাজির হন। কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুর গভীর রাতে হল হতে ছাত্রীদের বের করে দেয়ার ঘটনায়  শুক্রবার বিকালে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, যদি কেউ অপরাধ করে থাকে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে তাদের বিচার হবে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে কেন অভিভাবক ডেকে তাদের হল থেকে বের করা হচ্ছে?
 
গত ১০ এপ্রিল রাতে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে হল শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি ইফফাত জাহান এশা হলের কয়েকজন ছাত্রীকে মারধর করেন। পরে ছাত্রীরা একত্রিত হয়ে এশাকেও মারধর করে এবং গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয়। ওই ঘটনার সঙ্গে ২৬ জন ছাত্রী জড়িত রয়েছে বলে হল কর্তৃপক্ষ চিহ্নিত করে। তাদের বিরুদ্ধে হল কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ওই ছাত্রীদের বের করে দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
 
হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবি
ঢাবির কবি সুফিয়া কামাল হল থেকে মধ্যরাতে ছাত্রী বের করে দেয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে হলটির প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবি করেছে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ।’ শুক্রবার বিকেল ৪টায় ঢাবির টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন নেতারা।
 
এ সময় রাজু ভাস্কর্যের উত্তর দিকে ফুটপাতে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্সের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের অবস্থান করতে দেখা যায়।
 
রাজু ভাস্কর্যের সামনে সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নূর বলেন, গভীর রাতে হল থেকে ছাত্রীদের বের করে দেয়ার ঘটনা পৃথিবীতে বিরল। ছাত্রীদের অভিভাবকদের ডেকে এনে কাউকে অভিভাবক ছাড়া বের করে দেয়া হয়। হুমকি দেয়া হয় মিডিয়ার সঙ্গে কথা না বলার জন্য। হল থেকে বহিষ্কার করার হুমকিও দেয়া হয়।
 
নুরুল হক নুর বলেন, হলটির প্রাধ্যক্ষের একটি অডিও রেকর্ড প্রচার হয়েছে। তিনি বলেছেন, আন্দোলনে অংশ নেয়া ছাত্রীদের সংখ্যা  দুই হাজার হলেও তাদের বহিষ্কার করা হবে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে পরিচয় দিয়েছে তা ন্যাক্কারজনক। এসময় তিনি নির্যাতন, হামলা ও মামলায় কোনো শিক্ষার্থীকে হেনস্তা করা হলে ফের আন্দোলনের দাবানল জ্বলে উঠবে বলে হুঁশিয়ারি দেন। তিনি অবিলম্বে কবি সুফিয়া কামাল হলের প্রাধ্যক্ষকে অপসারণ করার দাবি জানান। অন্যত্থায় নতুন কর্মসূচি দেয়া হবে বলে ঘোষণা করেন।
 
বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান বলেন, আমরা শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিলে থাকতে চায়। হেনস্ত করবেন না, রাস্তায় আন্দোলনে নামাবেন না। শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করলে কি হয় ইতোমধ্যে দেখেছেন।
 
তিনি বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাতে চাই, শিক্ষার্থী হেনস্তা বন্ধে উদ্যোগ নিন, আমাদের দাবি ছিল কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। প্রধানমন্ত্রী আপনি নিজ মুখে কোটা ব্যবস্থাই না রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। আপনার প্রতি আমরা আস্থাশীল। আশা করছি অতি দ্রুত সে ঘোষণা বাস্তবায়ন করবেন। প্রজ্ঞাপন দ্রুত জারির পদক্ষেপ নেবেন।
 
এর আগে শিক্ষার্থীরা ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু, হলে হলে নির্যাতন বন্ধ কর করতে হবে, আমার বোন বাইরে কেন প্রশাসন জবাব চাই, হলে হলে নির্যাতন কেন প্রশানের জবাব চাই, নির্যাতন করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না’ বলে স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভে মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মিছিলে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান ও নুরুল হক নুর।
 
সাদা দলের উদ্বেগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল থেকে মাঝ রাতে শিক্ষার্থীদের বের করে দেয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় বিএনপি-জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের প্যানেল সাদা দলের শিক্ষকরা। দলের পক্ষে দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন খান সাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শুক্রবারের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল থেকে মাঝ রাতে শিক্ষার্থীদের বের করে দেয়ার খবরে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। গণমাধ্যমে প্রচারিত এ সংবাদ যদি সত্যি হয় তবে এই ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং বেদনাদায়ক। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে এই ধরণের নির্বতনমূলক কর্মকাণ্ড কোন ভাবেই কাম্য নয়। মনে রাখতে হবে সব শিক্ষার্থীই আমাদের কাছে সন্তানতুল্য। কোন শিক্ষার্থী অপরাধ করলে তাকে শাস্তি দেয়া যায়। কিন্তু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আগে পক্ষপাতহীন, স্বচ্ছ এবং সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া বাঞ্চনীয়। হল এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আমরা দায়িত্বশীল, নিরপেক্ষ ও মানবিক আচরণ প্রত্যাশা করি। শিক্ষাথীদেরকে বলবো নিজেদের মাঝে সংঘাত পরিহার করে প্রতিহিংসার জন্ম নেয় এমন আচরণ করা থেকে বিরত থাকতে। মনে রাখতে হবে প্রতিহিংসা কেবলই প্রতিহিংসার জন্ম দেয়, সমস্যার সমাধান করে না।
 
ইত্তেফাক/আরকেজি
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৮ মে, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৬
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩৫
মাগরিব৬:৪৩
এশা৮:০৫
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৮