আকবর আলি খান
আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি
গতানুগতিক গণ্ডীর বাইরের কিছু অর্থনৈতিক তত্ত্বের সঙ্গে বাঙালি পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেবে এ বই। প্রবন্ধগুলোর বিষয়বস্তু বিচিত্র ও কৌতূহলোদ্দীপক। একটি প্রবন্ধের শিরোনাম 'ভেগোলজি ও অর্থনীতি'। দুটি প্রবন্ধে অর্থনীতিতে অনভিপ্রেত পরিণাম ও মিত্রপক্ষের গুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। দুটি প্রবন্ধের উপজীব্য বিশ্বায়ন। সুখ ও অর্থনীতির সম্পর্ক নিয়ে পর্যালোচনা দেখা যাবে একটি নিবন্ধে। তথ্য অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে 'সুকতলার অর্থনীতি ও জুতার রাজনীতি'তে। একটি প্রবন্ধে জন্মদিনের অর্থনীতি ও আরেকটি প্রবন্ধে সরকারের অপচয় নিয়ে বিশ্লেষণ রয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলাম বড়াই করে লিখেছেন, 'হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান'। কারণ হিসেবে বলেছেন, দারিদ্র্য তাঁকে 'অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস দিয়েছে'। তবে এ দাবি কখনো করেননি যে, দারিদ্র্য তাঁকে সুখ দিয়েছে। বরং তিনি লিখেছে—'দারিদ্র্য অসহ/ পুত্র হয়ে জায়া হয়ে কাঁদে অহরহ/ আমার দুয়ার ধরি। কে বাজাবে বাঁশি?/ কোথা পাব অনিন্দিত সুন্দরের হাসি?' দরিদ্র মানুষের মনে সুখ নেই, তাই তাঁর মুখে হাসি বেমানান। বেশিরভাগ মানুষেরই সুখের জন্য চাই অর্থ ও বিত্ত। তাই তো 'এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি'।
দেশভেদে সুখের তারতম্যের একটি বড় নিয়ামক হলো মাথাপিছু আয়। তৃতীয় অংশের আলোচনা থেকে দেখা যায় যে, ধনী দেশের অধিবাসীদের সুখের মাত্রা উচ্চতর পর্যায়ের। গরিব দেশের মানুষেরা অপেক্ষাকৃত অসুখী হয়। দেশভেদে এ সূত্র যেমন সত্যি, দেশের ভেতরেও শ্রেণীভেদে তা সমভাবে কার্যকর। এই বক্তব্যের সমর্থনে দুই ধরনের উপাত্ত রয়েছে। প্রথমত, দেশভেদে সুখ ও মাথাপিছু আয়ের মধ্যে ধনাত্মক সহগমন লক্ষ করা যায়। ৪৯টি দেশের সুখ ও মাথাপিছু আয়ের সম্পর্ক বিশ্লেষণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সুখ ও মাথাপিছু আয়ের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ধনাত্মক সম্পর্ক রয়েছে। তবে সুখের ওপর মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির তাত্ক্ষণিক প্রভাব অত্যন্ত নগণ্য।...
১৯৯৪ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে যাদের মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলারের কম, তাদের মাত্র ১৬ শতাংশ নিজেদের অতি সুখী মনে করে। পক্ষান্তরে যাদের মাথাপিছু আয় ৭৫ হাজার ডলারের বেশি, তাদের ৪৪ শতাংশ নিজেদের 'অতিসুখী' গণ্য করে থাকে। একই ধরনের প্রবণতা ইউরোপ ও জাপানেও লক্ষ করা যায়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯১ সময়কালে ইউরোপে ইউরো-ব্যারোমিটার সমীক্ষায় দেখা যায়, সর্বোচ্চ আয়বন্ধনীর ব্যক্তিদের ৮৮ শতাংশ ব্যক্তি তাদের জীবন সম্পর্কে খুব অথবা যথেষ্ট সন্তুষ্ট। পক্ষান্তরে সর্বনিম্ন আয়ের এক-চতুর্থাংশ মানুষের মাত্র ৬৬ শতাংশ একই রকম সন্তুষ্ট। কোথাও কোথাও কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও সামগ্রিকভাবে এই প্রবণতা বিশ্বব্যাপী দেখা যাচ্ছে।
... ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত সময়কালে সুখ-সম্পর্কিত সমীক্ষাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে আমেরিকানরা ১৯৫০-এর দশকে সবচেয়ে সুখী ছিল, তবে ১৯৪৭-৭৭ সময়কালে সুখের কোনো সুস্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ করা যায় না। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে এ সময়ে মাথাপিছু আয়ের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছে। ১৯৪৬ থেকে ১৯৯১ সময়কালে ১৯৯৬ সালের স্থিরীকৃত ডলারের মানে যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু আয় ১১ হাজার ডলার থেকে ২৭ হাজার ডলারে উন্নীত হয়। অর্থাত্ ৪৫ বছর সময়কালে এ আয় ১৫০ শতাংশ বাড়ে। মাথাপিছু আয় বেড়ে যাওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানে দ্রুত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। মাথাপিছু আয় যখন কম ছিল তখন শৌচাগার ছিল ঘরের বাইরে। আর্থিক সমৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে লাগোয়া শৌচাগারের চল হয়। ঘরে ঘরে চালু হয় তাপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, কাপড় ধোয়ার যন্ত্র, রঙিন টেলিভিশন, টেলিফোন, হরেক রকম বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি। বাড়ি বাড়ি গাড়ি কেনার ধুম পড়ে যায়। সারা দুনিয়া থেকে আমদানি করা হয় অজস্র স্বাদু খাদ্যদ্রব্যের উপাদান। সময়ের ব্যবধানে আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সুখ বেড়ে যাওয়ার কথা। অথচ এ সময়কালে মার্কিনীদের সুখ কমে যায়। ১৯৫০-এর দশকে শূন্য থেকে তিন মাত্রায় সুখের পরিমাপ ছিল ২.৪। অভাবিতপূর্ব অর্থনৈতিক সাফল্য সত্ত্বেও ১৯৯১ সালে সুখের পরিমাপ ২.২-এ নেমে আসে। থাকছে, নয়তো কমে যাচ্ছে।