জাতীয় | The Daily Ittefaq

একশ বছরের ব-দ্বীপ পরিকল্পনা অনুমোদন

একশ বছরের ব-দ্বীপ পরিকল্পনা অনুমোদন
ইত্তেফাক রিপোর্ট০৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং ০১:৩৮ মিঃ
একশ বছরের ব-দ্বীপ পরিকল্পনা অনুমোদন
দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত পরিকল্পনা ডেল্টা প্ল্যান বা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রায় শত বছরব্যাপী এই পরিকল্পনার মাধ্যমে বন্যা, নদী ভাঙন, নদী শাসন, নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগর বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।
 
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে এই মহাপরিকল্পনা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সংবাদ সম্মেলনে বৈঠকের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক দলিল। একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত, কারিগরি ও আর্থ-সামাজিক দলিল এই পরিকল্পনা। প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ, ইচ্ছা ও নির্দেশে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) পক্ষ থেকে এই পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।
 
তিনি বলেন, আজকের দিনটি আমাদের দেশের জন্য একটি ‘রেড লেটার ডে’ (স্মরণীয় দিন)। ২১০০ সাল নাগাদ আমরা দেশের পানি ব্যবস্থাপনাকে কিভাবে দেখতে চাই, এটা তারই পরিকল্পনা। তিনি আরো জানান, ২০২১ সালে থেকে ২০৪১ সাল নাগাদ আরেকটা প্রেক্ষিত পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। এর আলোকে আমরা উন্নত দেশ গড়ার লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে যাব। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, নেদারল্যান্ড এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে ৬ হাজার বর্গ কিলোমিটার নতুন ভূমি পেয়েছে। তাদের সহযোগিতাতেই এ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।
 
মন্ত্রী জানান, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির কারণে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার এই পরিকল্পনা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয়। উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন এবং পানি, জলবায়ু, পরিবেশ ও ভূমির টেকসই ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলাসহ ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ ও ২০৪১ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদা অর্জনের লক্ষ্যে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বাংলাদেশের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করবে।
 
তিনি বলেন, উন্নত দেশের পথে হাঁটতে হলে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। সেক্ষেত্রে এককথায় বলা যায়, ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন অপরিহার্য। তাছাড়া প্রকল্পটির মূল প্রতিপাদ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো। এরইমধ্যে ভূমিতে ক্ষয় হচ্ছে ব্যাপক। নদী ভাঙনের ফলে প্রতিবছর ৫০ থেকে ৬০ হাজার পরিবার গৃহহীন হচ্ছে। বন্যায় অনেক ফসলহানি হচ্ছে। এর বাইরেও বিশেষ করে শহর অঞ্চলে সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কৃষি জমিতে ব্যাপক রাসায়নিক সারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের মতো চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি উত্পাদক শক্তি না কমিয়ে কিভাবে তার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা যেতে পারে, ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় এসব বিষয়ের প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
 
মন্ত্রী আরো জানান, ঝুঁকি বিবেচনায় ছয়টি হটস্পট চিহ্নত করা হয়েছে এই পরিকল্পনায়। সেইসঙ্গে এসব হটস্পটে ৩৩ ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। হটস্পট গুলো হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চল, বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, নদী ও মোহনা অঞ্চল এবং নগরাঞ্চল। এক্ষেত্রে দেশের আটটি হাইড্রোলজিক্যাল অঞ্চলকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকি মাত্রার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে একই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির সম্মুখীন জেলাগুলোকে একেকটি গ্রুপের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। পানি ও জলবায়ুজনিত অভিন্ন সমস্যাকবলিত এই অঞ্চলগুলোকেই হটস্পট হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
 
ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় হটস্পটগুলোর এসব চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা সমাধানে বেশকিছু কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বন্যার ঝুঁকি কমাতে নদী ও পানিপ্রবাহের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ রাখা, পানিপ্রবাহের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নদীগুলোকে স্থিতিশীল রাখা, পর্যাপ্ত পরিমাণে ও মানসম্মত স্বাদু পানি সরবরাহ করা, নদীগুলোর পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা, নদীগুলোতে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য নৌপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যথাযথ পলি ব্যবস্থাপনা, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য রক্ষা, বন্যা ও জলাবদ্ধতাজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমানো, পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন নিশ্চিত করা, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকায় টেকসই জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করা, বন্যা থেকে কৃষি ও বিপন্ন জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা, সুপেয় পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সঠিক নদী ব্যবস্থাপনা, টেকসই হাওর ও জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত পানি ও ভূমিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা ও ঝড় বৃষ্টি থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শহর রক্ষা, সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা ছাড়াও নগর অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন সক্ষমতা বাড়ানো ও নগর এলাকায় বন্যার ঝুঁকি কমানো গুরুত্ব পেয়েছে।
 
সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ব-দ্বীপ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে গঠন করা হবে ডেল্টা তহবিল। এই তহবিলের সম্ভাব্য উত্স হিসেবে বাংলাদেশ সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, পরিবেশ ও জলবায়ু সম্পর্কিত তহবিল, বিশেষ করে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বকে (পিপিপি) বিবেচনা করা হয়েছে। ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ বাস্তবায়নের জন্য ২০৩০ সাল নাগাদ জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থায়ন প্রয়োজন। এর মধ্যে ২ শতাংশ নতুন বিনিয়োগ এবং শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় করতে হবে। জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগ সরকারি তহবিল হতে এবং শতকরা ২০ ভাগ বেসরকারি খাত থেকে আসবে। প্রাথমিক পর্যায়ে বড় শহরগুলোতে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় আদায়ের ক্ষেত্রে এ নীতিমালা কার্যকর করার চেষ্টা করা হবে এবং তা পর্যায়ক্রমে সময়ের আবর্তনে অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হবে।
 
জিইডি সূত্রে জানা যায়, ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ এর প্রাথমিক ধাপ বাস্তবায়ন হবে ২০৩০ সাল নাগাদ। এই পরিকল্পনা যাচাই-বাছাই শেষে প্রথম পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য ৮০টি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫টি ভৌত অবকাঠামো-সংক্রান্ত এবং ১৫টি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং গবেষণাবিষয়ক প্রকল্প রয়েছে।
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩৩
যোহর১১:৫১
আসর৪:১২
মাগরিব৫:৫৫
এশা৭:০৮
সূর্যোদয় - ৫:৪৮সূর্যাস্ত - ০৫:৫০