রাজনীতি | The Daily Ittefaq

আগামীতেও বর্তমান ধাঁচের বিরোধী দল থাকার ফর্মুলা দিলেন এরশাদ

আগামীতেও বর্তমান ধাঁচের বিরোধী দল থাকার ফর্মুলা দিলেন এরশাদ
প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৭০ আসন আর ১২ মন্ত্রী চাওয়ার কথা জানানোর পরদিন এরশাদ বললেন, ‘সুষ্ঠু ভোট হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারবে না’
ইত্তেফাক রিপোর্ট১৬ এপ্রিল, ২০১৮ ইং ০০:২৫ মিঃ
আগামীতেও বর্তমান ধাঁচের বিরোধী দল থাকার ফর্মুলা দিলেন এরশাদ

আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে অংশীদার হওয়ার আগ্রহের কথা জানালেন জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। এই আগ্রহের কথা জানিয়ে নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের কাছে ৭০টি আসন এবং মন্ত্রিসভায় নিজ দলের অন্তত ১২ জন সদস্য রাখার আবদারও করেছেন। তিনি এই আবদারটি করেছেন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে।

এরশাদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গত ৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে তিনি আওয়ামী লীগ জোটের সঙ্গে অংশীদার থাকার পাশাপাশি উল্লেখিত সংখ্যক আসন ও মন্ত্রিত্ব চেয়েছেন। গত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে মাঝে-মধ্যেই মন্ত্রিসভা থেকে বের হয়ে প্রকৃত বিরোধী দল হওয়ার কথা বলে আসা এরশাদ এখনকার এই বক্তব্যের মাধ্যমে কার্যত আগামীতেও বর্তমান ধাঁচের বিরোধী দল থাকার ফর্মুলা বাতলে দিলেন। তবে দেশের ভেতরের ও বাইরের সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানান দিচ্ছে, কোনো কারণে যদি বিএনপি একাদশ নির্বাচনে না-ও আসে তাহলেও জাপাকে প্রধান বিরোধী দল বানানোর ছক ইতোমধ্যে ভেস্তে গেছে।

উল্লেখ্য, সদ্য শেষ হওয়া সংসদের ২০তম অধিবেশনের প্রথম দিনে (৮ এপ্রিল) মাগরিবের নামাজের বিরতির সময় এরশাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সংসদ ভবনের কার্যালয়ে সাক্ষাত্ করেন। এই সাক্ষাত্ নিয়ে এতদিন এরশাদ যেমন কিছু জানাননি, তেমনি আওয়ামী লীগেরও কেউ কিছু বলেননি। তবে শনিবার রংপুরে গিয়ে সেখানে সার্কিট হাউজে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে এরশাদ বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বলেছি- আমরা দূরে থাকতে চাই না, আমাদেরকে আপনি অংশীদার করে নিন, নির্বাচনে আমাদেরকে ৭০টি আসন দিন আর ১০ থেকে ১২টি মন্ত্রণালয় দিন।’ একথা জানানোর পর জাপা চেয়ারম্যান বলেন, বৃহত্তর রংপুরের ২২টি আসনও জাপাকে দিতে হবে। আওয়ামী লীগ আমাদের দাবি পূরণ না করলে জাপা ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় যাবে। এর পরপরই তিনি আবার বললেন, ‘আগামী সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিক বা না নিক, জাপা এককভাবেই অংশ নেবে। বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে, তবে ৩০০ সংসদীয় আসনে জাপা প্রার্থী দেবে।’

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এসব দাবি জানানোর কথা বলার পরদিনই, অর্থাত্ গতকাল রবিবার রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে জেলা জাপার সম্মেলনে এরশাদ সরকার ও আওয়ামী লীগের কড়া সমালোচনা করেন। সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন একদলীয় শাসন চলছে। নির্বাহী বিভাগ কারও কথা শোনে না। হাসিনার কথা ছাড়া কেউ কাজ করে না, ফাইল নড়ে না, কিছুই নড়ে না। আমরা একদলীয় শাসন চাই না, জনগণের শাসন চাই। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারবে না। সুষ্ঠু ভোট হলে আওয়ামী লীগকে হটিয়ে জাপাই ক্ষমতায় যাবে।’

রংপুরে এই সম্মেলনে জাপা চেয়ারম্যান আরও বলেন, ব্যাংকে কোনো টাকা নেই। ব্যাংকের টাকা লুট হয়ে গেছে। শেয়ারবাজার ধ্বংস হয়ে গেছে। উন্নয়নের নামে চলছে লুটপাট। আমার শাসনামলে মানুষ নিরাপদে ছিল। খুন হতো না। আর এখন খুনের মহোত্সব চলছে। নারী ও শিশু ধর্ষণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, আমরা সবাই ধর্ষিত হচ্ছি। আমার সময়ে ইয়াবা ছিল না, মাদক ছিল না, উন্নয়ন ছিল। এখন চায়ের দোকানেও ইয়াবা পাওয়া যায়। দেশের মানুষ অশান্তিতে আছে, মানুষের শ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষ মুক্তি চায়। বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তা এখন শূন্য।

প্রসঙ্গত, গত ৭ এপ্রিলও চট্টগ্রামে লালদীঘি ময়দানে জাপার নেতৃত্বাধীন জোট ইউএনএ’র সমাবেশে সরকারের কড়া সমালোচনা করেন এরশাদ। পরদিনই সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করে কথা বলেন তার এই বিশেষ দূত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজনীতির গতিপ্রবাহের দিকে নজর রাখেন এমন অভিজ্ঞজনেরা বলছেন, যেভাবেই হোক যিনি টানা নয় বছর দেশ শাসন করেছেন তার কথাবার্তাকে গুরুত্বহীন ভেবে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির অন্দর মহলে নানা খেলাধুলার যে আভাস মিলছে, এরশাদের বহুমুখী বক্তব্যের সঙ্গে এর সমীকরণ মেলালে যেই বার্তাটি বেরিয়ে আসে তা হচ্ছে- কোথাও কিছু একটা ঘটছে বা ঘটানোর কাজ চলছে। যেটির আঁচ করতে পেরে পহেলা বৈশাখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন- ষড়যন্ত্র চলছে, সবাইকে চোখ-কান খোলা রেখে সতর্ক থাকতে হবে।

গত দুইদিন রংপুরে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যে এরশাদ যে শুধু আওয়ামী লীগ কিংবা সরকারকে এক হাত নিয়েছেন তা নয়, বিএনপি ও খালেদা জিয়ার দিকেও তিনি সমানতালে ঢিল ছুঁড়েছেন। শনিবার এরশাদ বলেছেন, ‘যদিও আমি নির্দোষ ছিলাম, খালেদা জিয়ার সরকার আমাকে পাঁচ বছর জামিন না দিয়ে কারাগারে রেখেছিল। আমাকে ইফতার পর্যন্ত খেতে দেয়নি। এখন তিনি (খালেদা) জেলখানায়।’ আর গতকাল বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ আমার দল ভেঙেছিল। আর বিএনপি আমাকে কারাগারে নিয়েছিল। আল্লাহর বিচার, আজ উনি (খালেদা জিয়া) জেলে, আমি বেঁচে আছি এবং ভালো আছি। এই দুটি দলকে জনগণ আর চায় না, তারা এখন তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। আমাদের সমর্থন ছাড়া কেউ ক্ষমতায় যেতে পারেনি। আমরা ফেলনা নই, আমাদেরকে অবহেলা করবেন না। যতই লাফালাফি করেন, আমাদেরকে ছাড়া কেউ ক্ষমতায় যেতে পারবেন না।’

জাপার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘শিগগিরই আমরা মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করবো, আমিও পদত্যাগ করবো, আমার দলের মন্ত্রিরাও পদত্যাগ করবেন’- গত তিন বছর ধরে এরশাদ মাঝে-মধ্যেই এরকম বলে আসলেও জাপা আসলে মন্ত্রিসভা ছাড়ছে না। পদত্যাগ তো করছেই না বরং নির্বাচনকালীন সরকারেও থাকতে চায় জাপা। কৌশলে সেটি খোলামেলাই বলে দিয়েছেন এরশাদ। গত ২৪ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত দলটির সমাবেশে এরশাদের বক্তব্যের মূল বার্তাই ছিল, বর্তমান সংসদে যেসব দল রয়েছে তাদের প্রতিনিধি নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। যার পরিস্কার অর্থ- নির্বাচনকালীন সরকারের সময়েও মন্ত্রিসভায় থাকার প্রবল আগ্রহ এরশাদের। অতীতের ঘটনাপ্রবাহ টেনে জাপার দায়িত্বশীল নেতারা ইত্তেফাককে জানান, ১৯৯৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহের সালতামামি করা হলে দেখা যাবে- এরশাদ ও তার দল কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়ে  থেকেছে। জানা-অজানা কারণে মাঝেমধ্যে ‘বের হয়ে যাব’ বললেও রেকর্ড বলে দিচ্ছে- শেষদিন পর্যন্ত ক্ষমতার সঙ্গেই বসবাস করেন এরশাদ।
ইত্তেফাক/নূহু

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৯ জুলাই, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৫৭
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৫০
এশা৮:১২
সূর্যোদয় - ৫:২২সূর্যাস্ত - ০৬:৪৫