জাতীয় | The Daily Ittefaq

জীবন রক্ষাকারী ভালসারটান ওষুধ নিয়ে বিশ্বব্যাপী তোলপাড়

জীবন রক্ষাকারী ভালসারটান ওষুধ নিয়ে বিশ্বব্যাপী তোলপাড়
এফডিএ রিপোর্টে ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রমাণিত * বাংলাদেশে ওষুধটি প্রত্যাহারের নির্দেশ * আগেই প্রত্যাহার হয়েছে ইউরোপ-আমেরিকায়
আবুল খায়ের২১ জুলাই, ২০১৮ ইং ২৩:৫৭ মিঃ
জীবন রক্ষাকারী ভালসারটান ওষুধ নিয়ে বিশ্বব্যাপী তোলপাড়
 
উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগের রোগীদের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ হলো ভালসারটান। এই ওষুধটি নিয়ে বিশ্বব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এই ওষুধ সেবন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফুড অ্যান্ড ড্রাগস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) রিপোর্টে প্রমাণিত হয়েছে যে, ভালসারটান ওষুধ সেবনে ক্যান্সারের ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে লিভার, ফুসফুস ও স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ প্রেক্ষিতে ইউরোপ-আমেরিকায় ওষুধটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাংলাদেশেও ওষুধটি প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, যারা ওষুধটি সেবন করেছেন তারা উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ থেকে রেহাই পেলেও মরণঘাতী ক্যান্সারের ঝুঁকি তাদের মধ্যে রয়েছে।
 
উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় ডায়োভান। সুইজারল্যান্ডের ওষুধ কোম্পানি নোভারটিস উদ্ভাবিত ডায়োভানের জেনেরিক নাম ভালসারটান। ২০১৪ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফুড অ্যান্ড ড্রাগস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) ওষুধটি উৎপাদন ও বাজারজাত করার অনুমতি দেয়। ওই বছরের এপ্রিলেই সারা বিশ্বে মোট ২১৯ কোটি ডলারের ডায়োভান বিক্রি করে নোভারটিস। নোভারটিস কোম্পানি কারো কাছে এই ওষুধের কাঁচামাল  বিক্রি করে না। সুইজারল্যান্ডের এই কোম্পানির বাইরে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের অধিকাংশ নামীদামী কোম্পানি ভালসারটান ওষুধটি তৈরি করেছে। বাংলাদেশে প্রায় ২৫টি কোম্পানি ভালসারটান ওষুধটি তৈরি করে বাজারজাত করেছে। তারা কোত্থেকে উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগীদের জীবন রক্ষাকারী এই ভালসারটান ওষুধের কাঁচামাল ক্রয় করছে এ দেশের প্রশাসন বিষয়টি জানে না। প্রশাসন যদিও জানে, এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের সঙ্গে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেনের মাধ্যমে নিম্নমানের কাঁচামাল ক্রয় করে ভালসারটান ওষুধটি তৈরি করে আসছে। ওই প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান, ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই হয় না। ইউরোপের ২৩টি দেশে বাজারজাতকৃত ভালসারটান ওষুধের মধ্যে ক্যান্সার তৈরির এনডিএমএ পাওয়া যায়। এই ওষুধ তৈরির কাঁচামাল চীন থেকে ক্রয় করা হয়। যা ছিল নিম্নমানের কাঁচামাল। বাংলাদেশেও ভালসারটান ওষুধটি উৎপাদনকারী সিংহভাগ কোম্পানি চীন থেকে নিম্নমানের কাঁচামাল ক্রয় করেছে বলে জানা যায়। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিককালে চীনের ওই কোম্পানির কাঁচামালের তৈরি কালাজ্বরের ওষুধ ব্যবহার করে অনেক রোগীর প্রাণহানি ঘটেছে। এ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল।
 
শরীরের জন্য ক্ষতিকর ক্যান্সারের পদার্থ থাকায় গত ১৬ জুলাই এফডিএ বাজার থেকে ওষুধটি প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেয়। এর আগে ইউরোপীয়ান মেডিসিন এজেন্সিও ওষুধটি প্রত্যাহার করার নির্দেশ দিয়েছিল। কারণ এতে ক্ষতিকারক এন-নাইট্রোসোডিমেথিলামাইন (এনডিএমএ) আছে। এনডিএমএ হলো কার্সিনোজেন। এই কার্সিনোজেন মানুষের শরীরে ক্যান্সার সৃষ্টি করে। 
 
ওষুধটি যুক্তরাষ্ট্রে বাজারজাত করে মেজর ফার্মাসিউটিক্যালস, তেভা, ঝেইজাং হুয়াহাই ফার্মাসিউটিক্যালস এবং সলকো হেলথকেয়ার। তেভা ও সলকো ওষুধটি তৈরিও করে। নোভারটিস জানিয়েছে, তারা ওষুধটি যুক্তরাষ্ট্রে বাজারজাত করে না। ইউরোপের ২৩টি দেশ থেকে নোভারটিস স্যান্ডোজ ভালসারটান এবং ভালসারটান এইচসিটি ফিল্মকোটেড ট্যাবলেট প্রত্যাহার করেছে। ঝেইজাং হুয়াহাই জাপান, চীন, কানাডা এবং হংকং থেকে ওষুধ প্রত্যাহার করেছে। চীনের ঝেইজাং হুয়াহাই কোম্পানির কাঁচামালের তৈরি ভালসারটান ওষুধটি ইউরোপ-আমেরিকায় বাজারজাত করা হয়েছিল। এফডিএ জানিয়েছে, ওষুধে এনডিএমএ কী পরিমাণ আছে পরীক্ষা করছেন তারা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্স অন ক্যান্সার জানায়, এনডিএমএ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকারক। তবে এটা প্রাণীর ক্ষেত্রে ক্ষতির কারণ হিসেবে প্রমাণ পাওয়া গেলেও মানুষের জন্য কতটুকু ক্ষতিকর তা জানা যায়নি।
 
এদিকে উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগীদের মধ্যে যারা ভালসারটান ওষুধ সেবন করেছেন তাদের মধ্যে অনেকটা আতঙ্ক বিরাজ করছে। ওষুধ খেয়ে মরণঘাতী ক্যান্সারের দানা শরীরে বেঁধেছে এটা অনেকের মানতে কষ্ট হচ্ছে।
 
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদরোগ বিভাগের চেয়ারম্যান ও প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সজল ব্যানার্জি জানান, উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগীদের বেশিরভাগ ব্যবস্থাপত্রে ভালসারটান ওষুধটির উল্লেখ থাকে। এটি খুবই পরিচিত ওষুধ। তবে সুইজারল্যান্ডের নোভারটিস কোম্পানির বাইরে অন্য কোনো কোম্পানির ওষুধ তিনি রোগীদের জন্য লেখেননি বলে জানান।
 
ল্যাবএইড হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বরেণ চক্রবর্তী বলেন, নোভারটিস কোম্পানির উৎপাদিত ওষুধ নিয়ে আমেরিকার এফডিএ’র পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রশ্ন তোলেনি। তবে হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশে উৎপাদিত কোনো কোনো কোম্পানির ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে দেওয়া হয়ে থাকে। এতে অনেক ভালো সফলতা আছে, অনেক রোগী ভালো হয়ে যায়। এই ওষুধে এনডিএমএ নামক ক্ষতিকর কার্সিনোজেন আছে কি না তা চিকিৎসকদের জানার কথা না। কিন্তু এ সকল কোম্পানির তৈরি ভালসারটান ওষুধে গুণগত মান কিংবা তাদের অবস্থান সম্পর্কে ব্যাখ্যা করে জনমনের দুশ্চিন্তা দূর করতে তিনি আহ্বান জানান।
 
নোভারটিস এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নোভারটিস ফার্মার পণ্য ডায়োভান, কো-ডায়োভান, এক্সফর্গ এইচসিটি এবং এনট্রেসটো সম্প্রতি চিহ্নিত দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এনডিএমএ যা ভালসারটান একটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) তে পাওয়া গেছে সেটি ঝেইজাং হুয়াহাই ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের উত্পাদিত। এই কোম্পানি ভালসারটান এপিআই উৎপাদনের জন্য অনুমোদনপ্রাপ্ত নয়। এছাড়া তারা বাণিজ্যিক এবং ক্লিনিক্যাল পণ্য উৎপাদন করতেও অভ্যস্ত নয়। অনুমোদিত ভালসারটান এপিআই উৎপাদিত হয় সুইজারল্যান্ডের ব্যাসেল, যুক্তরাজ্যের লিংকনশায়ারে নোভার্টিসের কোম্পানিতে।
 
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক গোলাম কিবরিয়া ইত্তেফাককে বলেন, গতকাল এ বিষয়ে অবহিত হওয়ার পর এদেশে যে সকল কোম্পানি ভালসারটান ওষুধটি তৈরি করছে তা বাজার থেকে প্রত্যাহার করার এবং এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তারা আরো ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন বলে জানান।
 
ইত্তেফাক/মোস্তাফিজ
 
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩১
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৫
মাগরিব৫:৫৯
এশা৭:১২
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৪