রাজনীতি | The Daily Ittefaq

নৌকা নাকি ধানের শীষ

নৌকা নাকি ধানের শীষ
গাজীপুরে আজ মুখোমুখি আওয়ামী লীগ-বিএনপি
নৌকা নাকি ধানের শীষ
হোক সিটি করপোরেশন নির্বাচন কিন্তু লড়াইটা নৌকা আর ধানের শীষের। তাই গতবারের সিটি নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ এবার কাজে লাগবে না, এবার ভোটের ভিন্ন অংক— এমনটাই বলছেন গাজীপুরের ভোটাররা। গতবার বিএনপি প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নান এক লাখের বেশি ভোটে হারিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খানকে। সেই ভোট ছাপিয়ে আওয়ামী লীগ কি এবার পারবে নির্বাচনে জয় লাভ করতে?
 
আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এবার দলীয় কোন্দল মিটিয়ে সবাই এক ছাতার নিচে থেকে ভোট করছে। সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে গাজীপুরের সিটি নির্বাচনে। অধ্যাপক এম এ মান্নানকে ভোট দিয়ে যে গাজীপুরের মানুষের কোন উপকার হয়নি। এর বিপরীতে জাহাঙ্গীর আলমকে ভোট দিলে নগরবাসীর লাভ। এসব কথাই তারা বলেছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। এসব হিসাব কষে আশায় বুক বেঁধেছে আওয়ামী লীগ।
 
অপরদিকে, বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দুর্নীতি মামলায় বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় ভোটারদের ‘সহানুভূতি’ ভোট পড়বে বিএনপির বাক্সে। তাছাড়া, পুলিশি হয়রানি ও গ্রেফতারের কথা বলে বলে নেতা-কর্মীরা নির্বাচনী প্রচারণায় গতি আনছে। বিএনপি শিবিরের ধারণা, এসব অভিযোগ মানুষের মনে প্রভাব ফেলবে। আর নীরব ভোট পড়বে ধানের শীষের বাক্সে। বিএনপির আশা, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তাদের পক্ষেই যাবে জনরায়।
 
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের জন্য মর্যাদা লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের আজকের নির্বাচন। সিটি করপোরেশন হিসেবে এটি গাজীপুরের দ্বিতীয় নির্বাচন। আজ সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ৪২৫টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল প্রতিটি কেন্দ্রে ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম নিয়ে পৌঁছে গেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। গতকাল বিকাল থেকেই বিজিবি, র‌্যাবসহ আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের বিভিন্ন কেন্দ্র এবং নগরের পথে পথে টহল দিতে দেখা গেছে।
 
নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীরা হচ্ছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত জাহাঙ্গীর আলম, বিএনপি মনোনীত হাসান উদ্দিন সরকার, ইসলামী ঐক্য জোটের ফজলুল রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. নাসির উদ্দিন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের অ্যাড. মো. জালাল উদ্দিন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কাজী মো. রুহুল আমিন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ফরিদ আহমেদ। এছাড়া ৫৭টি ওয়ার্ডে সাধারণ সদস্য পদে ২৫৬ জন এবং সংরক্ষিত ১৯ ওয়ার্ডে ৮৪ জন নারী কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
 
কোন সন্দেহ নেই, নির্বাচনে ৭ জন মেয়র প্রার্থী থাকলেও মূল লড়াই হবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম ও বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের মধ্যে।
 
এবারের নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রচার-প্রচারণা গত ১৮ জুন থেকে শুরু হবার পর থেকেই ব্যাপক মাত্রা পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর পরস্পরের বিরুদ্ধে বাকযুদ্ধের বিষয়টিই ছিল লক্ষ্যণীয়। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগও করেছেন। তাদের এমন বক্তব্যে সাধারণ মানুষ ও কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
 
বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় অভিযোগ করেছেন, ভোটের আগের রাতে ভোট ডাকাতির পরিকল্পনা করছে ক্ষমতাসীন দল। তিনি বলেন, পুলিশের নেতৃত্বে রাতেই ব্যালট পেপারে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরানোর ষড়যন্ত্র চলছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সকল অঞ্চলে ২০ দলীয় জোটের সকল নেতাকর্মী ও সমর্থকের বাসা-বাড়িতে পুলিশ প্রতিদিনই হানা দিচ্ছে। বিশেষ করে ধানের শীষ প্রতীকের নির্বাচন পরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মী-সমর্থকদের তালিকা ধরে টার্গেট গ্রেফতার অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। এতে নেতাকর্মীরা ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
 
আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ভোটে জয়লাভ করলে আধুনিক এবং উন্নত গাজীপুর নগর গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কাজ করবো। সে লক্ষ্যে আবারো নৌকা প্রতীকে গাজীপুরবাসীর ভোট কামনা করেন তিনি। তিরি বলেন, গাজীপুরবাসীর সেবা করতে কর্মচারী হিসেবে কাজ করবো। তিনি আরো বলেন, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করতেই বিএনপি প্রার্থী অমূলক অভিযোগ করছেন। নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর বিএনপির নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে কোন মামলা বা হামলা করা হয়নি। অথচ তিনি মিথ্যা অজুহাত তুলে ভোটারদের বিভ্রান্ত করছেন। এখন পর্যন্ত নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের একটি উদাহরণ বিএনপির প্রার্থী দিতে পারেননি।
 
নির্বাচন প্রসঙ্গে গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, পুলিশ বিএনপির কোন নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করছে না। আমরা নির্বাচনী এলাকায় ভোটের সরঞ্জাম পৌঁছানো আইন-শৃংখলা বাহিনীর ব্যবস্থাপনা ও কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে সার্বক্ষণিক ব্যস্ততার মধ্যে রয়েছি। এসবের বাইরে অন্য কোন দিকে নজর দেওয়ার সময় নেই। এর বিপরীতে বিএনপি যেসব অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে আনছে তা ‘ব্লেম গেম’ ছাড়া আর কিছুই না। শুধু মিডিয়ার সামনে অভিযোগ তুললেই তা সত্যি হয়ে যায় না। ভোট সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে করতে সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন মামলার আসামিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।
 
এদিকে গাজীপুর সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার রকিব উদ্দিন মন্ডল বলেন, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এর আগের অন্য যে কোন সিটি নির্বাচনের তুলনায় গাজীপুরে অধিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কোন ধরনের অনিয়ম করার সুযোগ নেই।
 
মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে জাহাঙ্গীর আলম সকাল ৮টায় নগরীর নিজ এলাকায় নীলের পাড়ার হাইস্কুলে এবং বিএনপির হাসান উদ্দিন সরকার সকাল ৮টায় নিজ বাসভবনে কাছে টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট প্রদান করবেন বলে জানা গেছে।
 
 নির্বাচনে মোট ভোটার ১১ লাখ ৩৭ হাজর ৭৩৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৯৩৫ জন এবং নারী ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮০১ জন। মোট ভোট কেন্দ্র ৪২৫টি। অস্থায়ী ভোট কেন্দ্র ১টি। ভোট কক্ষ ২৭৬১টি। অস্থায়ী ভোট কক্ষ ২৩৫টি। ৮৭০৮ জন ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা রয়েছেন। এর মধ্যে প্রতি কেন্দ্রে একজন করে প্রিজাইডিং অফিসার রয়েছেন।
 
৪২৫টি কেন্দ্রের ৩৩৭ কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ
 
নির্বাচনে ৪২৫টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) কেন্দ্র রয়েছে ৩৩৭টি। আর ৮৮টি সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। প্রতিটি সাধারণ কেন্দ্রে ২২ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ২৪ জন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সশস্ত্র সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি ভোট কেন্দ্রের জন্য থাকবে পুলিশের টহল দল ও সাদা পোশাকের গোয়েন্দারা। সব মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার নিরাপত্তা কর্মী দায়িত্ব পালন করবে। প্রতিটি কেন্দ্রে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। অপরদিকে পুলিশের ১৯টি মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স, প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে মোট ৫৭টি টহল টিম থাকবে র‌্যাবের এবং ২৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন থাকবে।
 
 ৬  কেন্দ্রে ইভিএম ও সিসি ক্যামেরা
 
এবারের নির্বাচনে ভোটার সচেতন এবং শহরভিত্তিক ৬টি কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএমে) ভোট নেওয়া হবে। যান্ত্রিক জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ যাতে বুঝে শুনে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন সে জন্য নগরীর ২টি ওয়ার্ডকে বেছে নেওয়া হয়েছে। আর ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিবেচনায় সিটির ২টি ভোট কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে ভোট গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এসব প্রযুক্তি সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ নিয়োজিত রয়েছেন।
 
ইত্তেফাক/কেআই
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৬
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৩
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬