জাতীয় | The Daily Ittefaq

এশীয় আর্থিক সংকটের কুড়ি বছর

উপ-সম্পাদকীয়
এশীয় আর্থিক সংকটের কুড়ি বছর
ড. আতিউর রহমান১৫ অক্টোবর, ২০১৭ ইং ১০:১০ মিঃ
এশীয় আর্থিক সংকটের কুড়ি বছর
 
এখন থেকে কুড়ি বছর আগে হঠাত্ করেই এশীয় আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছিল। এ সংকট মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেই প্রকট রূপ ধারণ করেছিল। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি তখন খুব একটা উন্মুক্ত ছিল না বলে এর নেতিবাচক প্রভাব তেমনভাবে পড়েনি। কিন্তু আঞ্চলিক এই আর্থিক সংকট পুরো বিশ্ব-অর্থনীতিকে বিরাট ধাক্কা দিয়েছিল।
 
অন্যান্য অঞ্চলের অর্থনীতি এশীয় আর্থিক সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য নতুন করে সতর্কতার বিষয়টি মাথায় রেখে সাজাতে মনোযোগী হয়েছিল। তা সত্ত্বেও এর এক দশকের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ঠিকই বড় আকারের আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছিল। সেই সংকট থেকে জাপানও বাদ পড়েনি। উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি এখনো সেভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। অবশ্যি, আইএমএফ বলছে— একমাত্র যুক্তরাজ্য ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ধীরে হলেও বাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি এখনো তলানিতেই রয়ে গেছে। তার মানে উন্নত বিশ্বের অর্থনীতির মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো রয়েই গেছে।
 
এশীয় আর্থিক সংকটের সেই সময়ে আঞ্চলিক এই অর্থনীতির মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকটভাবেই দেখা দিয়েছিল। পাশাপাশি এ সংকটে আক্রান্ত দেশগুলোর (থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ইত্যাদি) আর্থিক নীতিতে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য ধরা পড়েছিল। বিশেষ করে, বিশ্ব-অর্থনীতির সঙ্গে ঢালাওভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য উন্মুক্ত করে দেবার যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল তাতে দুর্বলতা ছিল। একই সঙ্গে বিদেশি মুদ্রার হিসাব খুলে দেবার সিদ্ধান্তও ছিল অসময়োপযোগী। পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল আশাতীতভাবে ঊর্ধ্বমুখী। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ছিল অনন্য উচ্চতায়। ডলারের সঙ্গে প্রায় সব মুদ্রার গাঁটছড়া ছিল মজবুত। দেশগুলো গৃহায়ন খাতসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশি মুদ্রায় মাত্রাতিরিক্ত ঋণ গ্রহণে ছিল উদার। তাই বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা ঋণ আকারে আসছিল ঐ সব দেশে। সম্পত্তির মূল্য হু হু করে বাড়ছিল। স্টক মার্কেটেও ব্যাপক হারে বিদেশি বিনিয়োগ আসছিল। তাই স্টক মার্কেট হয়ে উঠেছিল দারুণ উত্তপ্ত। পুরো আর্থিক খাত ছিল অতিরিক্ত চাঙ্গা। দল বেঁধে বিদেশি মুদ্রায় বিনিয়োগকারীরা ঢুকছিলেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। কিন্তু সহসাই এই অঞ্চলের অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতা ধরা পড়ল। বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারলেন আর্থিক এই ফানুস বেশি দিন আর উড়বে না। তাই দল বেঁধেই তারা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে বিনিয়োগ তুলে নিয়ে ফের উন্নত দেশের বাজারে নিয়ে গেছেন। 
 
এ সময়টায় মালয়েশিয়া বিদেশি মুদ্রার লেনদেনে শক্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুললেও পরবর্তী সময়ে যুগোপযোগী আর্থিক উপরিকাঠামো গড়ে তোলে। ডলারের সঙ্গে সংযুক্ত এশীয় মুদ্রাসমূহের বিনিময় হারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। এই অস্থিরতার কারণে এশীয় অর্থনীতির মূল্য প্রতিযোগিতার সক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। যার ফলে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্য ক্ষতির মুখে পড়ে (উদাহরণ থাইল্যান্ড)। সাধারণত বিদেশি মুদ্রার আগমন স্বল্প মেয়াদি (বড়জোর এক বছর) হয়ে থাকে। এ স্বল্প মেয়াদি বিদেশি ঋণ সহজলভ্য হওয়ায় থাইল্যান্ডসহ অনেক দেশই তা গৃহনির্মাণসহ নানা খাতে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি বিনিয়োগ করে। কিন্তু এ অঞ্চলের ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, সুশাসনের অভাব, আর্থিকখাতে অস্বচ্ছতা, ঋণ ব্যবহারে অযোগ্যতা ও অদক্ষতার কারণে এসব ঋণ অনুপযুক্ত খাতে ‘যাচ্ছেতাই’ ভাবে ব্যবহূত হয়। তাছাড়া, কমসুদে সহজে মেলায় বিনিয়োগকৃত সম্পদের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। এসব খাত অতিমূল্যায়িত হয়ে যখন আর্থিক সংকট বা ‘বুদবুদ’ সৃষ্টি করে তখন স্বাভাবিক নিয়মে এসবের সংশোধন হতে শুরু করে। আর তখনই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ তুলে নেবার উদ্যোগ নেয়। সে সময়ে এশীয় আর্থিক খাত এ অর্থ পরিশোধ করে উঠতে হিমশিম খেতে থাকে। এই ‘টেনর মিস্ম্যাচে’-এর কারণেই মূলত আর্থিক খাতের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে আসে। 
 
আর তখনই উদ্যোক্তাদের অতিমূল্যের বিনিয়োগ সংকটে পড়ে। এই আর্থিক সংকটের পর পরই বিপর্যস্ত দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক নীতিমালায় বড় ধরনের সংস্কারের শক্ত পাটাতন নির্মাণ করে। আঞ্চলিক ও বিশ্ব আর্থিক সংস্থাসমূহ (এইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি) তাদের এই সংস্কারে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা প্রদানে এগিয়ে এসেছিল। ফলে এসব দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে টেকসই রূপান্তর সম্ভব হয়। যার ফলে কুড়ি বছর পরে আমরা দেখতে পাই যে, এশিয়া তার অর্থনৈতিক বুনিয়াদ আরো শক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। আগামী দিনে এই মহাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এখন মনে করা হয় যে, বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে এশিয়া। এই দু’দশকের সংস্কার ও লক্ষ্যভেদী নীতি কৌশলের কারণে এশীয় আর্থিক সংকটে বিপন্ন দেশগুলো বিদেশের অর্থের ওপর নির্ভরশীলতা ভালোভাবেই কমিয়ে ফেলেছে এবং আগামী দিনের আর্থিক স্থিতিশীলতা বেশ মজবুত করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের ম্যাক্রো অর্থনীতির মৌল উপাদানগুলো এখন অনেকটাই শক্তিশালী। তাদের মুদ্রার বিনিময় হার নমনীয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পর্যাপ্ত এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো বেশ জোরদার হয়েছে।
নিঃসন্দেহে এই দুই দশকের ব্যবধানে এ অঞ্চলের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এবং আর্থিক রেগুলেশনের কাঠামোর ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। তা সত্ত্বেও ২০০৭/৮ সালের বিশ্ব আর্থিক সংকটের ধাক্কা এশিয়ার দেশগুলোর আর্থিক খাতেও বেশ খানিকটা লেগেছে। বিশেষ করে উন্নত দেশের উদ্বৃত্ত তারল্যের একটি অংশ এশিয়া অঞ্চলের দিকে ধাবিত হয়। এখন আবার যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোর সুদের হার যখন বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে তখন এশীয় দেশগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগের একটি অংশ উন্নত বিশ্বের দিকে ধাবমান হতে দেখা যাচ্ছে। এর ফলে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মুদ্রার বিনিময় হার অস্থির হয়ে উঠছে। এর নেতিবাচক প্রভাব এশীয় বাজারে পড়ছে।
 
এশীয় আর্থিক সংকট মোকাবিলার অভিজ্ঞতা থেকে বেশ কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় ধরা পড়ে:
 
এক. আর্থিক উদারীকরণের বিষয়টি খুব ভেবেচিন্তে, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা উচিত। দেশীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে যথেষ্ট শক্তিশালী না করে এবং তার তদারকি সক্ষমতা কার্যকরভাবে নিশ্চিত না করে হুট করে বিদেশি মুদ্রার হিসাব উন্মুক্ত করে দেওয়া সঠিক হবে না। যথোপযুক্ত প্রস্তুতি ছাড়া প্রচুর পরিমাণে বিদেশি মুদ্রায় ঋণের সুযোগ করে দিলে তা অনুত্পাদনশীল খাতে যাবেই এবং তখন সম্পদের অতিমূল্যায়ন হতে বাধ্য।
 
দুই. ম্যাক্রো অর্থনীতির মৌল কাঠামোকে বরাবরই শক্তিশালী রাখতে হবে। আর্থিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই রাজস্ব আহরণ, নমনীয় বিনিময় হার এবং বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবার জন্য পর্যাপ্ত বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ গড়ে তোলার মতো বিচক্ষণ আর্থিক নীতিকৌশল অনুসরণ করা খুবই জরুরি।
 
তিন. আর্থিক দক্ষতা ও সহনীয়তা আরো উন্নত করার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কার এনে মৌলিক কাঠামোর দুর্বলতাসমূহ দূর করতে হবে। ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্সশিট পুনর্গঠন, বিচক্ষণ নিয়মনীতি ও তত্ত্বাবধান, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামো এমনভাবে উন্নত করতে হবে যাতে করে এ সব উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত সর্বোত্কৃষ্ট ব্যবস্থা, মৌলনীতি ও স্ট্যান্ডার্ডগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
 
এশিয়ার আর্থিক খাত ও ম্যাক্রো অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট উন্নতি সত্ত্বেও বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের বেশ কিছু উপকরণ (যেমন অতিরিক্ত তারল্য, বিশ্ব আর্থিক খাতের সঙ্গে আন্তঃসংযোগ) থেকে নানা চ্যালেঞ্জ তৈরির আশঙ্কা একেবারে দূর করা সম্ভব হয়নি। এখনো এশিয়ার আর্থিক খাত মার্কিন ডলারনির্ভর বিদেশি ঋণের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশেষ করে শেয়ার বাজারে ডলারনির্ভর ঋণের ব্যাপক উপস্থিতি অস্বীকার করার উপায় নেই। বাড়ন্ত এই বিদেশি মুদ্রার ঋণ ও বিনিয়োগ যেকোনো সময় অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। মার্কিন ফেড যদি একটু ‘টাইট’ মুদ্রানীতি গ্রহণ করে তাহলেই এশিয়ার বৈদেশিক বিনিয়োগে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তাই এ ঝুঁকি বিষয়ে সর্বদাই সচেতন থাকতে হবে। যদি কোনো কারণে ডলার বের হয়ে যেতে শুরু করে তাহলে এশীয় মুদ্রার দাম পড়ে যাবে। এতে হয়ত রপ্তানিকারকদের প্রণোদনা বাড়বে। কিন্তু আমদানি খরচ বেড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে। জনজীবনে দ্রব্যমূল্যের চাপ বাড়বে। তাই নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়ে খুব সতর্ক থাকতে হবে।
 
লেখক :বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
 
ই-মেইল: [email protected]
 
ইত্তেফাক/আনিসুর
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩১
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৫
মাগরিব৫:৫৯
এশা৭:১২
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৪