ঢাকা সোমবার, ২৫ মার্চ ২০১৯, ১১ চৈত্র ১৪২৫
২৫ °সে

প্রথম ১৪৪ ধারা ভাঙেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

প্রথম ১৪৪ ধারা ভাঙেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
ফাইল ছবি

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। বেলা ১১টা। আমতলার সভায় সিদ্ধান্ত হলো ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে। শুরু হয়। সভাপতির ভাষণ দিতে উঠে গাজীউল হক উপস্থিত ছাত্রদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে দেন।

তিনি বলেন, ‘নুরুল আমিন সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে পুলিশ মোতায়েন করেছে। ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা হলে নাকি গুলি করা হবে, ছাত্রদের হত্যা করা হবে। আমরা সরকারের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছি। ১৪৪ ধারা আমরা ভাঙবো। আমরা দেখতে চাই নুরুল আমিন সরকারের অস্ত্রাগারে কত বুলেট জমা আছে।’ তার বক্তৃতা শেষ হওয়ার সাথে সাথে শ্লোগান ওঠে, ১৪৪ ধারা মানি না— মানি না। গগন-বিদারী শ্লোগানের সাথে সাথে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। সত্যাগ্রহ করতে দশ জনের দল করে দল বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়। তবে কে প্রথম ১৪৪ ধারা ভাঙবে এ নিয়ে সবার মাঝে খানিক ইতস্ততা বোধ কাজ করছিল।

মোহাম্মদ সুলতানকে দায়িত্ব দেওয়া হয় যারা সত্যাগ্রহ করতে বাইরে যাবেন তাদের নাম, ঠিকানা লিখে রাখার। তাকে সাহায্য করেন জনাব আজহার ও হাসান হাফিজুর রহমান। নাম ধাম লিখে নেয়ার জন্য মোহাম্মদ সুলতান এগিয়ে আসতেই মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান শেলী (পরবর্তীকালে প্রধান বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘তুই আমার পঙ্খীরাজটা (সাইকেল) দেখিস, আমি চললাম।’ গলা ফাটিয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান দিতে দিতে তিনি এগিয়ে যান কয়েকজনকে সাথে নিয়ে। ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার প্রথম দলের নেতৃত্ব দিয়ে প্রথম দলের সাথে বেরুলেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান।

১৪৪ ধারা ভাঙ্গার ঘটনা প্রসঙ্গে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান স্মৃতিকথায় বলেছিলেন, তখন বেলা সোয়া একটা। উত্তেজনায় সারা গা থেকে তখন আগুনের ভাপ বের হচ্ছে। প্রথমে পুলিশ আমাদের ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে এবং পরে রাস্তার একধারে ঘেরাও করে রাখে। আমরা এগিয়ে যাওয়ার পর যখন অন্যান্য ছাত্ররা গেট পার হয়ে রাস্তায় নামতে শুরু করলো তখন আমাদের কয়েকজনকে পুলিশ একটা ট্রাকে তুলে নিল। ট্রাকটা যখন তেজগাঁওয়ের দিকে চলতে শুরু করল তখন মনের অবস্থা হাল্কা করার জন্য আমি বললাম, ‘দূরে কোথাও কোন মজা পুকুরে আমাদের চ্যাংদোলা করে ছুঁড়ে ফেলা হবে।’ ট্রাকটা চলার সাথে সাথে ঠাণ্ডা হাওয়ায় মানসিক উত্তেজনা কিছু কমল কিন্তু দুর্ভাবনা বাড়তে থাকলো।’

এরপর দলে দলে মানুষ বের হতে শুরু করে। ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা ও গ্রেফতার বরণের এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়।

গাজীউল হক বলেন, ‘দ্বিতীয় দলের নেতৃত্ব দিয়ে জনাব ইব্রাহীম তাহা ও জনাব আবদুস সামাদ বাইরে বেরুলেন। তৃতীয় দল নিয়ে বেরুলেন আনোয়ারুল হক খান এবং জনাব আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। তিনটি সত্যাগ্রহী দলকেই পুলিশ গ্রেফতার করে এবং ট্রাকে তুলে নেয়। এসময় পুলিশের তরফ থেকে গেটে একটি হামলা ও লাঠিচার্জ হয়। এরফলে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম চতুর্থ দলটি যাবে সাফিয়ার নেতৃত্বে। এই দলে বেশ কয়েকজন ছাত্রী ছিলেন। রওশন আরা বাচ্চু, ডা. সাফিয়া, সুফিয়া ইব্রাহিম, শামসুন নাহার প্রমুখ।

পুলিশের লাঠিচার্জের ফলে ছাত্ররা উত্তেজিত হয়ে পুলিশের ওপর ইট পাটকেল ছুঁড়তে থাকে। পুলিশ তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কাঁদানে গ্যাস ছাড়ে। ছাত্রদের রক্তে তখন বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে।

মোহাম্মদ সুলতান বলেন, ‘সত্যাগ্রহীদের নাম লেখার সময় পাওয়া যাচ্ছিল না। এসময় কাঁদুনে গ্যাসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ অন্ধকার হয়ে পড়ে। কাঁদুনে গ্যাসের একটি শেল এসে সরাসরি আমার বুকে লাগে এবং আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি।’

আরও পড়ুন: আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে ট্রাম্প

পুলিশ এরপর কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়-চত্বরে প্রবেশ করে। এসময় কিছুক্ষণের জন্য ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজের মাঝখানের প্রাচীর টপকে মেডিক্যাল হোস্টেলের প্রধান ফটকের কাছে আবার জমায়েত হয়। গ্রেফতারবরণ চলতে থাকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত।

ইত্তেফাক/আরকেজি

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৫ মার্চ, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন