জাতীয় | The Daily Ittefaq

বদলে যাওয়া গ্রাম-বাংলা এবং একজন মোনাজাতউদ্দিন

বদলে যাওয়া গ্রাম-বাংলা এবং একজন মোনাজাতউদ্দিন
ড. আতিউর রহমান২২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং ১৫:৪০ মিঃ
বদলে যাওয়া গ্রাম-বাংলা এবং একজন মোনাজাতউদ্দিন
খুব দ্রুতই গ্রাম-বাংলা বদলে যাচ্ছে। গ্রামীণ মানুষের আয়-রোজগারও বেশ বেড়েছে। গ্রাম আর শহরের জীবন চলার ধরনও ধীরে ধীরে প্রায় একই রকম হয়ে যাচ্ছে। শহরের মতো গ্রামেও আজকাল টেলিভিশনের সবগুলো চ্যানেল চালু থাকে, বিদেশে কর্মরত কোটিখানেক মানুষ নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন, ডলার পাঠান, গ্রামের মেয়েরা শহরে গার্মেন্টস ও অন্য শিল্প-কারখানায় কাজ করেন, শহরে কর্মরত গ্রামীণ মানুষের সংখ্যা অগুণতি। তারা নিয়মিত মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে গ্রামে টাকা পাঠান। তাই গ্রামে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে। বিশেষ করে নানা ধরনের ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা চালু হয়েছে। দোকানপাট, ভ্যান পরিচালনা ছাড়াও গ্রামে-গঞ্জে মোটর সাইকেল, মাইক্রোবাসের সংখ্যা বেড়েছে। গ্রামেও কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ে-শাদি, জন্মদিন, কুলখানি পালিত হচ্ছে। ডেকোরেটররা এসব অনুষ্ঠানে চেয়ার-টেবিল, বাসন-কোসন, প্লেট, চামচসহ পাচক ও অন্যান্য জনবল সরবরাহ করছেন। ঘনবসতির কল্যাণে ‘কানেকিটভিটি’ বেড়েছে। মোবাইল ফোন মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য, তথ্য ও অর্থ লেনদেন ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে গ্রাম-বাংলার অর্থনীতি ও সমাজে এক ধরনের বাড়তি গতিময়তা চোখে পড়ছে। কৃষিতেও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। চাষ, নিড়ানি, ফসল তোলায় প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়েছে। কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণও বেড়েছে। তা সত্ত্বেও কৃষির উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জলবায়ু সহনশীল ও পরিবেশসম্মত কৃষি উত্পাদনে আরও গবেষণা পরিচালনা করে নয়া জাতের উত্পাদনশীল ফসল চালু করা গেলে গ্রামীণ জীবনে আরও স্বাচ্ছন্দ্য মিলবে। বাড়তি জমিতে নানা ধনের ফলমূল, সবজি ছাড়াও অকৃষিজাত কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ বাড়বে। এখনই গ্রামীণ আয়ের ৭০ শতাংশ আসছে অকৃষি আয় থেকে। বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় এ তথ্য পাওয়া গেছে। যদি গ্রামীণ অবকাঠামো আরও উন্নত করা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ দান আরও বাড়ানো যায় তাহলে গ্রামীণ হাটবাজার তথা গ্রোথ-সেন্টারগুলোর সংখ্যা এবং সক্ষমতাও বাড়বে। তখন অকৃষি খাত থেকে মানুষের আয় আরও বাড়বে। ইতোমধ্যে গ্রামীণ অর্থনীতির এই গতিময়তার প্রভাবে গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার দ্রুত কমছে। গ্রামীণ অতি দারিদ্র্যের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগও বেড়েছে। তবে এসব সেবার গুণমান বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
 
আজ যদি চারণ-সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন বেঁচে থাকতেন তাহলে নিশ্চয় বদলে যাওয়া এই গ্রাম-বাংলার পরিবর্তনের এই চিত্র নানাভাবে তুলে আনতেন। এই ডিসেম্বর মাসের ২৯ তারিখে তাঁর ২২তম মৃত্যুদিবস পালিত হবে। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি বাহাদুরাবাদ ঘাটে ফেরি থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান। তাঁর এই অকাল মৃত্যুর কথা মনে হলেই মনটা ভেঙে যায়। তিনি আমার খুবই কাছের মানুষ ছিলেন। তাই তাঁর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের খোঁজ রাখতাম। তাঁর সাংবাদিকতার মূল প্রতিপাদ্য ছিল মানুষ। তিনি ঐ সময় যে গ্রামবাংলার খবর ফেরি করতেন তা থেকে আমরা অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছি। সে সময় তিনি গ্রামের মানুষের না খেয়ে থাকা, দুর্ভিক্ষাবস্থা, মজুরি পর্যাপ্ত না পাওয়া, গ্রামীণ মহাজন ও টাউটদের শোষণ ও নির্যাতন, নদীভাঙা মানুষের দুর্গতির কথাই বেশি করে বলতেন। আর বলতেন নারীর ক্ষমতাহীনতা ও অসহায়ত্বের কথা। পুরোপুরি না হলেও দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের ঐসব দিনলিপির কথা হয়তো এখন বেঁচে থাকলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করতেন না। হয়তো বলতেন নয়া বাস্তবতার কথা। নয়া এক গতিময় গ্রাম-বাংলার ছবি ফুটে উঠতো তাঁর লেখনিতে।
 
ঠিক কখন মোনাজাতউদ্দিনের সঙ্গে সামনা-সামনি পরিচয় হলো তা এখন আর মনে করতে পারছি না। তবে দৈনিক সংবাদের পেছনের পৃষ্ঠায় তাঁর তোলা ছবির সাথে কয়েক লাইনের সংবাদ পড়ে তাঁর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে চরের মানুষদের নিয়ে তাঁর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আমার দৃষ্টি এড়াতো না। আমি গ্রাম নিয়ে গবেষণা করি। তাই তাঁর প্রতিবেদনগুলো আমার গবেষণার দিক বদলে যথেষ্ট সাহায্য করতো। আশির দশকের শেষ প্রান্তেই পরিচয় হলো। তখন আমিও দৈনিক সংবাদের ‘অর্থনীতির পাতা’ ও সাহিত্যে সাময়িকীতে লিখি। ধীরে ধীরে এই পরিচয় এতোই গভীর হয়েছিল যে তিনি সুযোগ পেলেই চলে আসতেন আমাদের এলিফ্যান্ট রোডের বাসায়। বিশেষ করে এরশাদ শাসনামলের শেষদিকে তিনি তোলপাড় করা সব প্রতিবেদন ছাপছিলেন। আমিও সে সময়ে রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে কাজ করছিলাম। গ্রামীণ টাউটদের নিয়ে একটা গবেষণা করছিলাম। মোনাজাত ভাই এই গবেষণার জন্যে গ্রামীণ সমাজের ভেতরকার সব তথ্য জোগাড় করে দিয়েছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি তাঁর প্রতিবেদনগুলো সংকলিত করে বই আকারে প্রকাশ করতে শুরু করলেন। আমাকে ধরলেন তাঁর একটি বই ‘চিলমারীর একযুগ’ বইটির মুখবন্ধ লিখতে হবে। আগামী প্রকাশনী থেকে ১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। একযুগ ধরে মোনাজাতউদ্দিন চিলমারী অবলোকন করে তার পরিবর্তনের চিত্র এ বইতে তুলে এনেছিলেন। অবশ্যি তিনি বলতেন এসব ছাপা হলেই-বা কী হয়? কে কার ধার ধারে। আমি তাঁর এ ধারণার সঙ্গে এক হতে পারিনি। বরং মানুষের চেতনাকে শানিত করতে তিনি কী অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন তা হয়তো তিনিও অনুমান করতে পারেননি।
 
‘পথ থেকে পথে’ ঘুরে বেরিয়েছেন মোনাজাতউদ্দিন। ঐ বইয়ের মুখবন্ধে প্রয়াত সম্পাদক বজলুর রহমান লিখেছেন, “মোনাজাতউদ্দিনের চলার পথ, বলাবাহুল্য, রাজপথ নয়, জনপথ। কখনও বা মেঠোপথ। মাটির মানুষ, মাঠের মানুষ যেখানে কাজ করে, ফসল ফলায়, যেখানে নিত্য সে লিপ্ত সুকঠিন জীবন সংগ্রামে, সেখানেই তাঁর আসা-যাওয়া।”
 
নিঃসন্দেহে মানবিক ও সামাজিক সংকটে তিনি এমন ধারালো সব প্রতিবেদন ছাপতেন যে প্রশাসনের অন্দরমহল কেঁপে উঠতো। আমি দু’একটি প্রতিবেদনের নীরব সাক্ষী। ১৯৮৯ সালের এপ্রিল মাসের শুরুতেই খবর পেলাম জামালপুর জেলার তিতপল্লা গ্রামে দারুণ খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। ঐ গ্রামের ছাইতানি পাড়ায় ইজ্জত আলী নামের এক দিনমজুরের সন্তান খালেক অনাহারে অপুষ্টিতে মারা গেছে। চালের দাম ২০ টাকা সের। আটা নয় টাকা। সে সময় এতো দাম অভাবনীয় ছিল। কাজ নেই। মানুষ দিশেহারা। ‘সংবাদে’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক প্রয়াত বজলুর রহমানকে টেলিফোনে জানালাম এই পরিস্থিতি। বললাম, একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপলে হয়তো প্রশাসনের টনক নড়বে। তিনি শুনলেন। বললেন, ‘দেখি কি করা যায়’। এর দু’দিন পরেই তিন কলামে ব্যানার হেডিং ‘জামালপুরে চালের সের বিশ টাকা’। মোনাজাতউদ্দিনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। প্রশাসনে তোলপাড় পড়ে গেল। তিনজন মন্ত্রী জামালপুর সফর করলেন। ঐ গ্রামে ডিসি ইউএনওর দৌড়াদৌড়ি। খোলাবাজারে চাল বিক্রি। পঞ্চাশ টন চাল বরাদ্দ। চালের দামে লাগাম টানা হলো এভাবেই। ঐ প্রতিবেদনেই মোনাজাতউদ্দিন লিখেছেন যে তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে নিজে খুঁজে দেখেছেন যে বেশিরভাগ ঘরেই একমুঠো চালও নেই। অনেকেই এই প্রতিবেদনকে ‘আতঙ্ক ছড়ানো’র কাতারে ফেললেও অভুক্ত মানুষগুলো সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা পায়। মোনাজাতউদ্দিনও জানতেন না যে আমিই এই খবরের উত্স। তাঁকে ধন্যবাদ দেবার পর বুঝতে পেরেছেন বজলুর রহমান কোত্থেকে এই অনটনের সংবাদ পেয়েছিলেন।
 
তিনি খুব কাছে থেকে মানুষের দুঃখ বঞ্চনার কথা সংগ্রহ করে সংবাদ মাধ্যমে তুলে ধরতেন। গিয়েছেন গ্রাম-বাংলার গভীরে। খুঁজে বের করেছেন গ্রামীণ জীবনের অসংগতি। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন প্রশাসনের ব্যর্থতা। এরপর ১৯৯৫ সালের একেবারে শেষদিকে হঠাত্ একদিন শুনি তিনি বাহাদুরাবাদ ঘাটে ফেরি থেকে পড়ে গিয়ে চিরদিনের জন্যে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন তিনি। কী যে গভীর বেদনায় সেদিন আমাকে এই খবরটি গ্রহণ করতে হয়েছিল সে কথা আজ আমি আর লিখতে পারবো না। এরপর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। সাংবাদিক দীনেশ দাস বললেন, আমাকে মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি সংসদের সভাপতি হতে হবে। আমি রাজি হয়ে গেলাম। আমার পরিচালিত সমুন্নয়ের সঙ্গে যৌথভাবে মোনাজাতউদ্দিন ফেলোশিপ চালু করলাম তরুণ অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্যে। শুরু করলাম চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি পুরস্কার। দীনেশ এবং তাঁর সহকর্মীদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি সংসদ ভালোই চলছিল। এর মধ্যে আমি চলে গেলাম বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর হিসেবে। ছাড়তে হলে ঐ স্মৃতি সংসদের পদটি। কিন্তু তা সত্ত্বেও দীনেশকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছি স্মৃতি সংসদটি সক্রিয় রাখার জন্যে। হঠাত্ দুঃসংবাদ। দীনেশ এক দুর্ঘটনায় চলে গেছেন না ফেরার দেশে। হয়তো-বা মোনাজাতউদ্দিনের কাছেই। এরপর ঐ স্মৃতি সংসদটি চালানোর মতো উদ্যোগী কেউ আর এগিয়ে আসেননি। আমিও ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনার কাজে।
 
আমি আবার ফিরে এসেছি গবেষণায়। কিন্তু দীনেশ নেই বলে মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি সংসদটিও আজ আর সক্রিয় নেই। তবে রয়েছে মোনাজাত ভাইয়ের অসংখ্য ভক্ত। আর আছে তাঁর লেখা অনেক বই। এই বইগুলোই মোনাজাত ভাইয়ের সন্তান হিসেবে আজীবন তাঁর পুণ্য স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখবে।
 
লেখক: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।
 
ই-মেইল: [email protected]
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩০
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৭
মাগরিব৬:০২
এশা৭:১৫
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৭