ঢাকা বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
২২ °সে

দিনভর বিক্ষোভ ভিকারুননিসায়

দিনভর বিক্ষোভ ভিকারুননিসায়
শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ গতকাল ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে উপস্থিত হলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তার কাছে নানা অভিযোগ তুলে ধরে: ইত্তেফাক

‘শিক্ষক কর্তৃক মা-বাবা’র অপমান সইতে না পেরে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর (১৫) আত্মহত্যার ঘটনায় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে গতকাল মঙ্গলবার দিনভর বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। অনেক অভিভাবক এবং স্থানীয় লোকজনও প্রতিষ্ঠানটির বেইলি রোডের প্রধান শাখায় এসে বিক্ষোভে সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।

তারা এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও গভর্নিং বডির সদস্যদের পদত্যাগ দাবি করেন। এদিকে অরিত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে অধ্যক্ষ ও শিক্ষকসহ তিনজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তারা হলেন-কলেজের অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, প্রভাতী শাখার প্রধান জিনাত আখতার ও শ্রেণি শিক্ষক হাসনা হেনা। রাজধানীর পল্টন থানায় অরিত্রীর বাবা দিলীপ অধিকারী বাদী হয়ে গতকাল মামলাটি করেন।

অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় জিন্নাত আরাকে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখা হয়েছে। তাকে স্কুলে আসতে মৌখিকভাবে নিষেধ করেছে গভর্নিং বডি বা পরিচালনা পর্ষদ। একইসঙ্গে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে। পুরো ঘটনা তদন্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ঢাকা বোর্ড ও স্কুল কর্তৃপক্ষ পৃথক পৃথক কমিটি গঠন করেছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ গতকাল স্কুলে গিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও ছাত্রীদের সাথে কথা বলেন।

বিক্ষোভ দিনভর

গতকাল সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করতে থাকে। ‘অরিত্রীর মতো আর কোনো শিক্ষার্থী হারাতে চাই না’, ‘অধ্যক্ষ, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও গভর্নিং বডির সদস্যদের অপসারণ চাই, আত্মহত্যার প্ররোচণাকারীদের বিচার চাই’, যে শিক্ষা মৃত্যু দেয় এমন শিক্ষা আর চাই না’, ‘আমরা আর অরিত্রী চাই না’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ ইত্যাদি শ্লোগান লেখা ব্যানার নিয়ে ক্যাম্পাসের ভেতরে এবং প্রধান ফটকে বিক্ষোভ করে তারা। এক শিক্ষার্থী বলে, ‘এভাবে চলতে পারে না। শিক্ষকরা আমাদের নানাভাবে মানসিক নির্যাতন করেন। প্রাইভেট টিউশনির জন্য কৌশলে বাধ্য করেন। অথচ এ বিষয়ে অধ্যক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেন না। আমরা অভিযুক্ত শিক্ষকদের শাস্তি চাই।’ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্লাসে যেসব বিষয় পড়ানো হয় তা পরীক্ষায় আসে না। যেগুলো শিক্ষকরা প্রাইভেট টিউশনিতে পড়ান সেখান থেকে পরীক্ষায় কমন পড়ে।

একাধিক অভিভাবক জানিয়েছেন, অরিত্রী ও তার মা-বাবাকে ডেকে যেভাবে ভর্ত্সনা করা হয়েছে, একই সঙ্গে টিসি দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত স্কুল কর্তৃপক্ষ নিয়েছিল তাতে মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে সে। যে কারণে সে বাসায় গিয়ে আত্মহত্যা করে। শিক্ষার্থীরা জানায়, শিক্ষামন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সুষ্ঠু বিচার না হলে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। সব পরীক্ষা বর্জন করা হবে। এছাড়া আজ বুধবার সকাল ১০টায় ফের প্রধান ফটকে অবস্থান নেবে তারা। স্কুলে বর্তমানে বার্ষিক পরীক্ষা চলছে।

নাসির উদ্দিন নামে গণিত ও পদার্থ বিজ্ঞানের এক শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করেন কয়েকজন অভিভাবক। তারা বলেন, ছেলে-মেয়েরা পরীক্ষা দিয়ে আসার পর দোয়া করে-‘আল্লাহ! নাসির স্যারের কাছে যেন খাতা না যায়।’ তার কাছে কোচিং না করা শিক্ষার্থীদের ফেল করিয়ে দেওয়া হয়। সেই কারণে সবাই কোচিং করতে বাধ্য হয়।

আমেনা ইসলাম নামে এক অভিভাবক জানান, দীর্ঘদিন ধরে এক প্রকার দু:শাসন চলছে প্রতিষ্ঠানটিতে। তিনি বলেন, দ্রুত সময়ে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইন অনুযায়ী বিচার করতে হবে। অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও গভর্নিং বডির সদস্যদের পদত্যাগ করতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির জবাবদিহিতা চাই।

গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে স্কুলে যান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এ সময় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা মন্ত্রীর সামনে ‘বিচার চাই, বিচার চাই’ শ্লোগান দিতে থাকে। স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে অধ্যক্ষ, উপস্থিত শিক্ষক, অভিভাবক ও ছাত্রীদের সাথে কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষার হল পরিদর্শন করেন। এ সময় শিক্ষামন্ত্রী অরিত্রীর মৃত্যুকে বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক উল্লেখ করে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, একজন শিক্ষার্থী কতটা অপমানিত হলে, কতটা কষ্ট পেলে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেয়! যে ঘটনাগুলো আমরা শুনেছি, এর পেছনের কথা শুনছি। প্রমাণ পেলে ঘটনার পেছনে বা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মন্ত্রী আরো বলেন, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষক মানসিক বা শারীরিকভাবে কোনো শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করতে পারেন না। এটি অপরাধ হিসেবে গণ্য। এ সময় মন্ত্রীর সঙ্গে মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অধ্যক্ষসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা

অরিত্রীর আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষসহ তিনজনকে আসামি করে পল্টন থানায় একটি মামলা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় মামলাটি দায়ের করেন তার বাবা দিলীপ অধিকারী। মামলা নম্বর ১০। দন্ডবিধির ৩০৬ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। পল্টন থানার ওসি মাহমুদুল হক বলেন, মামলায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, প্রভাতী শাখার প্রধান জিনাত আখতার ও শ্রেণি শিক্ষক হাসনা হেনাকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় দিলীপ অধিকারী অভিযোগ করেন, পরীক্ষার সময় মোবাইলে নকল করার অভিযোগে অরিত্রীকে সোমবার তার মা-বাবাকে নিয়ে স্কুলে যেতে বলা হয়। তিনি (দিলীপ অধিকারী) স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে সোমবার স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপালের কক্ষে গেলে তাদের অপমান করে বের করে দেওয়া হয়। পরে প্রিন্সিপালের কক্ষে গিয়ে তার কাছে মেয়েকে পরীক্ষা দিতে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। এক পর্যায়ে প্রিন্সিপাল তাকে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা বলেন। প্রিন্সিপাল তার মেয়েকে স্কুল থেকে টিসি দেয়ার কথাও বলেন। এ কথা শুনে তার মেয়ে প্রিন্সিপালের পা ধরে ক্ষমা চায়। তখন প্রিন্সিপাল তাকে আরো কুরুচিপূর্ণ কথা বলেন। এসব সহ্য করতে না পেরে অরিত্রী দ্রুত প্রিন্সিপালের কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়। পরে বাসায় গিয়ে তিনি দেখেন, অরিত্রী তার কক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়নায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় ঝুলছে। এর আগে অরিত্রীর স্বজনরা বলেছিলেন, বাবা-মার অপমান সইতে না পেরে ঘরে ফিরে আত্মহত্যা করে ওই কিশোরী। তবে অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস অরিত্রীর অভিভাবকদের অপমান করার কথা অস্বীকার করেছেন।

কমিটি গঠন : অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার কারণ খুঁজতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কমিটির প্রধান করা হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি), ঢাকা আঞ্চলিক অফিসের পরিচালক অধ্যাপক মো. ইউসুফকে। কমিটিতে আরো আছেন মাউশির একই অফিসের উপ-পরিচালক শাখাওয়াত হোসেন ও ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসার বেনজীর আহমেদ। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির সদস্যরা হলেন গভর্নিং বডির সদস্য আতাউর রহমান, অভিভাবক প্রতিনিধি তিন্নি খুরশিদ জাহান এবং শিক্ষক ফেরদৌসী বেগম। কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস। এছাড়া ঢাকা শিক্ষাবোর্ডও বিদ্যালয় পরিদর্শক প্রীতিশ কুমার সরকারকে প্রধান করে এক সদস্যের কমিটি গঠন করেছে।

স্কুলের গভর্নিং বডির সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার ইত্তেফাককে বলেন, তদন্তের স্বার্থে প্রভাতী শাখার প্রধান জিন্নাত আরাকে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখা হয়েছে। আর স্কুলের সার্বিক ঘটনায় অধ্যক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। তবে জিন্নাত আরার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অধ্যক্ষ এবং উপাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়নি গভর্নিং বডি।

কেবল ভর্তির সময় দেখা মেলে গভর্নিং বডির : গতকাল অভিভাবকদের স্কুলের অধ্যক্ষ ও গভর্নিং বডির বিরুদ্ধে বেশি ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এক অভিভাবক বলেন, অবৈধভাবে ভর্তি করে টাকা আয় করা যায় বলে তখন গভর্নিং বডি সক্রিয় থাকে। অথচ সারা বছর লেখাপড়ার ব্যাপারে তাদের তদারকি নেই। স্কুলের শিক্ষকরা প্রাইভেট টিউশনিতে ব্যস্ত থাকার বিষয়টি জানলেও কোন ব্যবস্থা নেয় না গভর্নিং বডি। গভর্নিং বডি এবং অধ্যক্ষ শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রাইভেট টিউশনি বাবদ কমিশন নেন বলে অভিযোগ করেন আরেক অভিভাবক।

আরও পড়ুনঃ পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি, বিক্ষোভ করবে শিক্ষার্থীরা

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, এই ঘটনায় যেই দোষী হোক না কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শিক্ষক হোক আর গভর্নিং বডিই হোক সবাইকে নিয়ম মেনে চলতে হবে। তদন্তের পর গভর্নিং বডি যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয় তাহলে তারাও ছাড় পাবে না।

ইত্তেফাক/নূহু

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১২ ডিসেম্বর, ২০১৮
আর্কাইভ
 
বেটা
ভার্সন