জাতীয় | The Daily Ittefaq

মাতৃভাষা : চর্চা ও মর্যাদা

মাতৃভাষা : চর্চা ও মর্যাদা
ড. মুহম্মদ মনিরুল হক২২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ইং ০৯:৫৫ মিঃ
মাতৃভাষা : চর্চা ও মর্যাদা
পৃথিবীর উন্নত ভাষাগুলোর মধ্যে একটি বিজ্ঞানসম্মত সজীব ও জীবন্ত ভাষা হিসেবে বাংলা বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি মানুষের প্রথম ভাষা বা মাতৃভাষা। মাতৃভাষার দিক থেকে চতুর্থ এবং জনসংখ্যার বিচারে এ ভাষা সপ্তম অবস্থানে। এ ভাষায় রচিত গল্প-উপন্যাস, কবিতা-সাহিত্য, গবেষণা-প্রবন্ধ ছিনিয়ে এনেছে বিশ্বস্বীকৃতি। বাংলাকে আন্তর্জাতিক সাহিত্য বা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক ভাষায় উন্নীত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মাতৃভাষা বাংলা বাঙালির শোণিত চিত্তে, স্বপ্নের ধ্বনিতে, উত্সাহ-উত্সবে এবং মুক্তির স্লোগানে শান্তি-সম্প্রীতির সুবাতাস ছড়িয়েছে যুগযুগান্তরে। বাঙালির ভাষা আন্দোলন বর্তমানে বিশ্বস্বীকৃত অন্যতম আন্দোলন; তার ফলেই হয়েছে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে প্রথম বাংলায় ভাষণ দিয়ে বাংলাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভাষায় উন্নীত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বাংলা ভাষায় দেওয়া বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। আশা করা যায়, জাতিসংঘের ৭ম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে খুব শিগগিরই বাংলা ভাষার স্বীকৃতি আসবে।
 
বাংলা এখন আর শুধু আঞ্চলিক ভাষা নয়, আন্তর্জাতিক ভাষাও। বাংলা ভাষায় রচিত গান এখন দুটি দেশের জাতীয় সংগীত। বাংলাদেশের ভাষাসংগীত এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা সংগীত যা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়ে প্রতিবছর (একুশে ফেব্রুয়ারি) গাওয়া হয়। ২০১৭ সালের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এ গানটি ১২টি ভাষায় গাওয়া হয়েছে। বাংলাভাষী মানুষের প্রধান আবাসভূমি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা হলেও উড়িষ্যা, আসাম, বিহারসহ আরও কয়েকটি প্রদেশের মানুষ বাংলা ভাষার চর্চা করে থাকে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, মালয়েশিয়াসহ ইউরোপের অনেক দেশে অসংখ্য বাংলাভাষী মানুষ বসবাস করে। ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান ও কানাডা থেকে বর্তমানে একাধিক সংবাদপত্র বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয় এবং দেশগুলোর টেলিভিশন ও বেতারে বাংলায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়। বাংলাদেশের সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ইউরোপ-আফ্রিকাসহ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে কাজ করছেন। সিয়েরা লিয়ন বাংলাকে তাদের দেশে দ্বিতীয় ভাষার মর্যাদা দিয়েছে। ফলে সেখানেও বাংলা ভাষা চর্চা হচ্ছে নানাভাবে।
 
বাংলা ভাষায় রয়েছে বিশাল শব্দভান্ডার। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধানে বাংলা ভাষার ৭৫ হাজার শব্দ দেওয়া আছে। বাংলা একাডেমি এ দেশের গ্রাম্য বা আঞ্চলিক ভাষার শব্দ সংগ্রহের চেষ্টা করেছিল। এতে দেড় লাখের বেশি শব্দ সংগৃহীত হয়েছে। বাংলা একাডেমির বিবর্তনমূলক অভিধানে শব্দের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার। ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে শব্দের সংখ্যা ৭৩ হাজার ২৭৯টি। রয়েছে শব্দগুলোর অভিধেয়। তথ্য-প্রযুক্তি বিপ্লবের পর যেসব শব্দ দৈনন্দিন বাংলা ভাষায় যুক্ত হচ্ছে সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছে বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধান। সেখানেও রয়েছে অনেক নতুন শব্দ। বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারে অনেক পরিভাষাও যুক্ত হয়েছে। বলা যায়, ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট স্থাপনের পর বাংলা পরিভাষা প্রণয়ন ও রচনার সূত্রপাত। অক্ষয়কুমার দত্ত, রামগতি ন্যায়রত্ন, বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়, যোগেশ চন্দ্র রায়, দ্বারকানাথ মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. কুদরাত-এ-খুদা, আবুল মনসুর আহমদ, আতোয়ার রহমান, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, ড. আনিসুজ্জামান, নূরুল হুদা, মনসুর মুসা প্রমুখ উল্লেযোগ্য অবদান রেখেছেন পরিভাষা প্রয়োগে। পরবর্তীকালে বাংলা একাডেমিকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশে পরিভাষার চয়ন ও সংকলন করা হয়েছে, যেগুলো বর্তমানে বাংলাভাষার শব্দভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
 
বাংলা ভাষার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, প্রভাব, শব্দভান্ডার এবং সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণ ও নিয়মবিধি থাকা সত্ত্বেও মাতৃভাষা বাংলায় দিন দিন কমছে দেশি শব্দের ব্যবহার। বাংলা ভাষায় যথাযথ শব্দকে পাশ কাটিয়ে প্রতিবর্ণ, বিকৃত শব্দ, সংযুক্ত শব্দের ব্যবহার করা হচ্ছে অহরহ, যার অধিকাংশই হচ্ছে অর্ধেক বাংলা অর্ধেক ইংরেজি শব্দ। সাম্প্রতিক কিছু উদীয়মান লেখকের মধ্যে পর্যন্ত এ রকম খামখেয়ালি প্রবণতা লক্ষণীয়। এমনকি চলচ্চিত্র-নাটক, সংকলন-সাময়িকীর শিরোনামও লেখা হচ্ছে প্রতিবর্ণীকৃতভাবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিষয় খোলার ক্ষেত্রে বাংলা পরিভাষা তেমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। অধিকন্তু দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের ক্ষেত্রেও বাংলা ভাষার ব্যবহার তেমনভাবে নেই। বাংলা প্রতিশব্দ বা অর্থবোধক শব্দ থাকা সত্ত্বেও নিয়মনীতি না মেনে সেগুলোর প্রতিবর্ণীকৃত শব্দ তৈরি করা হচ্ছে। বেতার-টেলিভিশন, ফেইসবুক-টুইটারে বাংলা বাক্যে বাংলা-ইংরেজি মিশ্রিত শব্দের ব্যবহার করা হচ্ছে অযাচিতভাবে।
 
এ কথাও স্বীকার্য যে, কোনো লোকই তার ভাষার সব শব্দের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে না। ইংরেজি ভাষায় সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শব্দ থাকলেও শেকসপিয়ার তাঁর নাটকগুলোয় ১৫ হাজারের বেশি শব্দ ব্যবহার করেননি বলে জানা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেক নতুন শব্দ প্রয়োগ করেছিলেন। কিছু ইংরেজির অনুবাদ করে, কিছু পুরনো শব্দ বা ধাতুর ওপর কারুকর্ম করে। এরকম অনেক সাহিত্যিকের আবির্ভাবে ভাষার শব্দসম্পদ বেড়ে যায়। একটি ভাষার অভিভাবক বিবেচনা করা হয় কবি ও সৃষ্টিশীল লেখকদের। অনেক সময় অভিধানের মতো নির্ভর করা হয় শিল্প-সাহিত্যিকের ভাষা ও রচনাশৈলীর ওপর। সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু বাংলা একাডেমিসহ বিভিন্ন সংস্থা-সংগঠন এবং পত্রপত্রিকা নিজ নিজ ভাষানীতি ও নিয়ম দ্বারা পরিচালিত হয়; নিজ নিজ নিয়ম ও সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ থাকে ভাষা প্রয়োগে। ফলে, ভাষার প্রতি মমত্ববোধে যাঁরা কাজের প্রয়োজনে পরিশীলিতভাবে বাংলাকে (লিখিত ও মৌখিক) প্রকাশ করতে চান, তারা পড়েন দুরবস্থায়, এমনকি স্বীকৃতির সংকটে। সঠিক/ভুল মূল্যায়ন করার সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষও যেন থাকে না।
 
বাংলাকে সঠিক ও শুদ্ধভাবে প্রকাশ করার জন্য সমাধানযোগ্য সমস্যাও অনেক এবং তা অনেকদিন ধরেই। নিজ নিজ প্রতিভা ও মেধায় উদ্ভাসিত ভাষাতাত্ত্বিকরাও সমাধানযোগ্য বিষয়ে ঐকমত্য প্রকাশ করছেন না। অফিস কিংবা ব্যক্তিগত কাজে যাঁরা বাংলা ভাষাকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে চান, তাঁদের জন্য ভাষাপণ্ডিতদের সহজ-সরল সমাধান তেমনভাবে চোখে পড়ছে না। বাংলা একাডেমির অভিধানে খ্রিষ্টাব্দে ‘ষ’ থাকলেও অনেক বিজ্ঞ ব্যবহারকারী তাতে ‘স’ ব্যবহার করেন সচেতনভাবে। বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শব্দকে পাশ কাটিয়ে স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি ব্যবহার হচ্ছে অহরহ। উপরন্তু বাংলা-ইংরেজি শব্দের খণ্ডাংশ ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে নতুন শব্দ। প্রতিবর্ণীকরণের সর্বজনীন নিয়ম-নীতি না থাকার কারণে শব্দের সঙ্গে ‘ই’, ‘ঈ’, ‘ ু’ কিংবা ‘ ূ’ বসিয়ে যেখানে-সেখানে পরিবর্তন করা হচ্ছে শব্দের উচ্চারণ। ফলে ব্যত্যয় ঘটছে অর্থের। একই শব্দের বিভিন্নরূপ প্রয়োগও ঘটছে মাত্রাতিরিক্ত।
 
ভাষা একটি চলমান ব্যাপার। তাতে জোর খাটানো চলে না। তথাপি মাতৃভাষা বাংলায় এতসব শব্দ-প্রতিশব্দ-যথাশব্দ থাকা সত্ত্বেও সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে অন্য ভাষা থেকে ধার করা শব্দ জোর করে ঢোকানোর প্রবণতা থেকে উত্তরণের পথ তৈরি করা প্রয়োজন। তা না হলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিকৃত শব্দের ব্যবহার দেদারসে চলতে থাকবে। তখন এ জাতীয় শব্দগুলোর প্রয়োগ-আত্তীকরণের জন্য নতুন করে নিয়মনীতি তৈরি করতে হবে। প্রতিবর্ণীকৃত শব্দ গঠনের সহজ-সরল নীতিবিধান প্রণয়ন এবং বাংলা-ইংরেজি শব্দের খণ্ডাংশ ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন শব্দ তৈরির ক্ষেত্রে বিধি আরোপ বা নিয়মনীতি প্রণয়ন করা যেতে পারে। বাংলা একাডেমির অভিধান যেমন তার যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও সহজলভ্যতা দ্বারা সর্বজনীনতা অর্জন করেছে, তেমনি ভাষার ব্যাকরণবিধিকে আরো সহজ করে অভিধানের মতো এক মলাটে নিয়ে আসা যেতে পারে।
 
লেখক: জেন্ডার ও উন্নয়ন গবেষক
সহকারী পরিচালক, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট।
 
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫১
আসর৪:১২
মাগরিব৫:৫৬
এশা৭:০৯
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫১