জাতীয় | The Daily Ittefaq

চাই সামাজিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক সক্রিয়তা

চাই সামাজিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক সক্রিয়তা
ড. আতিউর রহমান২২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ইং ০৯:৫০ মিঃ
চাই সামাজিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক সক্রিয়তা
সমকালীন বিশ্ব বড়ই অস্থির এক সময় পার করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। মানবিক বিশ্ব গড়ার যে স্বপ্ন নতুন সহস্রাব্দে দানা বেঁধে উঠছিল তা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। তা সত্ত্বেও এশিয়ার অনেক দেশ টেকসই উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছে। বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। এ স্বপ্ন সফল করতে চাই সামাজিক সুস্থিতিশীলতা। চাই আশাবাদী ও মানবিক নীতিকাঠামো। এসব কথাই স্থান পেয়েছে আমার প্রকাশিতব্য ‘নিশিদিন ভরসা রাখিস’ বইতে। আমার আজকের এই লেখাটি আমার এই বইটিকে ঘিরে। পাঠকদের সংক্ষেপে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই বইটির পরিপ্রেক্ষিত ও তার নানা দিক বিষয়ে।
 
রবীন্দ্রনাথ মনে করেন যে সমাজ সচল থাকলে দেশ এগিয়ে যাবেই। আর সমাজের গতিময়তা অনেকটাই নির্ভর করে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ওঠানামার ওপর। এই সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত করতে পারে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। কেননা সাংস্কৃতিক সংযোগের মাধ্যমেই মানুষে মানুষে আত্মীয়তা বাড়ে। আর ইতিহাস-ঐতিহ্যই শেষ পর্যন্ত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের গতি-প্রকৃতির ধরন ঠিক করে দেয়। রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দের ইতিবাচক সক্রিয়তা এই গতিপ্রকৃতির স্রোতধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। বাঙালির বড়ই সৌভাগ্য যে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও বঙ্গবন্ধুর মতো কালজয়ী সমাজ-সংস্কৃতি সংলগ্ন মানুষের নেতৃত্বে এদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির বিকাশের ধারাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে দেখেছেন তারা। তাঁদের অনুপ্রেরণায় পোক্ত হয়েছে বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি ও সামগ্রিক অর্থে সংস্কৃতির পাটাতন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনা এই সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতেই গড়ে উঠেছে। বাঙালি জাতিসত্তা এসবেরই সম্মিলিত ফসল। নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশ এই আধুনিক জাতিসত্তাকেই ধারণ করে এগিয়ে চলেছে।
 
বাঙালির উন্নয়ন অভিযাত্রায় এই শক্ত সামাজিক-সাংস্কৃতিক জমিনের গুরুত্ব অপরিসীম। সামাজিক ঐক্য না থাকলে তা সহজেই অশান্ত হয়ে ওঠে। আর অশান্ত ও বিভাজিত সমাজে সন্ত্রাস ও অন্যায্যতা সহজেই বাসা বাঁধতে পারে। এই অস্থির সমাজ অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্যে মোটেও সহায়ক নয়। তাই টেকসই উন্নয়নের জন্য সমাজ ও সংস্কৃতির ইতিবাচক গতিময়তা অনস্বীকার্য। পুরো জনগোষ্ঠীর মনে ভরসার বীজ বুনে দেওয়ার জন্যেও চাই সামাজিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক সক্রিয়তা। আর সে কারণেই ‘নিশিদিন ভরসা রাখিস’ বইটিতে সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক বহুমাত্রিক ভাবনা যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। টাকার অভাবটাই যে আসল অভাব নয়, বরং ভরসার অভাবই বড়ো অভাব—রবীন্দ্র ভাবনার এই মূল সুরটি মনে রেখেই উন্নয়নের শক্ত ভিত্তি হিসেবে আশাবাদী সমাজ ও সংস্কৃতি বিনির্মাণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এই বইতে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, নববর্ষ ছাড়াও রবীন্দ্রনাথ, বঙ্গবন্ধু, নজরুল, শেখ হাসিনা, সৈয়দ শামসুল হক ও হাসান আজিজুল হকসহ অনেক সৃজনশীল মানুষের ভাবনার কথা স্থান পেয়েছে বইটির নানা অধ্যায়ে।
 
দু’টি পর্বে ভাগ করে উপস্থাপন করা হয়েছে সমাজ ও সংস্কৃতি-সংলগ্ন এ সব ভাবনা। প্রথমেই সচেষ্ট সমাজ বিষয়ে আলাপ করা হয়েছে। আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতির স্বতন্ত্র পরিচয়ের গোড়াপত্তন হয়েছে ভাষা আন্দোলনের হাত ধরে। সেই ভিত্তির ওপর ভর করেই আমরা পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন করছি আমাদের বাঙালির নববর্ষ হিসেবে। সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষ একই সমতলে এসে দাঁড়ান ঐ দিন বাঙালি পরিচয় নিয়ে। আশাজাগানিয়া আনন্দঘন এই শুভ নববর্ষের পটভূমিতেই গড়ে উঠেছে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। নববর্ষ উদ্যাপনের সঙ্গে আমাদের গতিময় অর্থনীতিরও সংযোগ ঘটে চলেছে নানা মাত্রিকতায়। ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা, ই-কমার্স ও সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে নববর্ষকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতি ও অর্থনীতি একে অপরের জন্যে শক্তি জোগানোর সুযোগ পায়।
 
দ্বিতীয় পর্বে আমাদের মহত্তম সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অর্জন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মানুষ ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন একাকার হয়ে ধরা পড়েছে এই পর্বে। দুঃখী মানুষের যুদ্ধ হলেও বিজয় দিবসের আনন্দে সকল শ্রেণির মানুষই ভেসে বেড়ান ১৬ ডিসেম্বরে। তাই আগামীর সোনালি স্বপ্নে বিভোর এই দিবসের তাত্পর্য নতুন করে ধরা পড়েছে এই পর্বে।
 
তৃতীয় পর্বে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের নিত্যসঙ্গী রবীন্দ্রনাথের আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশ ভাবনা স্থান পেয়েছে। একই সঙ্গে নজরুলের দারিদ্র্য বিষয়ক ভাবনাও সংযুক্ত হয়েছে এই পর্বে।
 
চতুর্থ পর্বে বাঙালির শ্রেষ্ঠতম মুক্তির দূত বঙ্গবন্ধুর নানামাত্রিক ভাবনা ও স্বপ্ন স্থান করে নিয়েছে। এই পর্বে অন্যান্য প্রবন্ধ ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর লেখা আত্মজীবনী ও ডায়েরিনির্ভর বিশ্লেষণধর্মী আমার দু’টো লেখা নিশ্চয় পাঠকদের দৃষ্টি এড়াবে না বলে আমার বিশ্বাস।
 
পঞ্চম পর্বে সমকালীন বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য কাণ্ডারি রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার ভাবনা-চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে। মূলত তাঁর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে লেখা এসব প্রবন্ধে সমকালীন উন্নয়নের কৌশলও ধরা পড়েছে পরোক্ষভাবে। আগামী দিনে বাংলাদেশ কোন্ পথে হাঁটবে তারও ইঙ্গিত রয়েছে এ লেখাগুলোতে।
 
ষষ্ঠ পর্বে স্থান পেয়েছে আমাদের শিল্প, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সাহিত্যের কয়েকজন অগ্রসর মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন। এদের অনেকেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তাই তাঁদের স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে আলাপ করেছি তাঁদের কর্মময় জীবনের নানা সৃষ্টি প্রসঙ্গে। এছাড়া প্রথিতযশা সমাজ বিজ্ঞানী অনুপম সেন ও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল হাসান আজিজুল হকের সৃজনশীল কয়েকটি কর্ম নিয়েও খানিকটা আলোকপাত করেছি এই পর্বে। এরা সকলেই এদেশের সংগ্রামী মানুষের জীবন-সংগ্রামের প্রভাবশালী কথক। আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির আশাজাগানিয়া রূপটি তাঁদের সৃজনশীল লেখালেখিতে নানাভাবে ধরা পড়েছে। তাই তাঁদের প্রতি আমাদের এই শ্রদ্ধার্ঘ্য।
 
লেখক: অধ্যাপক (সাম্মানিক), উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
Email: dratiur¦gmail.com
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩০
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৭
মাগরিব৬:০২
এশা৭:১৫
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৭