মুসাফির
সৈয়দ মুজতবা আলী১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
মুসাফির

 

ভোজনাদি সম্বন্ধে আমি আলোচনা আরম্ভ করলেই কোনো কোনো উন্নাসিক পাঠক বিরক্ত হন, আবার কেউ কেউ বলেন, এ-সব কথা তো আগেও যেন শুনেছি বলে মনে হচ্ছে। উত্তরে নিবেদন, সব কথা শোনেননি; আর শুনে থাকলেই বা কী? পুরনো জিনিসের পুনরাবৃত্তি করতে গিয়ে নীটেশ একদা লিখেছেন, ‘এ-কথা আমি পূর্বেই বলেছি, কিন্তু মানুষ শোনা কথাই শুনতে চায়, জানা কথাই বিশ্বাস করে।’ একদম খাঁটি কথা। আমাদের মোহর বীবী, কণিকা ব্যানার্জিকে যখন শুধাই, ‘সেই রেকর্ডে দেওয়া তোমার গান ‘ওগো তুমি পঞ্চদশী’ ফের বেতারে গাইলে কেন? ওটা তো ইচ্ছে করলেই রেকর্ড বাজিয়ে আবার শোনা যায়’, তখন সে বলে, কী করব, সৈয়দদা লোকে যে পুরনো গানই শুনতে চায়?’ বুঝলুম, বাচ্চাদের কাছে নতুন গল্প বলতে চাইলে তারা যে রকম চেঁচিয়ে ওঠে, ‘না, মামা, কালকের সেই বাঘের গল্পটা বলো।’

দ্বিতীয়ত, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার রচনা বাঙলাদেশে অজরামর হয়ে থাকবে না, আমার রসনির্মাণপ্রচেষ্টা বাণী-সরস্বতীর অঙ্গদে কুন্তলে মাল্যরূপে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে না, কিন্তু এ-কথা স্থির-নিশ্চয় জানি, এর বঙ্গসন্তানদের যেদিন কাণ্ডজ্ঞান সম্যক প্রস্ফুরিত হবে, যেদিন তারা ‘ভারতনাট্যম’, ‘পিকাসেসা’, ‘সিংহেন্দ্র মাধ্যম’ কিংবা ‘ভাল্লুকপশ্চমী’র পশ্চাদ্ধাবন কর্ম বর্বরস্য শক্তিক্ষয় বলে সুষ্ঠুরূপে হূদয়ঙ্গম করতে পারবে সেদিন সে উদরমার্গের সন্ধানে নব নব অভিযানের পথে নিষ্ক্রান্ত হবেই হবে। আজ যে রকম ক্বচিং-জাগরিত বিহঙ্গকাকলির ন্যায় কোনো কোনো বিদ্বজ্জন চৈতন্যচরিতামৃতের ভোজনামৃত খাদ্য-নিঘণ্টু অধ্যয়ন করতে করতে বিস্মিতকণ্ঠে প্রশ্ন উত্থাপন করেন ‘কিমাশ্চর্যম! ছানার সন্দেশের উল্লেখ তো কুত্রাপি নেই?’—ঠিক সেইরূপ অস্মদ্দেশে যেদিন রাজবের্ত্ম রাজবর্ত্মে চিত্কার প্রতিধ্বনিত হবে, ‘আমাদের দাবি মানতে হবে! ভোজনা মার্গের-গীতা রচনা করে! ইনকিলাব জিন্দাবাদ! পেট-কিলাব-ঝান্ডা তোল্!’ সেদিন, বলতে লজ্জা করছে, বিনয়ে বাধছে, সেদিন এই অধমের, হ্যাঁ এই অধমের বইয়ের সন্ধানেই বেরোতে হবে বঙ্গের মাক্স্ম্যূলার মমজেনকে। আফগানিস্থানের সর্বাঙ্গসুন্দর ইতিহাস নির্মাণে মল্লিখিত ‘দেশে-বিদেশে’ ব্যবহূত হবে কি না জানি না, কিন্তু এ বিষয়ে সুচ্যগ্রেণ সুতিক্ষ্মেন সন্দেহ নেই যে আজ আমরা যে রকম আমাদের বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস রচনার সময় নিরপেক্ষ পর্যটক পরিদর্শক হিউয়েন সাঙের শরণাপন্ন হব, ঠিক সেই রকম ইংলন্ড-সন্তান যেদিন সভ্য হয়ে তার দেশের ভোজনেতিহাস লিপিবদ্ধ করবে সেদিন তাকে বেরোতে হবে—পুনরায় ব্রীড়িত হচ্ছি—এই আমারই বইয়ের সন্ধানে, রাখাল বাঁড়ুয্যেকে যে রকম মোন্-জো-দড়োর সন্ধানে একদা বেরোতে হয়েছিল; আপনাদের রবিঠাকুরের ‘চাঁদ উঠেছিল গগনে’র সন্ধানে দেশে কেউ আসবে না। রায়গুণাকর অন্নদাশঙ্করের ‘রত্ন ও শ্রীমতী’র জন্য তাঁর প্রকাশক মাত্র ইয়োরোপকে চ্যালেঞ্জ করেছে, আমার প্রকাশক বিশ্বভুবনকে ক্রৌঞ্চমুদ্রা প্রদর্শন করবে, কাজী সায়েবের ভাষায় (আল্লা তাঁর বিমারি বরবাদ করে জিন্দেগি দরাজ করুন!) ত্রিভুবনেশ্বরের সিংহাসন নিয়ে আকর্ষণ বিপ্রকর্ষণ আরম্ভ করবে।      (অংশ)

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:২৮
যোহর১১:৫৫
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০৮
এশা৭:২১
সূর্যোদয় - ৫:৪৪সূর্যাস্ত - ০৬:০৩
পড়ুন