জাতীয় | The Daily Ittefaq

প্রশ্নপত্র ফাঁসের নেপথ্যে কারা

প্রশ্নপত্র ফাঁসের নেপথ্যে কারা
একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ * সর্বশেষ উত্তরা ব্যাংকের প্রশ্ন ফাঁস
আবুল খায়ের ও নিজামুল হক২৫ নভেম্বর, ২০১৭ ইং ০৩:০৮ মিঃ
প্রশ্নপত্র ফাঁসের নেপথ্যে কারা
ফাইল ছবি
‘পরীক্ষা’ এবং ‘প্রশ্ন ফাঁস’ যেন জোট বেঁধেছে। যেখানেই পরীক্ষা সেখানেই প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা, এখন প্রতিটি স্তরেই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটছে। শুধু পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায়ও। আর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এখন নতুন কিছু নয়।
 
দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি আলোচনায় এলেও এটি বন্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ না নেওয়ায় ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা। প্রশ্ন ফাঁস বন্ধে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন তারা। চলমান শিক্ষা ব্যবস্থায় বিরক্তও তারা। বলছেন, প্রশ্ন ফাঁস যেহেতু ঠেকানো যাচ্ছে না, তাহলে এত আয়োজন করে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে কেন।
 
সর্বশেষ শুক্রবার উত্তরা ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করেছে। সূত্র জানিয়েছে, উত্তরা ব্যাংকের সিবিএ’র এক নেতা এই ফাঁসের চক্রের সঙ্গে জড়িত। গোয়েন্দা সংস্থার একটি টিম তাদের নজরদারিতে রেখেছে। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তরপত্রও গোয়েন্দারা জব্দ করেছেন।
 
র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ইতিপূর্বে একাধিক প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তার মতে, যে কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা নেবে তাদের পূর্ণ প্রস্তুতি থাকতে হবে যাতে ওই পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার সুযোগ না থাকে।
 
অনেকে মনে করেন, এই পূর্ণ প্রস্তুতি ব্যত্যয় হওয়ায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটছে। প্রশ্নপত্র তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারী ছাড়া প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কোন আশঙ্কা নেই বলে অভিমত তাদের।
 
অভিভাবকরা বলছেন, যেখানে মুড়ি মুড়কির মতো ফেসবুকে ও প্রকাশ্যে প্রশ্ন কেনা বেচা হচ্ছে, ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যেখানে প্রশ্ন পাওয়া যায়। এসব ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ কে চালায় তা বের করা যাচ্ছে না কেন। প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে আশাহত শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কারো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়ায়ও ক্ষুব্ধ তারা। অভিভাবকরা বলছেন, প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে শিশু শিক্ষার্থীদের মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম মেধাহীন হয়ে পড়বে। এসব ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে ভুয়া প্রশ্ন দিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গেও এক ধরনের তামাশাও করা হচ্ছে।
 
বিএনপিসহ চার দলীয় জোট সরকারের শাসনামলে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের এক সদস্য প্রশ্নপত্র ফাঁসের সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ওই সময় দুটি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। গোয়েন্দা সংস্থা ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রসহ জড়িতদের আটক করে। এ ঘটনা আর আলোর মুখ দেখেনি। এরই ধারাবাহিকতায় প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
 
চলতি বছর অনুষ্ঠিত এসএসসি, এইচএসসি, সম্প্রতি শেষ হওয়া জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) এবং চলমান প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। অনেক অভিভাবক প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণও দেখিয়েছেন।
 
এখন অভিভাবক পরীক্ষার্থী পরীক্ষার আগে প্রশ্ন খোঁজে। এসব অভিভাবকদের যুক্তি হচ্ছে, যারা প্রশ্ন আগে পায় তারা শুধু সেগুলোই প্রাকটিস করে পরীক্ষা হলে যায়। ফলে শতভাগ প্রশ্নের উত্তর নির্ভুল দেয়। আর তার সন্তান কষ্ট করে লেখাপড়া করে পরীক্ষা দেবে। এই দুয়ের মূল্যায়ন এক হবে না।
 
আমেনা সুলতানা নামে এক অভিভাবক বলেন, আমরা চাই আমার সন্তান পরীক্ষায় ভালো করুক। এজন্য লেখাপড়া করিয়েছি। নিয়মিত নজরদারিতে রেখেছি। কিন্তু যখন শুনি অন্য কেউ পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পেয়েছে, তখন খারাপ লাগে। ক্ষোভ হয়। শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি বিরক্তি আসে।
 
বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রমাণিত হলেও বাতিল করার উদাহরণ আছে মাত্র দু’একটি। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে মূল প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া গেলেও অনেক সময় কর্তৃপক্ষ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। কখনো কখনো সাজেশন বলেও বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অনেককে গ্রেফতার করা হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির তেমন কোনো উদাহরণ নেই।
 
২০১২ থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের খবর আলোচনায় ছিল। একের পর এক পাবলিক পরীক্ষায় ঘটতে থাকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। মুড়ি মুড়কির মতো মানুষের হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়ে প্রশ্নপত্র। কোনটা ভুয়া আবার কোনটার অধিকাংশ মিলে যায় প্রশ্নের সঙ্গে।
 
বৃহস্পতিবার প্রাথমিকে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শুরুর আগের রাত থেকে ফেসবুকসহ বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে ‘প্রশ্ন’ ছড়িয়ে পড়ে। পরীক্ষা শেষে পাওয়া মূল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত মিল রয়েছে আগে পাওয়া প্রশ্নের সঙ্গে।
 
নানা নামে ফেসবুক গ্রুপ ও পেজ:
 
এখন দেশব্যাপী প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ফেসবুক গ্রুপ ও পেজ ব্যবহার করা হচ্ছে। ইনবক্সে কেনাবেচা হচ্ছে। অস্পষ্টভাবে প্রথমে প্রশ্নটি আপলোড করা হয়। বলা হয়, পুরো ও স্পষ্ট প্রশ্ন পেতে হলে ইনবক্সে যোগাযোগ করুন।  পিএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ২০১৭, ‘পিএসসি জেএসসি এসএসসি এইচএসসি অল ঢাকা বোর্ড কোয়েশ্চেনস ২০১৭’ ‘পিএসসি জেএসসি এসএসসি এইচএসসি কোয়েশ্চেনস সাজেশন অল বোর্ড এক্সামিন ২০১৭ + ২০১৯ + ২০ + ২১ বিডি, ফাঁস হওয়া প্রকৃত প্রশ্নপত্র ব্যাংক, প্রশ্ন ফাঁস, ‘পিএসসি জেএসসি এসএসসি এইচএসসি সাজেশন + কোয়েশ্চেনস ২০১৭-১৮ ইত্যাদি নামে একাধিক ফেসবুক পেজ এবং গ্রুপ রয়েছে। এসব পেজ এবং গ্রুপে পরীক্ষার আগেই সাজেশন এবং প্রশ্ন তুলে দেওয়া হয়।
 
প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য
 
এবারের জেএসসি পরীক্ষায় ধারাবাহিকভাবে প্রশ্ন ফাঁসের জন্য শিক্ষকদের দায়ী করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। প্রশ্নপত্র ছাপানোর স্থান বিজি প্রেস থেকে এখন প্রশ্ন ফাঁসের কোনো সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তিনি। 
 
তিনি বলেছেন, আগে বিজি প্রেস (সরকারি ছাপাখানা) ছিল প্রশ্ন ফাঁসের জন্য খুবই রিস্কি জায়গা। এখন সেখানে প্রশ্ন ফাঁসের কোনো সম্ভাবনা নেই। প্রশ্নপত্র ছাপানোর পর সিলগালা করে জেলাগুলোতে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে যায় থানায় থানায়। ওই পর্যায়েও প্রশ্ন ফাঁসের সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তিনি।কেবলমাত্র সকাল বেলা ওই দিনের প্রশ্ন প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে। কারণ আমরা সকাল বেলা যখন শিক্ষকের হাতে প্রশ্ন দিই, তখন কিছু শিক্ষক আছেন যারা সেটা আগেই অ্যারেঞ্জমেন্ট করে রাখেন, প্রশ্নপত্র ছাত্রদের দিয়ে দেন।
 
ইত্তেফাক/রেজা
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৪
মাগরিব৫:৫৮
এশা৭:১১
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫৩