রাজনীতি | The Daily Ittefaq

আসন বণ্টন নিয়ে কথা নেই ১৪ দলে, শরিকরা সংক্ষুব্ধ

আসন বণ্টন নিয়ে কথা নেই ১৪ দলে, শরিকরা সংক্ষুব্ধ
শামছুদ্দীন আহমেদ২৭ আগষ্ট, ২০১৮ ইং ০৩:৩৯ মিঃ
আসন বণ্টন নিয়ে কথা নেই ১৪ দলে, শরিকরা সংক্ষুব্ধ
অক্টোবরে সিডিউল, ডিসেম্বরে ভোট— এমন পথনকশা ধরে একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বক্তব্য অনুযায়ী আগামী নির্বাচনের এরকম সময়সীমা ধরে সংসদীয় এলাকাভিত্তিক ভোটের প্রাথমিক তোড়জোড়ও শুরু করেছেন দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরা। নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে প্রান্তিক নেতাদের ঢাকায় দাওয়াত করে এনে কথাও বলেছে। 
 
তবে ভোটের চার মাসেরও কম সময় থাকলেও ১৪ দলের আসন বণ্টন নিয়ে নিশ্চুপ জোটের নেতৃত্বকারী আওয়ামী লীগ। আসন ভাগাভাগির বিষয়টি আগে আগে ফয়সালা করার জন্য গত কয়েক মাস ধরে শরিকদের কেউ কেউ তাগাদা দিলেও আওয়ামী লীগ এখনও তা আমলে নেয়নি। এ নিয়ে শরিকরা শুধু অস্বস্তিতেই নয়, সংক্ষুব্ধও। তা ছাড়া শরিকদের কাকে কতটা আসন দেয়া হবে, আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তা শরিকদের অপ্রকাশ্য ক্ষোভে ঘি মেশাচ্ছে।
 
শরিক জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু শনিবার এ নিয়ে ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপে বলেন, আসন বণ্টন নিয়ে ১৪ দলে এখনও আলোচনা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী পর্যায়েও কোনো কথা হয়নি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের কোনো তালিকাও আদান-প্রদান হয়নি। তবে নির্বাচন জোটবব্ধ করবো— এই সিদ্ধান্ত আছে। আমি মনে করি, আসন বণ্টনের বিষয়ে আলোচনা শুরু করা দরকার, এটা দ্রুত নিষ্পত্তি করা উচিত। যতদ্রুত এটা নিষ্পত্তি হবে, দল ও জোটের সবার জন্যই এটা মঙ্গলকর। তাহলে সবার ভোটের প্রস্তুতিটাও ভালো হবে, আগামীতেও ১৪ দলের বিজয় সহজ হবে। আর আসন বণ্টনের বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হলে সেটি একদিকে যেমন ভোটের প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটাবে, তেমনি জোটের বিজয়েও বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে।
 
আগামী সংসদ নির্বাচনের কাঠামো কেমন হয়, বিএনপিসহ সব দলকে নিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে নাকি নতুন ধাঁচের নির্বাচন হতে যাচ্ছে- সেদিকেও দৃষ্টি রাখছে আওয়ামী লীগের জোট মিত্ররা। সবাইকে নিয়ে অবাধ নির্বাচনের আয়োজন হলে এক ধরনের হিসাব কষছেন এই দলগুলোর কেউ কেউ। আবার দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনকারীদের কিছুটা স্পেস দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষমতার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ৫ জানুয়ারির তুলনায় কিছুটা উন্নত সংস্করণে নির্বাচনের পরিকল্পনা থাকলে সেক্ষেত্রে নিজেদের করণীয় নিয়ে নতুন ভাবনাও আছে আওয়ামী লীগের বন্ধু বলয়ের কারো কারো।
 
১৪ দলের শরিক দলগুলোর বেশ ক’জন শীর্ষ নেতার সঙ্গে ইত্তেফাকের পৃথকভাবে কথা হয়েছে। তাদের কথাবার্তা ও আকার-ইঙ্গিতের সারকথা হচ্ছে- সবার অংশগ্রহণে অবাধ নির্বাচন হলে কোনো দল বা কোন জোট কত আসন পাবে, সংসদে কার অবস্থান কী হবে- সেটির নির্ণায়ক হবেন ভোটাররা। তবে ক্ষমতার পালাবদল ঠেকাতে পূর্বঅঙ্কিত ছকে নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নতুন দরকষাকষি হতে পারে। 
 
আসন ভাগাভাগির ফয়সালায় আওয়ামী লীগের একক কর্তৃত্বই শেষ কথা হবে কেন, এমন প্রশ্ন তুলে কেউ কেউ বলেছেন, আওয়ামী লীগ যা দেয় বা যা পাই তা নিয়েই তুষ্ট থাকতে হবে- এবার রাজনীতির সমীকরণটা এমন নয়। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করুক এবং তারা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকুক এতে আপত্তি নেই, তবে আসন ভাগাভাগি ও সরকারেরর অংশীদারত্বের প্রশ্নে নতুন করে দর কষাকষি করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে তাদের ভাষ্য, যেহেতু প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সামলাতে মিত্রদের সহযোগিতা নিতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে, তাহলে সঙ্গীদের হিস্যার বিষয়টিও নতুন করে ভাবতে হবে আওয়ামী লীগকেই।
 
১৪ দলের আরেক অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি সভাপতি ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেননও সাম্প্রতিক সময়ে উপরোক্ত কথাবার্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বলেছিলেন, ‘আসন বণ্টনের বিষয়টি আগেভাগে সুরাহা করা উচিত। ভোট এলে যা দিলেন তাই পেলাম, আর তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকব, এমনটা হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।’ শনিবার ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালেও আগের এই বক্তব্যে এখনও অটুট থাকার কথা জানিয়ে মেনন বললেন, আমরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছি- ভোটের বাকি তো বেশি দিন নেই। আসন বণ্টনের বিষয়টি ফয়সালা হওয়া দরকার। তবে এনিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই। প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে এখন পর্যন্ত কোনো আলোচনাও হয়নি। এমনিতে ১৪ দলের বিভিন্ন সভায় দু’একবার অনানুষ্ঠানিক কথা হয়েছে। আমি এখনো মনে করি, আওয়ামী লীগের উচিত আগেভাগেই বিষয়টি নিষ্পত্তি করা। যা দিলেন খুশি- এরকম মনোভাব থেকে বের হয়ে জোটের ভেতরে আসন নিয়ে আলোচনা হওয়া জরুরি।
 
শুধু আসন ভাগাভাগি নিয়েই নয়, জোটে কিংবা আওয়ামী লীগের কাছ থেকে মর্যাদাপ্রাপ্তি নিয়েও শরিকদের অনেকের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। সরকারে ও জোটবদ্ধভাবে দীর্ঘসময় ধরে একসাথে পথচলার ক্ষেত্রে মর্যাদার দৃশ্যমান ঘাটতি আছে বলে মনে করেন শরিকদের সিংহভাগ নেতা। যার প্রতিফলন ঘটে গতবছরের নভেম্বরে হাসানুল হক ইনুর এক বক্তব্যে। নিজের নির্বাচনী এলাকা কুষ্টিয়ায় এক সমাবেশে আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ করে ইনু তখন বলেছিলেন, ‘আপনারা ৮০ পয়সা থাকতে পারেন। আপনি এক টাকার মালিক না। যতক্ষণ এক টাকা হবেন না ততক্ষণ ক্ষমতা পাবেন না। আপনি ৮০ পয়সা আর এরশাদ, দিলীপ বড়ুয়া, মেনন আর ইনু মিললে তবেই এক টাকা হবে। আমরা যদি না থাকি তাহলে ৮০ পয়সা নিয়ে আপনারা রাস্তায় ফ্যা ফ্যা করে ঘুরবেন। এক হাজার বছরেও ক্ষমতার মুখ দেখবেন না।’ 
 
জাসদ সভাপতির এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পরদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘জাসদ যদি আওয়ামী লীগকে ছাড়া নির্বাচনে যায়, তার ফল কী হবে- তা ইনু নিজেও জানেন। ইনু সাহেব অভিমান, ক্ষোভ থেকে বোমা ফাটিয়েছেন। কেন এ অভিমান? উনি নিজেও জানেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন করলে রেজাল্ট কী হবে? আগে করে তো টেস্ট করেছি।’
 
কুষ্টিয়ায় রাখা ওই বক্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তথ্যমন্ত্রী ইনু শনিবার ইত্তেফাককে বলেন, পরস্পরকে প্রয়োজন আছে বলেই তো জোট। জাসদ একা সাম্প্রদায়িক, রাজাকার, জঙ্গিবাদী ও পাকিস্তানপন্থিদের দমন করতে পারছে না বলেই তো আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছি। জোটের শক্তি নিয়েই আমরা ওই অপশক্তিকে দুর্বল করতে বা পিছু হটাতে পেরেছি। এই বাস্তবতা সবাইকে বুঝতে হবে। তাই ছোটদের আসন বিন্যাসের ক্ষেত্রে যৌক্তিকতার প্রদর্শন দেখাতে হবে বড়দের। বিষয়টি এমন নয় যে, বড়দের ঘাড়ে উঠে আমরা টিকে আছি। কিংবা কেউ আমাদের দয়া করছে- এমন দৃষ্টিভঙ্গি থাকা উচিত নয়। জাসদকে কয়টি আসন দেওয়া হলো, কিংবা জাসদ কতটি আসনে জিততে পারে সেটি বড় কথা নয়; দেশে অন্তত ৩০টি আসন আছে, যেখানে জাসদের সহযোগিতা থাকলে জোটের প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত হয়। সেজন্যই বলছি জাসদের সাংগঠনিক বিস্তৃতি বিবেচনায় নিয়ে আসন বণ্টনের বিষয়টি আওয়ামী লীগকে ভাবতে হবে। 
 
জাসদ সভাপতি ইনু বলেন, পাশাপাশি আমি এটাও বলতে চাই যে- আগামী নির্বাচনেও ১৪ দলীয় জোটের বিজয় মানে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির চূড়ান্ত বিজয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে যে মোড় বদল ঘটেছে, গত ১০ বছরে দেশের যে উন্নয়ন সাধিত হয়েছে- সেটির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে এবং রাজাকার-পাকিস্তান সমর্থিত শক্তি যেন আর কোনদিন ক্ষমতায় ফিরতে না পারে সেটির গ্যারান্টির জন্যই আমরা জোটের প্রয়োজনীয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। যৌক্তিক আসন চাইবো, তবে মাছের বাজারের মতো দর কষাকষি করবো না, হইচই করব না। আসনের জন্য জোটের ভেতরের পরিবেশ দূষণ করব না।
 
আওয়ামী লীগের বন্ধু বলয়ে থাকা শরিফ নুরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাসদের কার্যকরী সভাপতি মইন উদ্দিন খান বাদল সম্প্রতি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় উপস্থিত থাকা ১৪ দল সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিমকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘বিপ্লব করা সহজ, তবে ভোট করা কঠিন। একটু খারাপ ভাষায় বলি-পতিতার এক ভোট, পীর সাহেবেরও এক ভোট। আজ যাকে স্বৈরাচার বলছি, প্রয়োজনে কাল তাকেও কোলে তুলে নিচ্ছি।’
 
ওই আলোচনা সভায় বাদলের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে মোহাম্মদ নাসিম বলেছিলেন, ‘আমরা একা চলতে চাই না। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বলেছেন- আমরা বন্ধুদের নিয়েই চলতে চাই। ১৪ দল ছিল, আছে, থাকবে। আগামীতেও আমরা ১৪ দলকে নিয়েই একত্রে নির্বাচন করবো। খোদা চায় তো, একত্রে সরকারও গঠন করবো।’
 
১৪ দল শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়াও সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমকে একাধিকবার বলেছেন, আগামী নির্বাচনে তার দল আওয়ামী লীগের কাছে ছয়টি আসন চাইবে। অবশ্য ১৪ দলের আরেক অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টি-জেপি’র সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে গত ১৮ আগস্ট জেপি আয়োজিত আলোচনা সভায় বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচন শুধু এমপি-মন্ত্রী হবার নির্বাচন নয়; মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন, উন্নয়নের ধারা বজায় রাখা এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিরাপদ রাখার গণভোট এটা।’ শেখ শহীদ এটাও বলেছেন, জেপি চায় দেশে নির্বাচনী প্রক্রিয়া টিকে থাকুক।
 
আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে আসন বণ্টন ও মর্যাদাপ্রাপ্তি নিয়ে ১৪ দলের ভেতরে ক্ষোভ-অসন্তোষের বিষয়ে গত ১৯ আগস্ট ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আমরা ১৪ দলকে নিয়ে জোটগত নির্বাচন করবো- এখন পর্যন্ত এটাই সিদ্ধান্ত। তবে বিএনপি যদি তাদের জোট নিয়ে ভোটে আসে, সেক্ষেত্রে আমাদের জোট সম্প্রসারিত হতে পারে।
 
ইত্তেফাক/কেআই  
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৩৩
যোহর১১:৫১
আসর৪:১২
মাগরিব৫:৫৫
এশা৭:০৮
সূর্যোদয় - ৫:৪৮সূর্যাস্ত - ০৫:৫০