লাইফস্টাইল | The Daily Ittefaq

স্বপ্ন কেন দেখি!

স্বপ্ন কেন দেখি!
আসিফুর রহমান সাগর২৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং ০৯:৪৪ মিঃ
স্বপ্ন কেন দেখি!
 
কতভাবেই না স্বপ্ন দেখে মানুষ! জেগে দেখে ঘুমিয়ে দেখে। কতকিছুই না দেখে সেই স্বপ্নে। সাদা-কালো স্বপ্ন, রঙিন স্বপ্ন। ভয়ের স্বপ্ন, সাহসের স্বপ্ন, প্রেম-ভালোবাসা এবং আদরের স্বপ্ন। মাথামুণ্ডু নেই এমন স্বপ্নও দেখে। আমরা ঘুমের মধ্যে অনেক সময় অনেক কিছুই স্বপ্নে দেখি, তবে এসব স্বপ্নের অর্থ আমরা জানি না, বুঝতেও পারি না। কিন্তু কেন দেখে স্বপ্ন? এই এক প্রশ্ন নিয়ে বিজ্ঞানীদের ঘুম নেই। তারা স্বপ্ন দেখা বাদ দিয়ে লেগে আছেন এর কারণ খুঁজতে। শত শত বছর ধরে খোঁজা হচ্ছে কারণ। কারণ পরিষ্কারভাবে জানা যাক আর না যাক, স্বপ্ন দেখার কিছু থিওরি’ আবিষ্কার করে ফেলেছেন তারা। কোনো কোনো গবেষকের মতে স্বপ্ন হচ্ছে মানুষের অবদমিত মনের প্রতিফলন, আবার কারো মতে স্বপ্ন অর্থহীন।
 
এ প্রসঙ্গে সাহিত্যিক ও মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামাল বলেন, মানুষের ঘুমের দুইটি পর্যায় রয়েছে। একটি র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট - আরআইএম, অন্যটি নন র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট - নন আরআইএম। নন আরআইএম-এ থাকার সময় মানুষ স্বপ্ন দেখে না। সেই সময় সেরোটারিন হরমোন বেশি নিঃসরিত হয়। আরআইএম- পর্যায়ে থাকার সময় স্বপ্ন দেখে। এই সময় নন অ্যাড্রোনালিন ও অ্যাড্রোনালিন হরমোন বেশি নিঃসরিত হয়। মানুষ যখন উদ্বিগ্ন থাকে তখন সে স্বপ্ন বেশি দেখে। দৈনন্দিন জীবনে ঘটনার তথ্য মানুষের মস্তিষ্কের ‘থ্যালামাস’ নামক অংশে জমা হয়। যখন মানুষ ঘুমায়, তখন এই থ্যালামাস বন্ধ বা ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে। স্বপ্ন যখন দেখি তখন এই থ্যালামাস বন্ধ থাকে আর আরআইএম পর্যায়ে থাকার সময় থ্যালামাস দোলনার মত দুলতে থাকে। ফলে ছিন্ন ছিন্ন ঘটনাপ্রবাহ আমরা স্বপ্নে দেখি।
 
মোহিত কামাল বলেন, আমরা স্বপ্নে অনেক সময় দৌড়তে চাই, চিৎকার করতে চাই- কিন্তু পারি না। এটাকে অনেকে বোবায় ধরা বলে মনে করে। আসলে ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষ্কের মোটর সিগন্যাল বন্ধ থাকে। মোটর মুভমেন্ট বন্ধ থাকায় সেই কাজ করতে পারি না।
 
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিত্সা মনোবিজ্ঞানী রুবিন নাইমান মস্তিষ্ককে পরিপাকতন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করছেন। তিনি বলছেন, ‘রাতের বেলায় মস্তিষ্ক প্রতীকী অর্থে (সারা দিনের সবকিছু) গিলে খায়, হজম করে এবং তা থেকে নির্যাসটুকু নিংড়ে নিয়ে বাকিটুকু বের করে দেয়। আর মস্তিষ্ক যা রেখে দেয় আমাদের স্মৃতিতে, চিন্তায়, তাই থাকে এবং স্বপ্নকে এ প্রক্রিয়ার পরিপাক পদ্ধতি বলা যেতে পারে।’
 
স্বপ্ন যাই হোক না কেন, লোকসংস্কৃতিতে রয়েছে স্বপ্ন অনুযায়ী স্বপ্নের মানে। সুদূর অতীত থেকেই মানুষ স্বপ্নের এসব অর্থ বিশ্বাস করে আসছে। অনেকের স্বপ্ন নিয়ে নানা অন্ধবিশ্বাস রয়েছে। মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখলে এখনো ফকির খাওয়ানোর রেওয়াজ রয়েছে। তাছাড়া মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখলে যে দেখে তার আয়ু বেড়ে যায়, এমন ধারণাও প্রচলিত রয়েছে। এমন কথাও শোনা যায়, মৃত ব্যক্তি এসে স্বপ্নে ডাকলে সেই মানুষের মৃত্যু হয়। স্বপ্নের মানে নিয়ে বইও কম প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে, এসবের কোনো ভিত্তি নেই।
 
শুধু ঘুমের মধ্যে দেখা স্বপ্নই তো স্বপ্ন নয়, দিবাস্বপ্নটাও স্বপ্নই। অলস ব্যক্তিদের ‘দিবাস্বপ্ন’ দেখা নিয়ে উপহাস করা হলেও রাজনীতিক, বড় ব্যবসায়ী, লেখক-সাহিত্যিকরা তো দিবাস্বপ্নই দেখেন। এদিকে স্বপ্ন নিয়ে বড় উক্তি করেছেন ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবুল কালাম। তিনি বলেছেন, ‘মানুষ ঘুমিয়ে যা দেখে তা স্বপ্ন নয়। স্বপ্ন সেটাই- যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।’
 
স্বপ্ন  কি?
 
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্বপ্ন হচ্ছে মানুষের এমন এক মানসিক অবস্থা যাতে ঘুমের মধ্যে অবচেতনভাবে অনুভব করা কিছু ঘটনা। যেসব ঘটনা কাল্পনিক হলেও স্বপ্ন দেখার সময় সত্যি বলে মনে হয়। পুরানো অভিজ্ঞতার টুকরো টুকরো স্মৃতি সম্ভব অসম্ভব সব ঘটনার রূপ নেয়। স্বপ্ন দেখার সময় ঘুমের মধ্যেই মানুষের চোখ দ্রুত নড়াচড়া করে কিন্তু পুরো শরীর তখন শিথিল হয়ে থাকে। একে ইংরেজিতে বলে ‘র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট- আরইএম’। যদিও এ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। অন্যদিকে সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলেন, স্বপ্ন মূলত মানুষের গোপন আকাঙ্ক্ষা এবং আবেগের প্রকাশ। মানুষ যে স্বপ্ন দেখে তার বিবরণ পাওয়া গেছে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় বেশকিছু রেকর্ড পাওয়া গেছে। কাদামাটি দিয়ে তৈরি বেশ কিছু নথিতে স্বপ্নের বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রিক এবং রোমান যুগে মানুষ বিশ্বাস করতো যে স্বপ্নগুলি এক বা একাধিক দেবতার কাছ থেকে প্রত্যক্ষ বার্তা। অথবা কোনো মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে আসা বার্তা যা মূলত ভবিষ্যদ্বাণী হিসাবে গণ্য করা হতো। তবে ফ্রয়েড স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, স্বপ্ন মানুষের গভীরতম আকাঙ্ক্ষা এবং উদ্বিগ্নতা প্রকাশের মাধ্যম। যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দমনমূলক শৈশব স্মৃতি বা আচ্ছন্নতা দ্বারা প্রভাবিত এবং অবশ্যই যৌন উত্তেজনা মুক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। তবে আধুনিক যুগে স্বপ্নকে অবচেতন মনের একটি সংযোগ হিসাবে দেখা হয়।
 
১৯৪০-এর দশক থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ক্যালভিন এস হল পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি স্বপ্ন সম্বন্ধীয় প্রতিবেদন সংগ্রহ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইয়োতে অবস্থিত কেইস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটিতে পেশ করেন। ১৯৬৬ সালে হল এবং ভ্যান দ্য ক্যাসল দ্য কন্টেন্ট এনালাইসিস অফ ড্রিমস নামে একটি বই বের করেন। বইতে তারা কোডিং পদ্ধতির মাধ্যমে এক হাজার কলেজ ছাত্রের স্বপ্নের প্রতিবেদন তুলে ধরেছেন। সেখানে তারা দেখিয়েছেন যে, সমগ্র বিশ্বের জনগণ সাধারণত একই ধরনের বিষয় নিয়ে স্বপ্ন দেখে। পরে হলের উত্তরসূরি উইলিয়াম ডোমহফ দেখান যে, স্বপ্নে মানুষ অধিকাংশ সময়ই গত দিন বা গত সপ্তাহের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কিত কিছু দেখে।
 
যারা স্বপ্ন মনে রাখতে পারেন
 
২০১৪ সালের নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত তাদের দেখা স্বপ্ন মনে রাখতে পারেন, তাদের মস্তিষ্কের বিশেষ একটি অংশে বিশেষ স্বতঃস্ফূর্ত কর্মকাণ্ড ঘটে থাকে। যারা স্বপ্ন মনে রাখতে পারেন, তাঁদের মস্তিষ্কের ‘টেমপোরো-পারিয়েটাল জাংশন’ নামক একটি অংশে এটা ঘটে। শুধু ঘুমের মধ্যেই নয়, জেগে থাকা অবস্থায়ও স্বপ্ন মনে রাখতে পারা আর না-পারা এই দুই দল মানুষের মস্তিষ্কের এই অংশের কর্মকাণ্ড কিছুটা আলাদা। ওই গবেষণা থেকে দেখা যায়, যারা ঘুমের মধ্যে হালকা শব্দেই জেগে ওঠেন বা নড়েচড়ে ওঠেন বা ঘুমের ঘোরেই শব্দের প্রতিক্রিয়া দেখান, তাঁদের মধ্যে স্বপ্ন মনে রাখার হার বেশি।
 
স্বপ্ন ভুলে যায় মানুষ
 
ঘুম থেকে জেগে উঠবার পাঁচ মিনিটের মধ্যে দেখা স্বপ্নের অর্ধেক ভুলে যায় মানুষ। আর ১০ মিনিটের মধ্যে ৯০ শতাংশ ভুলে যায়। তবে সব মানুষ স্বপ্ন দেখে। যারা বলেন, দেখেন না তারা আসলে স্বপ্ন ভুলে যাচ্ছেন। প্রত্যেক রাতেই মানুষ এক থেকে দুই ঘণ্টা স্বপ্ন দেখে কাটান। এদিকে, স্বপ্নে মানুষ কোনো নতুন মুখ তৈরি করতে পারে না। চেনা মুখই ঘুরে ফিরে দেখা যায়। যারা বলেন, স্বপ্ন শুধু সাদাকালো হয়, তা ঠিক না। রঙিন স্বপ্নও দেখে মানুষ। ১২ শতাংশ মানুষ সাদাকালো দেখে। বাকি ৮৮ শতাংশ মানুষ রঙিন স্বপ্ন  দেখে থাকে। আরেকটা মজার তথ্য, নাক ডাকার সময় কেউ নাকি স্বপ্ন দেখে না।
 
প্রাচীনকালে স্বপ্নের বিছানায় ঘুমাতো মিসরীয়রা
 
খ্রিস্টপূর্ব ৩১০০ সালের মেসোপটেমিয়ায় সুমেরীয়রা স্বপ্নের নিদর্শন রেখে গিয়েছিলেন। কাদামাটির ট্যাবলেটগুলি থেকে জানা যায়, তখনকার লোকদের বিশ্বাস ছিল, আত্মা বা তার কিছু অংশ ঘুমন্ত ব্যক্তির শরীর থেকে বেরিয়ে এসে ঘুরে বেড়ায়। কখনও কখনও স্বপ্নের দেবতারা স্বপ্নদর্শীকে বহন করতে বলে। ব্যাবিলনীয় এবং আসিরিয়ানরা স্বপ্নকে বিভক্ত করেছিল ‘ভাল’ যা দেবতাদের দ্বারা প্রেরিত হয়েছিল এবং ‘মন্দ’ যা ভূতদের দ্বারা পাঠানো হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সালের দিকে প্রাচীন মিসরীয়রা তাদের স্বপ্নগুলোকে প্যাপিরাসে লিখেছে। তারা মনে করত যে ঐশ্বরিক সান্নিধ্য লাভের সর্বোত্তম উপায় ছিল স্বপ্ন দেখা। তাই মিসরীয়রা দেবতাদের কাছ থেকে পরামর্শ, সান্ত্বনা পাওয়ার আশায় বিশেষ ধরনের ‘স্বপ্নের বিছানায় ঘুমাতো। এদিকে খ্রিস্টের জন্মের পাঁচশ বছর আগে বলা হয়েছে,  স্বপ্ন হল মনের ভিতরের নিছক ইচ্ছার অভিব্যক্তি মাত্র। আর ঘুমের সময় আত্মা দেহ ত্যাগ করে এবং জাগ্রত হওয়ার আগ পর্যন্ত স্বপ্ন দ্বারা দেহ পরিচালিত হয়।
 
ইত্তেফাক/এমআর
 
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৬
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৩
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬