জাতীয় | The Daily Ittefaq

কিছু পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মাসোহারা পান

কিছু পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মাসোহারা পান
আবুল খায়ের২২ মে, ২০১৮ ইং ০১:৩৭ মিঃ
কিছু পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মাসোহারা পান
স্থানীয় প্রশাসনের এক শ্রেণির পুলিশ, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা এবং এক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতাদের সরাসরি সম্পৃকতায় সারাদেশে অবাধে ইয়াবাসহ মাদক পাচার হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এসব কর্মকর্তাদের অনেকে ইয়াবায় আসক্ত। এ কারণে দেশে ইয়াবার প্রবেশ ও পাচাররোধ করা যাচ্ছে না। 
 
স্থানীয় পুলিশ ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক শ্রেণীর কর্মকর্তারা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা পেয়ে থাকেন। আর রাজনৈতিক নেতাদের একটা অংশ রাজনীতিতে সময় ব্যয় না করে ইয়াবাসহ মাদক পাচারে গডফাদারের আসনে বসে আছেন। ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে প্রতি মাসে তারা কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছেন। নামে রাজনীতিক নেতা, আসলে মাদক ব্যবসায়ী। মাদক পাচারের রুটগুলো নিরাপদ রাখতে তারা ভূমিকা রাখেন। স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় ইয়াবাসহ মাদকের ব্যবসা রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এমন কোন পাড়া-মহল্লা, ওয়ার্ড নেই যেখানে মাদক বেঁচাকেনা হয় না।  ইত্তেফাকের অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
 
এদিকে র্যাব পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে গতকাল গুলি বিনিময়কালে আরো ৯ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদক দ্রব্য, অস্ত্র ও গুলি। এ নিয়ে গত ৪ মে থেকে গতকাল পর্যন্ত মাদক নির্মুল অভিযানে নিহতের সংখ্যা ২৫ এ দাঁড়ালো।
 
জানা গেছে, পুলিশের বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও বিক্রিতে সহযোগিতা করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে হরহামেশা। পুলিশের ঘুষের বড় অংশ মাদকে উশুল হচ্ছে। বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তেও অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দফতর থেকে সারা দেশের পুলিশের জন্য ১০ দফা নির্দেশনা জারি করা হয়। এতে বলা হয়, যেসব পুলিশ সদস্য মাদক বিক্রেতার কাছ থেকে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেন, তাদের চিহ্নিত করে বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা, প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে।
 
মাদকে জড়িত থাকার অভিযোগ ইতিমধ্যে ৬৭ জন পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরেও রয়েছে। এদের মধ্যে র্যাবের তিন জন সদস্য আছেন। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় শাস্তি পাওয়া পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মাদক গ্রহণের দায়ে পাঁচজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তাদের তিনজনই নোয়াখালী জেলার। বাকি দুজন খাগড়াছড়ি ও হবিগঞ্জের। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে এক শ্রেণির সদস্য মাদক ব্যবসা বা সেবনে জড়িত শুধু তাই নয়, সব পেশার মধ্যেই এক শ্রেণির লোক ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায় জড়িত এবং তারা নিজেরাও খায়। 
 
আমাদের টঙ্গী (গাজীপুর) সংবাদদাতা জানান, গাজীপুরের টঙ্গীর নিমতলী এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। গত রবিবার গভীর রাতে রেজাউল ইসলাম রনি ওরফে বেসতি রনি (২৭) গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। এ সময় টঙ্গী থানা পুলিশের উপ- সহকারি পুলিশ পরিদর্শক ওমর ফারুক ও আনোয়ার হোসেন আহত হন। নিহত রনি এরশাদ নগর এলাকার ৩ নম্বর ব্লকের স্থায়ী বাসিন্দা হাফিজুল ইসলামের ছেলে। তার বিরুদ্ধে টঙ্গী থানায় হত্যা, মাদক ও অস্ত্রসহ ১৫টি মামলা রয়েছে। এই খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসি মিস্টি বিতরণ ও আনন্দ-উল্লাস করেন। এছাড়া ওই রাতে পুলিশের অভিযানে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে ২০জন তালিকাভূক্ত মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে টঙ্গী থানা পুলিশ। এ ব্যাপারে টঙ্গী থানার (ওসি) কামাল হোসেন ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, রনি চিহ্নিত মাদক।
 
পলাশ (নরসিংদী) সংবাদদাতা জানান, নরসিংদী ও পলাশের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ইমান আলী (২৮) র্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। সোমবার ভোরে ঘোড়াশাল পৌরএলাকার খালিসকার টেক গ্রামে তার বাড়ি সংলগ্ন মাঠে এ ঘটনা ঘটে। বন্দুক যুদ্ধের পর ইমান আলীর কাছ থেকে একটি  বিদেশি পিস্তল ও বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।  এ ঘটনায় র্যাবের দুই সদস্য আহত হয়েছে বলে র্যাব সূত্রে জানা যায়। র্যাবের দাবি ইমান আলী নরসিংদীর শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ও নিয়ন্ত্রক। ইমান আলী ঘোড়াশাল খালিসকার টেক গ্রামের মিলন মিয়ার ছেলে। তার নরসিংদী সদর উপজেলার নাগরিয়াকান্দি গ্রামে একটি ও ঘোড়াশালে খালিসকার টেক গ্রামে একটি বাড়ী রয়েছে। তার বিরুদ্ধে পলাশ ও নরসিংদী থানায় হত্যাসহ বিস্ফোরক, অস্ত্র ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একাধিক মামলা রয়েছে। তার মা মমতাজ বেগম ওরফে বুডীও একজন শীর্ষ মাদক সম্রাজ্ঞী।
 
কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) সংবাদদাতা জানান, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার নরেন্দ্রপুর গ্রামে র্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তি ওই গ্রামের মৃত মোহাম্মদ আলীর ছেলে মো. সব্দুল ইসলাম। সোমবার রাত পোনে ২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় র্যাবের ৩ জন সদস্য আহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ ফেন্সিডিল, ইয়াবাসহ একটি পিস্তল, গুলি ও দেশিয় অস্ত্র।
 
জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা জানান, জীবননগর উপজেলার উথলী গ্রামের সন্যাসীতলা মাঠে রবিবার রাত পৌনে ১ টার সময় পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে জনাব আলী নামে চিহ্নিত এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। নিহত জনাব আলী (৩২) উথলী গ্রামের আমতলা পাড়ার মো. জামাত আলীর ছেলে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি সর্টগান, দু’টি কার্তুজ, ৩টি রামদা এবং ১ বস্তা ভারতীয় ফেন্সিডিল উদ্ধার করেছে। বন্দুকযুদ্ধের সময় জীবননগর থানার ৩ পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতরা হলেন- সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মিলন হোসেন, কনস্টেবল ওয়ালিদ রহমান এবং কনেস্টবল জুয়েল হোসেন। আহত পুলিশ সদস্যদেরকে উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত জনাব আলীর নামে জীবননগর থানাসহ পাশ্বাবর্তী দামুড়হুদা ও চুয়াডাঙ্গা সদর থানায় অন্তত ১১টি মাদক মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছেন।
 
ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে র্যাবের সাথে কথিত বন্দুক যুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ী মো. আবুল কালাম আজাদ খান (৪২) নিহত হয়েছে। গত রবিবার রাত সাড়ে ১২টার সময় ঘাটাইল উপজেলার দেওলাবাড়ীতে এ ঘটনা ঘটে। র্যাবের দাবি এ ঘটনায় তাদের দুই সদস্য আহত এবং ঘটনাস্থল থেকে একটি বিদেশী পিস্তল, তিন রাউন্ড তাজা গুলি, একটি ম্যাগজিন, একশ বোতল ফেনসিডিল ও দেড় হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত মো. আবুল কালাম আজাদ খান ঘাটাইল উপজেলার পূর্ব পাকুটিয়া এলাকার মৃত আব্দুর রহমান খানের ছেলে। র্যাবের দাবি নিহত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ছয়টি মাদক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
 
যশোর অফিস জানায়, যশোরে সোমবার ভোরে মাদক ব্যবসায়ীদের কথিত বন্দুকযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনজন নিহত হয়েছেন। যশোর শহরতলীর শেখহাটি ও খোলাডাঙ্গায় মাদক ব্যবসায়ীদের কথিত এ বন্দুকযুদ্ধের পর পুলিশ ওই তিনজনের লাশ উদ্ধার করেছে। নিহতরা হলেন যশোরের শার্শা উপজেলার টেংরা গ্রামের আব্দুর রহমানের ছেলে সিরাজুল ইসলাম (৩৫) ও মহিষাডাঙ্গা গ্রামের হারুন অর রশিদের ছেলে মুত্তাজুর রহমান মুন্না (৩৪) এবং চৌগাছা উপজেলার আন্দুলিয়া গ্রামের শফিকুল ইসলাম (৩৮)। এ নিয়ে গত তিনদিনে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ৭ জন নিহত হলেন।
 
মাদক নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুশিয়ারির পর গত শনিবার ভোরে বন্দুকযুদ্ধের প্রথম ঘটনাটি ঘটে। অভয়নগরের এই বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় তিনজন নিহত হন। এরপর রোববার ভোরে যশোর শহরতলী সুজলপুর এলাকায় কথিত আরেকটি বন্দুকযুদ্ধে আরও একজন নিহত হন। সর্বশেষ সোমবার ভোরে শহরতলীতে পৃথক দু’টি বন্দুকযুদ্ধে আরও তিনজন নিহত হলেন। তিনদিনে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত সাত জনই মাদক ব্যবসায়ী বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি। যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি একেএম আজমল হুদা জানান, সোমবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে শহরতলীর শেখহাটি ও খোলাডাঙ্গায় মাদক ব্যবসায়ীরা নিজেদের মধ্যে গোলাগুলি করছে- এমন সংবাদ পায় পুলিশ। খবর পেয়ে পুলিশ ওই স্থান দুটিতে যায়। এ সময় শেখহাটির নওয়াব আলীর খেজুর বাগান নামক স্থান থেকে দুটি মৃতদেহ ও ৪শ’ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। একইসাথে খোলাডাঙ্গা মাঠের মধ্যে থেকে এক মরদেহ ও একশ’ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে দুটি পিস্তল ও গুলির খোসা পাওয়ার কথাও জানান তিনি।
 
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী জানান, রাজশাহীর পুঠিয়ায় র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী লিয়াকত আলী মন্ডল (৪৫) নিহত হয়েছে। রবিবার দিবাগত গভীর রাতে উপজেলার বেলপুকুর ইউনিয়নের ক্ষুদ্র জামিড়া গ্রামে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ঘটে। লিয়াকত আলী মন্ডল উপজেলার বানেশ্বর ইউনিয়নের নামাজগ্রাম গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা জাক্কার আলী মন্ডলের ছেলে ও বানেশ্বর ইউপির ২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ৮টি মামলা ছিল। এর আগে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হন। র্যাব জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাবের একটি অপারেশন দল পুঠিয়ার বেলপুকুরে মাদকবিরোধী অভিযান চালায়। এ সময় মাদক ব্যবসায়ীরা র্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করে। র্যাবও পাল্টা গুলি বর্ষণ করে। এতে মাদক ব্যবসায়ী লিয়াকত আলী নিহত হন। ঘটনাস্থলে ১টি বিদেশী পিস্তল, ২ রাউন্ড তাজা গুলি ও ৮২৩ পিস ইয়াবা পাওয়া যায়।
 
নিহতের বড় ভাই জুবের মন্ডলের দাবি, লিয়াকত এক সময় মাদক ব্যবসা করতো। প্রায় ২ বছর আগে মাদক ব্যবসা ছেড়ে সে গরুর খামার করে। গত জানুয়ারিতে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা লিয়াকতকে ধরে নিয়ে হাত ভেঙ্গে দেয়। ওই সময় লিয়াকত রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না বলে প্রত্যায়নপত্র দেন পুঠিয়া পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রবিউল ইসলাম রবি। এরপর আইনশৃংখলা বানিহীর সদস্যরা তাকে ছেড়ে দেয়। জুবের মন্ডল আরও দাবি করেন, রবিবার দুপুরের আগে কয়েক ব্যক্তি তাকে ডেকে নিয়ে যায়। এর পর থেকে লিয়াকত আর বাড়ি ফিরেনি। রাতে তারা খবর পান লিয়াকত বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে।
 
 
ইত্তেফাক/ইউবি
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩৩
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৩
মাগরিব৫:৫৭
এশা৭:১০
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫২