একজন অনন্য আলমগীর
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ ইং
একজন অনন্য আলমগীর
সহকর্মী অনেকের কাছেই ভালোলাগার অভিনয় শিল্পীদের মধ্যে আলমগীরের নামটাই আগে উচ্চারিত হয়। তাদের কাছে আলমগীর মানেই অভিনয়ে ভিন্নতা, পর্দায় প্রাণবন্ত উপস্থিতি। শুধু সহকর্মীই নয়, কোটি কোটি ভক্তদের মাঝেও যেন এই একই ভাবাবেগ তৈরি করে। আর এমনটি আলমগীর পেরেছেন শুধুই তার নিজস্ব অভিনয় সত্তা দিয়ে। পরপর আটবারের বেশি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী এই কিংবদন্তি নায়ককে নিয়ে লিখেছেন সাবিহা সুলতানা জেমি

 

‘আলমগীর আমার সন্তানতুল্য। আমার ছোট ভাইয়েরই মতো সে। আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ। আমার পরিবারের একজন সদস্যই মনে করেছি তাকে সবসময়। যে কারণে তার ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তার সাথে আমার খুব চমত্কার একটি সম্পর্ক ছিল। বলা যায় পারিবারিক একটি সম্পর্ক। আলমগীর কুমকুম পরিচালিত ‘জন্মভূমি’ ছবিতে তার সাথে প্রথম একই ছবিতে আমার কাজ করা। আমি শুরু থেকেই চেয়েছি সে অনেক ভালো করুক। তাই তারই অজান্তে তার মঙ্গল কামনার্থে আমি চেষ্টা করেছি সে যেন একটি ভালো অবস্থানে যেতে পারে, তা করে যেতে। তার অভিনয় সত্তা দিয়ে ঠিকই সে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছে। পেয়েছে বেশ কয়েকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। আমার সন্তানতুল্য আলমগীরের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।’ চিত্রনায়ক আলমগীরকে নিয়ে কথাগুলো টানা বলে গেলেন দেশীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়ক রাজ রাজ্জাক। রাজ্জাক আরো বলেন, ‘এখনো আমাদের মাঝে পারিবারিক সেই বন্ধনটি অটুট আছে। পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমাদের দেখা-সাক্ষাত্ হয়। তখন আনন্দ-আড্ডায় মেতে উঠি আমরা।’ চিত্রনায়িকা ও সাবেক সাংসদ কবরী আলমগীর সম্পর্কে তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ‘দেশীয় চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটে রাজ্জাক-কবরী জুটির জনপ্রিয়তাকে এখনো কোনো জুটি অতিক্রম করতে পারেনি। যে সময়টাতে আমার সাথে নায়ক রাজ রাজ্জাকের জুটি গড়ে উঠে সেই সময়টাতে বেশ কয়েকটি ছবিতে আমি আলমগীরের সাথে অভিনয় করি। কিন্তু সে সময়টাতে অবশ্য শাবানার সাথে তার জুটি গড়ে উঠে।’ কবরী হাসতে হাসতে বলেন, ‘শাবানা-আলমগীর জুটি গড়ে উঠলেও সেই জুটির জনপ্রিয়তা রাজ্জাক-কবরী জুটির জনপ্রিয়তাকে অতিক্রম করতে পারেনি। আলমগীর যে সময়টাতে চলচ্চিত্রে এসেছেন সে সময়টাতে তিনি খান আতাউর রহমান কিংবা তার মতো আরো অনেক গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতার সাথে কাজ করার সুযোগ পাননি। তারপরও আমি এবং আলমগীর ‘লাভ ইন সিমলা’, ‘গুন্ডা’, ‘মমতা’সহ যে কটি ছবিতে অভিনয় করেছি তা বেশ দর্শকনন্দিত হয়েছে। খুব কম ছবিতে অভিনয় করলেও তার সাথে পরবর্তীতে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে। পারিবারিকভাবে আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে বেশ ভালো একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। আলমগীর এমন একজন মানুষ যার সাথে যেকোনো বিষয় নিয়ে অন্তরঙ্গভাবেই আলোচনা করা যায়। একজন মানুষকে ভালো মানুষ বলা সত্যিই অনেক কঠিন, কিন্তু আলমগীর একজন মানুষ হিসেবে যেমন অসাধারণ ঠিক তেমনি আমার খুব ভালো একজন বন্ধুও বটে। আলমগীরের মাঝে সবসময় নায়কোচিত বিষয় কাজ করে। যেমন তার বাচনভঙ্গি, পোশাক-আশাক এবং সর্বোপরি তার উচ্চতা, যা সত্যিই আমাকে খুব আকৃষ্ট করে এবং আমি মনে করি এই প্রজন্মের নতুন নায়কদের তাকে অনুসরণ করা উচিত।’ নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ভীষণ মুডি একজন নায়ক আলমগীর। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিল্পীদের এমন মুডই থাকা উচিত। যেখানে যে মুডে থাকা প্রয়োজন আলমগীরের ক্ষেত্রে ঠিক তাই হয়। তবে একজন ভালো মনের মানুষ তিনি। তার ভেতরটা যে একবার বুঝতে পারবেন সেই কেবল জানবেন তিনি কেমন।’ দেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে  রহমান-শবনম, রাজ্জাক-কবরী, আলমগীর-ববিতা, জাফর ইকবাল-ববিতা, সালমান-শাবনূর জুটির কথা এই দেশের সিনেমাপ্রেমী দর্শক যুগ যুগ মনে রাখবে। তবে একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে দেশীয় চলচ্চিত্রের জুটি প্রথার ইতিহাসে ‘আলমগীর-শাবানা’ জুটি হয়ে সর্বাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। এই জুটির ছবির সংখ্যা ১২৬টি এবং প্রায় সবগুলো ছবিই হিট-সুপারহিট ব্যবসা করেছে যা অন্যান্য জুটির ক্ষেত্রে ঘটেনি। এখনো টিলিভিশন পর্দায় দর্শক যখন আলমগীর-শাবানা জুটির ছবি দেখেন তখন সাধারণত দর্শক অন্য কোনো চ্যানেলের মুখাপেক্ষী হন না। দর্শক তখন এই দুই কিংবদন্তি শিল্পীর অভিনয় প্রাণভরে উপভোগ করেন। এখনো দর্শকের মাঝে এই আগ্রহ নিয়ে আলমগীর বলেন, ‘আসলে টিভি দর্শকের রেসপন্সটা তো সত্যিকার অর্থে খুব কম পাই। তবে আমাদের জুটির ছবি যখন হলে হলে মুক্তি পেত তখন যে পজিটিভ রেসপন্সটা আসত তা সত্যিই খুব ভালো লাগত। ’ একেবারেই স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলীর কারণেই আলমগীর চলচ্চিত্রে নিজস্ব একটি আলাদা অবস্থান তৈরি করতে পেরেছিলেন যা আজও অটুটু রয়েছে। গুণী এই চলচ্চিত্রাভিনেতা আগের মতো চলচ্চিত্রে নিয়মিত না হলেও গল্প এবং চরিত্র পছন্দ হলে তিনি অভিনয় করেন। শেষ পর্যায়ে আছে তার অভিনীত এফ আই মানিক পরিচালিত ‘দুই পৃথিবী’ ছবিটি। চলচ্চিত্রে অভিনয় প্রসঙ্গে আলমগীর বলেন, ‘স্ক্রিপ্টবিহীন কোনো ছবিতে আমি কাজ করি না। আমার কাছে বাধাই করা স্কিপ্ট নিয়ে এলে তা পড়ে যদি আমার ভালো লাগে তবেই সেই ছবিতে আমার জন্য নির্ধারিত চরিত্রটিতে আমি অভিনয় করি।’ কিংবদন্তি নায়ক আলমগীরের জন্ম ১৯৫০ সালের ৩ এপ্রিল। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আলহাজ্ব কলিম উদ্দিন আহমেদ (দুদু মিয়া) ছিলেন ‘মুখ ও মুখোশ’ ছবির অন্যতম একজন প্রযোজক। আলমগীর অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আমার জন্মভূমি’। তার অভিনীত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ছিল ‘দস্যুরানি’। এরপর তিনি অনেক ছবিতে কাজ করেন। যারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘চাষীর মেয়ে’, ‘জয় পরাজয়’, ‘লাভ ইন সিমলা’, ‘হাসি কান্না’, ‘জাল থেকে জ্বালা’, ‘জয় পরাজয়’, ‘শাপমুক্তি’, ‘গুন্ডা’, ‘মাটির মায়া’, ‘মনিহার’, ‘লুকোচুরি’, ‘হীরা’, ‘মমতা’, ‘মনের মানুষ’, ‘রাতের কলি’, ‘মধুমিতা’, ‘হারানো মানিক’, ‘মেহেরবানু’, ‘কন্যাবদল’, ‘কাপুরুষ’, ‘শ্রীমতি ৪২০’, ‘জিঞ্জির’, ‘বদলা’, ‘সাম্পানওয়ালা’, ‘কসাই’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘লুটেরা’, ‘চম্পাচামেলী’, ‘গাঁয়ের ছেলে’, ‘ওস্তাদ সাগরেদ’, ‘দেনা পাওনা’, ‘মধুমালতী’, ‘আশার আলো’, ‘বড় বাড়ীর মেয়ে’, ‘আল হেলাল’, ‘সবুজ সাথী’, ‘রজনীগন্ধ্যা’, ‘ভালোবাসা’, ‘লাইলী মজনু’, ‘বাসরঘর’, ‘মান সম্মান’, ‘ধনদৌলত’, ‘নতুন পৃথিবী’, ‘হাসান তারেক’, ‘সালতানাত্’, ‘দ্বীপকন্যা’, ‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘মহল’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘সখিনার যুদ্ধ’, ‘ভাত দে’, ‘হিসাব নিকাশ’, ‘দুই নয়ন’, ‘অন্যায়, ‘গীত’ ‘ঘরের লক্ষ্মী’ ইত্যাদি। ১৯৮৫ সালে তিনি ‘মা ও ছেলে’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এরপর তিনি আরও সাতবারেরও বেশি একই সম্মাননা অর্জন করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি প্রথম ‘নিষ্পাপ’ ছবি নির্মাণের মধ্যদিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার নির্দেশনায় নির্মিত সর্বশেষ ছবি হচ্ছে ‘নির্মম’। তার দীর্ঘদিনের চলচ্চিত্রের ক্যারিয়ারে একজন সংগীত শিল্পী হিসেবেও তিনি চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন। ‘আগুনের আলো’ ছবিতে তিনি প্রথম প্লে-ব্যাক করেন। এরপর তিনি ‘কার পাপে’, ‘ঝুমকা’ ও ‘নির্দোষ’ ছবিতেও প্লে-ব্যাক করেন।

 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৪:২৪
যোহর১১:৫৮
আসর৪:২৭
মাগরিব৬:১৭
এশা৭:৩১
সূর্যোদয় - ৫:৪১সূর্যাস্ত - ০৬:১২
পড়ুন