জাতীয় | The Daily Ittefaq

মারা গেছেন বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী

মারা গেছেন বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী
চট্টগ্রাম অফিস০৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং ০৮:৩৩ মিঃ
মারা গেছেন বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী
একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জননী নামে সর্বমহলে শ্রদ্ধেয় বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী আর নেই। তিনি সোমবার ভোর সাড়ে ৪টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। 
 
বেশ কিছুদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা রমা চৌধুরীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। গত রবিবার সন্ধ্যার পর তার শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হয়। রাতে রমা চৌধুরীকে লাইফ সাপোর্ট দেয়া হলে তার শুভানুধ্যায়ী মহলে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়। ভোরে তিনি মারা যান। 
 
সোমবার সকাল ১০টার পর রমা চৌধুরীর মরদেহ নগরীর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হয়। অপরাহ্নে মরদেহ গ্রামের বাড়ি বোয়ালখালীর পোপাদিয়ায় নেয়া হবে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্যানুষ্ঠান হবে। তার মৃত্যুতে নগরীতে সকল মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
 
কোমরে পাওয়া আঘাত, গলব্লাডারে পাথর, ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্টসহ বেশ কিছু শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হলে এ বছরের ১৫ জানুয়ারি রমা চৌধুরীকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন।
 
রমা চৌধুরী ১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর বোয়ালখালী উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি তিনি অর্জন করেন।  সাগর, টগর, জহর এবং দীপংকর এই ৪ সন্তানকে ঘিরে তার সংসার আবর্তিত হয়েছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে ২ পুত্রকে হারানোর পাশাপাশি তিনি নিজেও সম্ভ্রমহানির শিকার হন। তার ঘর-বাড়ি আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয় বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যরা।
 
জীবনে তিনি কখনো মানুষের দয়া সহানুভূতির জন্য কাতর হননি। নিজের লেখা বই বিক্রি করে তিনি জীবন ধারণ করতেন। তার লেখা গ্রন্থসমূহের মধ্যে- একাত্তরের জননী, এক হাজার একদিন যাপনের পদ্য এবং ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখযোগ্য। তিনি সর্বমোট ১৮টি গ্রন্থ রচনা করেছেন।
রমা চৌধুরীর সংগ্রামী জীবনের কথা : রমা চৌধুরী একাত্তরের বীরমাতা। স্বাধীনতাযুদ্ধে ঘরবাড়ি, তিন শিশুসন্তান, স্বামী সবকিছু হারিয়ে পথে বসেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স করা এই নারী। পেশায় ছিলেন স্কুল-শিক্ষিকা। ১৯৭১ সালের ১৩ মে তিন শিশুসন্তান নিয়ে চট্টগ্রামের পোপাদিয়ায় গ্রামের বাড়িতে ছিলেন তিনি। পাকিস্তানি দালালদের সহযোগিতায় পাকসেনারা রমা চৌধুরীদের বাড়িতে হানা দেয়। নিজের মা এবং দুই শিশুসন্তানের সামনে তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। বাড়িও পুড়িয়ে দেয়। অনাহারে, অর্ধাহারে শীতে দু’সন্তান সাগর আর টগরের অসুখ বেঁধে যায়। ২০ ডিসেম্বর রাতে মৃত্যুবরণ করে সাগর। একই অসুখে আক্রান্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মারা যায় টগর।
 
দেশ স্বাধীন হলে শুরু হয় আরেক লাঞ্ছনা- সমাজের চোখে তিনি তখন এক ‘সম্ভ্রম হারানো নারী’। তৃতীয় ছেলে টুনু ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। হিন্দুধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শবদেহ পোড়ানোতে বিশ্বাস করেন না রমা চৌধুরী। তাই মৃত্যুর পর তার তিন সন্তান ও মাকে কবরস্থ করা হয়। এরপর আর জুতা পায়ে দেননি।  
 
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার তিন ছেলে মাটির নিচে। তাদের শরীরের উপর দিয়ে জুতা পায়ে আমি হাঁটি কী করে? আমার সন্তানদের কষ্ট হবে না?’
 
স্মৃতিকথামূলক ২টি বই লিখেছেন রমা চৌধুরী। একটি ‘সেই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। অন্যটি ‘স্মৃতির বেদন অশ্রু ঝরায়’। এছাড়া ‘একাত্তরের জননী’, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথামূলক উপন্যাস। ১৯৬১ সালে রমা চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের ইতিহাসের এক উত্তালক্ষণে তিনি দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েছেন। এমনও বলা হয়ে থাকে, তিনিই চট্টগ্রামের প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর নারী। কাজেই তার এই স্মৃতিকথার একটা ঐতিহাসিক-সামাজিক মূল্য আছে। তার অপর স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থটি সরাসরি ইতিহাস-সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চট্টগ্রামে শিক্ষকতার পেশায় নিযুক্ত ছিলেন রমা চৌধুরী। একে তো শিক্ষিত, সচেতন মানুষ, তার ওপর নারী, সাথে যুক্ত হয়েছে তার হিন্দু-পরিচয়। সবমিলিয়ে পাকিস্তানি বর্বর আর্মিদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি নিজে যেমন নির্যাতিত হলেন, তেমনি নিজের দুই সন্তানকে হারালেন। তার জীবনের সেই ক্রান্তিকাল নিয়ে তিনি লিখেছেন এখানে।
এছাড়া তার স্মৃতিতে একাত্তর নিয়ে অগ্রন্থিত কিছু গদ্য আছে। স্মৃতিকথা নামে কয়েক পর্বে ছাপা হয়েছে পাক্ষিক ‘অনন্যা’ পত্রিকায়। ২০১৫ সালের ‘অনন্যা’ ঈদসংখ্যায় নিজের জীবনে বেড়ালের ভূমিকা নিয়ে অসাধারণ এক গদ্য লেখেন। ২০১৪ সালে তিনি অনন্য শীর্ষদশ সম্মাননা পান।
 
গত কয়েক বছর তিনি ভীষণভাবে অসুস্থ ছিলেন। অর্থকষ্টে ঠিকমতো চিকিৎসা নিতে পারেননি। গত ২০ জুন ২০১৭ তারিখের দৈনিক ‘ইত্তেফাক’-এ প্রকাশিত খবরে বলা হয়- ‘অর্থের অভাবে লেখিকা রমা চৌধুরী হাসপাতাল ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা দরকার; কিন্তু অর্থাভাবে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসতে হয়েছে।’  তখন রমা চৌধুরীর বইয়ের প্রকাশক আলাউদ্দিন খোকন বলেছিলেন, ‘রমা চৌধুরী নিজেই কারো কাছ থেকে অর্থ-সহযোগিতা নিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করতে চান না। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে যেমন কোনো অর্থসহযোগিতা নেননি, তেমন কোনো ব্যক্তির কাছ থেকেও নিতে চান না। নিজের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে চেয়েছেন এই সংগ্রামী নারী।’
 
 
ইত্তেফাক/ইউবি
 
 
 
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩১
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৫
মাগরিব৫:৫৯
এশা৭:১২
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৪