জাতীয় | The Daily Ittefaq

উত্তাল মার্চেই বাঙালি ফের 'স্ব-শাসনের' স্বাদ পায়

উত্তাল মার্চেই বাঙালি ফের 'স্ব-শাসনের' স্বাদ পায়
ড. আতিউর রহমান০২ মার্চ, ২০১৮ ইং ১০:৪৪ মিঃ
উত্তাল মার্চেই বাঙালি ফের 'স্ব-শাসনের' স্বাদ পায়
বাঙালির জাতিসত্তা গঠনে একাত্তরের মার্চ এক অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিল। সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী আওয়ামী লীগের প্রধান বঙ্গবন্ধু যখন বাঙালির প্রাণের দাবি ছয়-দফার মূল আবেদনের আলোকে নয়া সংবিধানের খসড়া প্রণয়নে ব্যস্ত ছিলেন তখনই এলো দুঃসংবাদটি। মূলত: ভুট্টোর ষড়যন্ত্র এবং সামরিক-বেসামরকি শাসকগোষ্ঠীর প্ররোচনায় তত্কালীন মিলিটারি শাসক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন সাংবিধানিক পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন ১ মার্চ হঠাত্ করেই স্থগিত করে দেন। আর সাথে সাথে বিক্ষুব্ধ বাঙালি প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। সে দিন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করছিলাম। হঠাত্ করেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠল। ক্লাস বন্ধ হয়ে গেল। ছাত্রছাত্রীরা দল বেঁধে পূর্বাণীতে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু ও তার সহনেতাদের কাছে রওনা হয়ে গেল। ঐ হোটেলে তারা নয়া সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন করছিলেন। শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন। রাত্রে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেলাম। প্রতিদিন বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। সাংস্কৃতিক শিল্পীরা শহীদ মিনারে প্রতিবাদী গান ও নাটকের অনুষ্ঠান করছিলেন। উত্তাল মার্চের প্রতিক্ষণে বিক্ষুব্ধ মানুষের জয় বাংলা রণধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে  বঙ্গবন্ধু তার সবটুকু প্রাণশক্তি ঢেলে গর্জে উঠলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’  এর পর থেকেই বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্তিত্ব শেষ হয়ে যায়।
 
২৬ মার্চ পর্যন্ত কার্যত বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশের মতোই পরিচালিত হয় বঙ্গবন্ধু ও তার সহকর্মীদের নেতৃত্বে। সে সময় সারা বাংলাদেশের শ্রমিক সমাজ, জনপ্রশাসন, ব্যাংক-বীমা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দেয়। পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর একাত্তরের মার্চেই বাংলাদেশ তার ‘স্ব-শাসন’ ফের জারি করতে সক্ষম হয়। এরপর আর বাঙালি পেছন ফিরে তাকায়নি। কোনো রকম প্রশ্ন না করেই জনগণ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশকে সরকারি নির্দেশ মনে করে সেসব পালন করতে থাকেন। তাই কোথাও জনজীবন বিপর্যস্ত হয়নি। একই সঙ্গে দলে দলে মানুষ প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে অংশগ্রহণ করেন। রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মী, গৃহবধূ, ছাত্রছাত্রী, সরকারি-বেসরকারি কর্মী দল বেঁধে প্রতিরোধে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় সামাজিক সহমর্মিতার এক অবিস্মরণীয় বিস্ফোরণ ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের সেই প্রস্তুতি পর্বে নারীসহ সাধারণ মানুষের এই অভূতপূর্ব অংশগ্রহণের কারণেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধটি রূপান্তরিত হয়েছিল এক অসাধারণ জনযুদ্ধে। অসহযোগের ঐ টগবগে দিনগুলোতেই নির্ধারিত হয়ে যায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চরিত্র কী হবে।
 
বঙ্গবন্ধু তার ৭ই মার্চের ভাষণেই ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। শত্রুকে ভাতে মারবো, পানিতে মারবো বলে তিনি গেরিলা যুদ্ধের স্পষ্ট দিক নির্দেশনাও সেদিন দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনার আলোকেই একাত্তরের ৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ তথা জনযুদ্ধ সংঘটিত হয়। অনেক আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ১৬ ডিসেম্বরে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও বাঙালিকে পূর্ণ বিজয়ের স্বাদ অনুভব করার জন্য ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ঐ দিন বন্দিদশা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে পা রাখেন বঙ্গবন্ধু। তাত্ক্ষণিকভাবেই শুরু করেন যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্নির্মাণ। নিরন্তর পুনর্গঠনের সংগ্রামের মাধ্যমে যখন অনেকটাই বিধ্বস্ত অবকাঠামো, প্রশাসন ও অর্থনীতি সচল করতে সক্ষম হলেন বঙ্গবন্ধু; ঠিক তখনই হঠাত্ করে বাংলাদেশবিরোধী অপশক্তি আঘাত করলো তাকে। বাঙালি হারালো জাতির পিতাকে। বাংলাদেশ হাঁটতে শুরু করলো উল্টো পথে। যুদ্ধাপরাধীরাই দেশ পরিচালনার সুযোগ পেল। ফের সংগ্রাম ও রক্তপাত। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ফিরে পায় মুক্তিযুদ্ধের পথ-নকশা। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা স্বদেশকে এগিয়ে নিতে থাকেন মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন অভিমুখে। ফের ছন্দ পতন। ২০০৮ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার তিনি ক্ষমতাসীন হলেন। তার নেতৃত্বে নানা প্রতিকূলতা উের জোর কদমে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর আরাধ্য বাংলাদেশ চিরজীবী হোক। জয় বাংলা।
 
লেখক: অধ্যাপক (সাম্মানিক), উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক। ই-মেইল: [email protected]
 
ইত্তেফাক/এসএস
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৪
মাগরিব৫:৫৮
এশা৭:১১
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫৩