The Daily Ittefaq
ঢাকা, বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০১৩, ৪ বৈশাখ ১৪২০, ৫ জমাদিউস সানি ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ হারারে টেস্ট:প্রথমদিন শেষে জিম্বাবুয়ের সংগ্রহ ২১৭/৪ | বংশালে স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি | আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভা ২১ এপ্রিল | নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মুজিবনগর দিবস পালন | মত্স্য ভবনের কাছে সড়ক দুর্ঘটনায় ব্যাংক কর্মকর্তা নিহত | চিকিত্সার জন্য এরশাদ সিঙ্গাপুরে | চার ব্লগারের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দাখিল | চার বছরে ক্রসফায়ারে নিহত ৪৬২, গুম অন্তত ১৫৬ জন:সুলতানা কামাল | জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করা উচিত নয়: নিউইয়র্কে অর্থমন্ত্রী | ৩৩তম বিসিএস: লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১৮৬৯৩ জন | শুক্রবারের এইসএসসি পরীক্ষা ৩ মে | জেল হত্যা মামলার রায় ৩০ এপ্রিল | যুদ্ধাপরাধ মামলায় গোলাম আযমের রায় যে কোনো দিন

[ রা জ নী তি ]

হেফাজতে ইসলাম :সরকারের কৌশলগত অবস্থান

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

এরিস্টটল রাজনীতিকে নৈতিক ভিত্তি দিয়েছেন। অপরদিকে মেকিয়াভেলী রাজনীতিতে অনৈতিকতার আমদানি করেছেন। আধুনিকায়নের পথে সভ্যতার অগ্রগতি যতটা হয়েছে ততটাই হয়েছে অনৈতিকতার বিকাশ। প্রাচ্য কি পাশ্চাত্যে রাজনীতি ছিল সেবার পক্ষে। এখন রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে বস্তুবাদী স্বার্থে। রাজনীতিতে নৈতিক মানুষের অবস্থান নেই যে তা নয়। এ সময়ে ভাল মানুষের ভাত নেই কোথাও। না দেশে না বিদেশে। ছোট্ট এ ভূমিকা আমাদের সাম্প্রতিক রাজনীতিকে বোঝার জন্য। এখানে দুটো ঘটনা। শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর এবং হেফাজতে ইসলামের কার্যক্রম। দুটোই স্পর্শকাতরতা-দুষ্ট। একটি মুক্তিযুদ্ধ, অপরটি ইসলাম। সরকার এ দুইয়ের মাঝে উভয় সঙ্কটে নিপতিত হয়। সরকারের মনস্তাত্ত্বিক দিক হয়তো শাহবাগের দিকে। তার কারণ তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে। অপরদিকে হেফাজতে ইসলামের ক্রমসম্প্রসারণশীল অবস্থা সরকারকে ভাবিয়ে তোলে। সরকারের আদর্শিক অবস্থান এ রকম নয় যে, তারা ক্ষমতার জন্য উদ্বেগ সৃষ্টিকারী হেফাজতে ইসলামকে রুষ্ট করে। ক্ষমতাসীনরা কমিউনিস্ট পার্টির মত ক্যাডার বেজ্ড বা আদর্শিক দল হলে আমরা আশা করতে পারতাম যে, ক্ষমতাকে থোড়াই কেয়ার করবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতাশ্রয়ী পার্টি হওয়ায় তাদের সারাক্ষণ ক্ষমতার সমীকরণ নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়। যা হোক, শাহবাগ ও হেফাজতে ইসলামকে যেভাবে ক্ষমতাসীনরা মোকাবেলা করেছে তা নিয়ে দুটো মত সৃষ্টি হয়েছে। সরকার সমর্থক আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা (বাম ধারা বাদে) মনে করেন সরকার অত্যন্ত কুশলতার সাথে বা চাতুর্যের সাথে উভয় কূল রক্ষা করে ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়েছে। সরকার 'ছলে বলে কলা কৌশলের' আশ্রয়-প্রশ্রয় নিয়েছে। যেটা এসব বুদ্ধিজীবীর ভাষায় নিতান্তই কৌশল। এতে অন্যায় কিছু হয়নি। অপরদিকে বিরোধী এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষকরা মনে করেন সরকার ভয়ানক অনৈতিক কাজ করেছে। তারা মনে করেন সরকার চোরকে চুরি করতে বলেছে এবং গৃহস্থকে সজাগ থাকতে বলেছে। স্পষ্টতই সরকার ডাবল স্টান্ডার্ড বা দ্বৈতনীতি অনুসরণ করেছে। হেফাজতে ইসলামের নেতারা সরকারকে 'মোনাফেক' বলেছেন।

সত্যিই সরকার ডাবল স্টান্ডার্ড অনুসরণ করেছেন কিনা তা ঘটনার বিশ্লেষণে জানা যাবে। প্রথমে আসি শাহবাগ প্রসঙ্গে। সিপিবি নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তথা বামদের দ্বারা আন্দোলনটি সূচিত হয় অনেকেই তা জানেন। আকস্মিকভাবে বামদের এ উদ্যোগ গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ারও একটি প্রচ্ছন্ন পটভূমি আছে। সত্য হোক মিথ্যা হোক গুজব রটে যায় কাদের মোল্লার ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবন হচ্ছে আওয়ামী-জামায়াত গোপন আঁতাতের ফলাফল। এরই দু'-একদিন আগে জামায়াত-শিবিরকে সরকার শাপলা চত্বরে নির্বিঘ্নে সমাবেশ করতে দেয়। শিবির পুলিশকে রজনীগন্ধা শুভেচ্ছা জানায়। তেল-পানিতে মেশা যেমন অসম্ভব তেমনি আওয়ামী-জামায়াত আঁতাত সেরকম একটি অসম্ভব বিষয়। এ ধরনের আঁতাত আওয়ামী লীগ এবং জামায়াত উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক। আওয়ামী লীগের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এখন তাদের 'তুরুপের তাস' বা শেষ সম্বল। এমনিতেই তাদের নির্বাচনী ভবিষ্যত্ খুবই নাজুক। অপরদিকে আদর্শিক রাজনীতির দাবিদার জামায়াত আঁতাত করলে তার ভিত্তিই নষ্ট হয়ে যায়। এ ধরনের 'ডগমেটিক পার্টি' এ রকম আঁতাত করলে তার রাজনৈতিক মৃত্যু ডেকে আনবে। যা হোক, গুজবটি হাওয়া পায় এবং বামরা সে সুযোগ ষোল আনাই গ্রহণ করে। সরকারের জন্য আইনত: একটি বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। তার কোর্ট, তার প্রসিকিউটর, তাদেরই রায়। সবচেয়ে বড় কথা হলো রাষ্ট্রতো কোন পক্ষ নিতে পারে না। রায়ে সরকার থেকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের আইনের ভাষায়, কর্তৃপক্ষের ভাষায় কথা বলতে হয়। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে জাতীয় সংসদ শাহবাগ প্রজন্মের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে, যারা প্রকাশ্যে ফাঁসি, হত্যা এবং জবাই-এর শ্লোগান দিচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী বিক্ষোভরতদের অভিনন্দন জানান। তিনি তাদের শপথের প্রতিটি বাক্যের সাথে একমত পোষণ করেন এবং সেগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। পরবর্তীতে শাহবাগীদের দাবি অনুযায়ী আইন সংশোধন করে ফাঁসির আদেশ আনার ব্যবস্থা করেন। আবেগ আপ্লুত হয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "আমার মনটা ছুটে যায়, মনে হয় আমিও ওখানে চলে যাই। ওই তরুণ কণ্ঠের সঙ্গে এই বৃদ্ধ বয়সেও কণ্ঠ মেলাই... তাদের ওই শপথ বাস্তবায়নে যা যা করা দরকার তা করবো এটা আমাদের অঙ্গীকার।" শোনা যায় শাহবাগ প্রজন্মের আবেগস্থিতি এবং ব্যাপ্তি সম্পর্কে সিক্রেট ব্রাঞ্চ সরকারকে সঠিক তথ্য দিতে ব্যর্থ হয়। ক্ষমতা-পাগল আওয়ামী লীগ পরিণতি চিন্তা না করেই জোয়ারের সাথে গা ভাসায়। শাহবাগ প্রজন্মের আন্দোলন ব্লগারদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত নাস্তিকতার অভিযোগের কারণে ক্রমহরাসমান হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে এর আবেদন শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। হেফাজতে ইসলামের দাবির প্রেক্ষিতে ৪ জন ব্লগারকে গ্রেফতার করা হলে শাহবাগ প্রজন্ম সরকারের বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করে। শাসক দলের পক্ষ থেকে শাহবাগ প্রজন্মের কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলার পরামর্শ দেয়া হয়। এতে গোস্বা হন শাহবাগ প্রজন্ম নেতা ডা. ইমরান এইচ সরকার। তিনি বলেন "কারো রক্তচক্ষুকে ভয় পাই না," অথচ এদেরকে পরিপূর্ণ আস্কারা আওয়ামী লীগ সরকারই দিয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, এক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছে। খাদ্য, পানীয়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। এখন প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলছেন: এত ঔদ্ধত্য আসে কোত্থেকে?

নীতিগত এবং কৌশলগত সরকারি দ্বৈধতা, প্রতারণা এবং কৌশলের দ্বিতীয় উদাহরণ; হেফাজতে ইসলাম। এদের সাথে সরকারের সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। সরকারের তরফ থেকে আপোসরফা করার পক্ষে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য আলোচনা চলে। প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বাসভাজন একজন মন্ত্রী হেফাজতে ইসলাম এর প্রধান আল্লামা আহমেদ শফীর সাথে দেখা করেন- তা প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে। তার আপোস-ফর্মুলা ব্যর্থ হয়। হেফাজতে ইসলাম ভয়, ভীতি, প্রলোভন, নিপীড়ন, নির্যাতন উপেক্ষা করে মহাসমাবেশ আহ্বান করে। সরকারের ফর্মুলা ছিল লং মার্চ স্থগিতকরণ। বিনিময়ে তাদের দাবি-দাওয়ার বিবেচনা। বিশেষত: ব্লগার নাস্তিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। সরকার ৪ জনকে গ্রেফতার করে দেখাতে চায় তারা আন্তরিক। অপরদিকে হেফাজতে ইসলাম 'ব্লাসফেমী' অর্থাত্ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জন্য কঠোর শাস্তির দাবিতে অনড় থাকে। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উস্কানিমূলক বক্তব্য, পরস্পর বিরোধী অবস্থান এবং বাম মন্ত্রীদের আস্ফাালন হেফাজতে ইসলাম নেতৃত্বকে বিভ্রান্ত করে। সরকার এবং হেফাজতে ইসলাম-উভয় ক্ষেত্রেই আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়। হেফাজতে ইসলামের তরফ থেকে আন্দোলনের অরাজনৈতিক চরিত্র, শুধু ঈমান ও ইসলাম কেন্দ্রিকতা, যুদ্ধ অপরাধীদের বিচারের বিষয়ে নীরবতার নিশ্চয়তা সত্ত্বেও সরকার আশঙ্কামুক্ত ছিল না। অপরদিকে বিরাট ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত ছিল না। এ অবস্থায় শাপলা চত্বরে অনুমতি না দিয়ে উপায় ছিল না। ইতোমধ্যে এ নমনীয়তা দেখে ক্ষিপ্ত হয় বাম পক্ষ। 'পক্ষ নিলে রক্ষা নাই' শ্লোগান তো ইতোমধ্যে তারাই তুলেছে। সরকারকে মারাত্মক চাপের মুখে ফেলে তারা। সরকার উভয় কূল রক্ষা করার জন্য 'চাণক্য চাতুর্য' নীতি গ্রহণ করে। ইতোপূর্বেও বামদের সরকারি হরতালের মতই সরকার নিজস্ব পরিবহন বন্ধ করে দেয়। চাপ প্রয়োগ করে বেসরকারি পরিবহনকে একই কাজ করতে বাধ্য করে। লঞ্চ মালিকদের নির্দেশ দেয়া হয় লঞ্চ না চালাতে। রেল কর্তৃপক্ষকে অলিখিত নির্দেশে সব রেলপথ বন্ধ করে দিতে অথবা এমনভাবে চলাচল করতে বলা হয় যাতে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মী মহাসমাবেশে যোগদান করতে না পারে। এছাড়া আওয়ামী লীগ কর্মীদের নির্দেশ দেয়া হয় রাস্তায় থাকার জন্য। ঢাকার প্রধান প্রধান প্রবেশপথে অবস্থান নিয়ে হেফাজতে ইসলামের লোকদের ঢাকায় প্রবেশে বাধা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পুলিশ এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয় আওয়ামী ক্যাডারদের সহযোগিতা করতে। এক পর্যায় মহাসমাবেশের অনুমতি বাতিলেরও চিন্তা করা হয়। সাহসে কুলায়নি। সরকারি দল আওয়ামী লীগের তেমন তত্পরতা পরিলক্ষিত হয়নি। কিন্তু সক্রিয় ছিল বামধারাপুষ্ট ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ ২৭টি সংগঠন। মহাসমাবেশ ঠেকাতে আওয়ামী লীগের ভূমিকা ছিল ব্যক্তি এবং স্থানীয় কেন্দ্রিক। এক এক জায়গায় এক এক রকম। গাবতলীতে প্রকাশ্যেই অস্ত্রের ব্যবহার দেখান হয়েছে, অপরদিকে অন্যত্র বাধা দেয়া হয়নি। ঢাকার কামরাঙ্গিরচরে এবং ফরিদপুরের ভাঙ্গায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। সারাদেশে আর কোন ঘটনা ঘটেনি। সরকারের অভ্যন্তরে মনে হয় দ্বিধাদ্বন্দ্ব, বিতর্ক এবং মতবিরোধ রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শান্তিপূর্ণ সমাবেশের জন্য হেফাজতে ইসলামকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তাদের সঙ্গত দাবি-দাওয়া বিবেচনার কথা বলেছেন। অপরদিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মোহাম্মাদ হানিফ হেফাজতে ইসলামের দাবি-দাওয়াকে মধ্যযুগীয় বলেছেন। অন্যান্য মন্ত্রী এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তি হেফাজতে ইসলাম আহূত হরতাল প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছেন। বামরা বিশেষত: শাহবাগ প্রজন্ম ফাঁকা মাঠে আস্ফাালন করেছে।

হেফাজতে ইসলামের ঐতিহাসিক বিস্ময়কর মহাসমাবেশের পর হিসেব-নিকেশ করছে রাজনৈতিক দলগুলো। আওয়ামী লীগের একাংশ খুশি বিএনপিকে মঞ্চে থাকতে দেয়নি হেফাজত। রাজনৈতিক দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেনি। এমনকি সরকারের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল যুদ্ধপরাধীদের সপক্ষে একটি বাক্যও উচ্চারিত হয়নি মহাসমাবেশ থেকে। বিএনপির পরিকল্পনা অনুযায়ী মহাসমাবেশকে দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা মেনে নেয়নি হেফাজত। আর একটি শাহবাগ স্কয়ারের ভীতি দূর হয়েছে সরকারি তরফ থেকে।

অপরদিকে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের সন্তুষ্টি যে দৃশ্যত: এ মহাসমাবেশ তাদেরই সপক্ষশক্তির চরম প্রদর্শনী। ইসলামী মূল্যবোধসমৃদ্ধ জোটের রাজনৈতিক বিজয়ের লক্ষ্যে এটি একটি বড় ধরনের মাইলফলক। তাদের মঞ্চে থাকতে দেয়া হয়নি, বক্তব্য দিতে অনুরোধ করেনি, রাজনৈতিক কর্মসূচি তথা সরকার পতনের তাত্ক্ষণিক শক্তি হয়ে না উঠলেও বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ-বলয় তৈরি হয়েছে। যা তাদের ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং নির্বাচনে নি:সন্দেহে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তাত্পর্য বা ফলাফল যা হোক না কেন হেফাজতে ইসলাম অত্যন্ত কুশলতার সাথে রাজনৈতিক সংঘাত এড়িয়ে গেছে। পথে পথে বাধা-বিপত্তি, উত্সাহ-উস্কানি সত্ত্বেও তারা অসীম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। সমাবেশের লোকদের মনে ছিল কঠোর কর্মসূচি। তাহরির স্কয়ার টাইপ অবস্থান। তাদের চরম আকাঙ্ক্ষাকে সীমিত করে হরতাল দিয়ে স্তিমিত করা হয়েছে বিশাল কর্মীবাহিনীকে। আবার আলটিমেটলি 'ঢাকা অবরোধ' এর মত কঠিন কর্মসূচি দিয়ে আদর্শিক লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা হয়েছে। সরকার নিজেদের হোমওয়ার্ক করার জন্য মাসখানেক সময় পেয়েছে। কর্মসূচি এবং কৌশল ক্ষেত্রে এ মধ্যপন্থি নীতি বিবেকসম্পন্ন নাগরিক সাধারণের জন্য মহাসমাবেশের মতই উভয় কূল রক্ষা করে অভূতপূর্ব ভারসাম্যপূর্ণ নীতি-কৌশলই মনে হয়েছে।

আমরা মূলত: নীতিকৌশল নিয়েই আলোচনা করছিলাম। সরকার এবং হেফাজতে ইসলাম একটি কঠিন জটিল সময় অতিক্রম করেছে। রাজনীতিতে নৈতিকতা যখন বিবর্জিত তখন হেফাজতে ইসলামের মত সত্ আদর্শ তথা ইসলামের প্রতিনিধিত্বশীল শক্তি কি করে সমস্যা এবং সমীকরণকে অতিক্রম করে তা একটি বিবেচ্য বিষয় ছিল। অপরদিকে আওয়ামী লীগ কিভাবে সঙ্কটের উত্তরণ ঘটায় তাও ছিল একটি দৃষ্টব্য অধ্যায়। আওয়ামী লীগ এবং হেফাজতে ইসলাম কি কুশলতার সাথে অথবা কুটিলতা দিয়ে সময়কে অতিক্রম করেছে তাই উত্থাপিত প্রশ্ন। যা কিছু হয়েছে উন্মুক্ত এবং দৃশ্যমান। সুতরাং বিশ্লেষণের জন্য সাধারণ্যে উদ্ভাসিত। মহাসমাবেশ পরবর্তি বিচার-বিশ্লেষণ বলছে: আওয়ামী লীগের কুশলতা নয়, বরং এটি ছিল কুটিলতা। তারা শাহবাগ প্রজন্মকে কি বলেছে কি করেছে তা স্পষ্ট। এখন তাদের গ্রেফতার করছে। সর্বশেষ সরকার কি করবে তাও স্পষ্ট নয়। যে বা যারা কোন সুনির্দিষ্ট নীতি বা আদর্শ অনুসরণ করে না, মূল্যবোধের ধার ধারে না এবং ক্ষমতাকেই চূড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মনে করে তারা সব পারে। রাজনীতিকদের জন্য যেমন ইতিবাচক শিক্ষা আছে তেমনি নেতিবাচক শিক্ষাও আছে। মনীষী টমাস একইনাস ধমর্, নৈতিকতা ও রাজনীতিকে সমন্বিত করেন। তার বিপরীতে মেকিয়াভেলী এবং কোটিল্য ধর্ম ও নৈতিকতাকে রাজনীতি থেকে শুধু পৃথকই করেননি, রাজনীতির নিচে দুটোকে অবনত করেন। নৈতিকতা বিবর্জিত রাজনৈতিক দর্শনে ক্ষমতা এবং ক্ষমতা সুসংহতকরণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়। ক্ষমতাধিকারীদের ন্যায় এবং অন্যায় বোধ থাকতে নেই। ছল বল কলা কৌশল সবই জায়েজ। "সেই নিরিখে লোকের অনুরাগ অপেক্ষা ভীতি অর্জন করা একজন রাজার কাম্য হওয়া প্রয়োজন," নীতি বিচার অপেক্ষা ক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেয়াই শ্রেয়। রাজনীতির স্বার্থে ধর্মের মত পবিত্র বিষয়কেও কাজে লাগানো যেতে পারে। লোকের মন জয় করার জন্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগদান, ধর্মের ভান করা, নিজেকে ধর্মনিষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরাও রাজার পক্ষে বিধেয়। ক্ষমতার বিবেচনায় ন্যায়, নীতি এবং সংকোচ ইত্যাদির কোন স্থান নেই। "শাসনকর্তাকে প্রয়োজনে প্রজাতন্ত্রকে পরিহার করতে হতে পারে এবং প্রজাদের বিনাশেও প্রবৃত্ত হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।" নেতিবাচক বুদ্ধিজীবীরা বলেন, সরকার শক্তি প্রয়োগের জন্য গঠিত একটি যন্ত্রবিশেষ এবং সেটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য যাবতীয় শক্তি প্রয়োগ সমর্থনীয়। মেকিয়াভেলী আরো বলেন, শাসককে হতে হবে "শিয়ালের মত ধূর্ত সিংহের মত সাহসী।" সুতরাং আমাদের এই দেশে ক্ষমতাসীন রাজনীতিকরা কি ভূমিকা রেখেছেন তা ইতোমধ্যে নিশ্চয়ই বোধগম্য হয়েছে। আসলে 'লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার, তাই এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার।

লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

( লেখাটি পড়া হয়েছে ২৮৪২ বার )
font
সর্বাধিক পঠিত
advertisement
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
বিএনপি নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, সরকার দেশকে বৃহত্তর কারাগারে পরিণত করেছে, মানুষ অবরুদ্ধ। তার বক্তব্যের সঙ্গে আপনি একমত?
7 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
আগষ্ট - ২২
ফজর৪:১৮
যোহর১২:০২
আসর৪:৩৫
মাগরিব৬:৩০
এশা৭:৪৫
সূর্যোদয় - ৫:৩৬সূর্যাস্ত - ০৬:২৫
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে আনোয়ার হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :
FEnatunbartaSangbadBengalinewsnewstodayPratidinSunJJDINittefaqsamakaljobsinbdJugantororangebdbanglamailfinlandtimes