ঢাকা বুধবার, ২০ মার্চ ২০১৯, ৬ চৈত্র ১৪২৫
২৩ °সে

ফিরে দেখা

সূর্যসেন

সূর্যসেন

তখন রাত। পুরো এলাকায় কার্ফু ঘোষণা করেছে ইংরেজি সেনাবাহিনী। একদিকে কারফিউ অন্যদিকে অন্ধকার। এই অন্ধকার ভেদ করে সামনে চলা বেশ কষ্টের। এছাড়া পুরো এলাকা গুর্খা সৈন্য বেষ্টিত। হাঁটতে গেলে শুকনো পাতার মচমচ শব্দ হয়। ওরা ঘন অন্ধকারে যখন বুঝতে পারল বিপ্লবীরা পালিয়ে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে এগোচ্ছে, তখন তারা আকাশের দিকে এক ধরনের গুলি ছুড়ে পুরো এলাকাটা আলোয় আলোময় করে তুলল। হাউয়ের মতো আলোয় মাস্টারদা গুর্খা সৈন্যদের চোখের সামনে পড়ে যান। তিনি তখন বেষ্টনী ভেদ করে সামনে এগিয়ে চলছিলেন। কয়েকজন গুর্খা সৈন্য মাস্টারদাকে ধরে নিয়ে খড়ের গাদায় নিয়ে রাখে। যদিও এই সময় তিন দিক থেকে গুলিবর্ষণ করে ইংরেজ সৈন্যদের ব্যতিব্যস্ত রাখা হয়েছিল, কিন্তু তবুও মাস্টারদা ধরা পড়ে গেলেন।

মাস্টারদাকে পেয়ে ইংরেজ সৈন্যরা আনন্দে আত্মহারা। তাঁকে বন্দি করে পায়ে হাঁটিয়ে নিয়ে গেল ওরা মিলিটারি ক্যাম্পের দিকে। মাস্টারদার শরীর দুর্বল, যুদ্ধে দেহ ক্ষত-বিক্ষত। পথ চলতে খুব কষ্ট হয়। তবুও তাঁকে হাঁটতে হলো।

পটিয়া ডাকবাংলোতে মিলিটারি ক্যাম্প করেছিল। সূর্যসেনকে এই অবস্থায় নিয়ে আসা হলো এই মিলিটারি ক্যাম্পে। এখানেই হাতকড়া পরিয়ে রাখা হলো তাঁকে।

সূর্যসেন স্বাধীনতা আন্দোলনের মহান সৈনিক। তাঁরই নেতৃত্বে ও সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনায় ইংরেজ সৈন্যরা হার মেনেছিল। অল্প সময়ের জন্য হলেও চট্টগ্রাম হয়েছিল স্বাধীন। চট্টগ্রাম ও সারা ভারতবর্ষের আপামর জনসাধারণের তিনি ছিলেন চোখের মণি। তিনি সাহসী এক নতুন পথ দেখালেন স্বাধীনতা সংগ্রামের।

মাস্টারদাকে শ্রদ্ধা জানাবার জন্য হাজার হাজার লোক জমায়েত হলো। এক নজর দেখল তাঁদের প্রিয় নেতাকে। দূর থেকে সালাম জানিয়ে চলে গেল। কেউ কথা বলেনি। মানুষের হূদয়-মন আপ্লুত। জনসমুদ্র দেখে মাস্টারদা সূর্যসেনও অভিভূত।

ইংরেজদের কারাগারে তাঁকে আটক করে রাখা হয়। বিচার চলে।

১৯৩৩ সালের ১৪ই আগস্ট বিচারের রায় বের হলো। রায়ে সূর্যসেনকে ফাঁসির হুকুম দিলেন বিচারক।

সারা দেশ জুড়ে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের ঢেউ উঠল। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদের কণ্ঠ দিনে দিনে সোচ্চার হলো।

কিন্তু আমাদের স্বাধীনতাকে যারা ছিনিয়ে নিয়েছিল, তাদের কানে এ প্রতিবাদ পৌঁছল না। ১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারি এই রায় কার্যকর করা হলো। ফাঁসির মঞ্চেও তিনি দেশের স্বাধীনতার গান গেয়ে গেলেন।

ফাঁসির মঞ্চে তিনি বললেন, হে আমার সাথিরা, তোমরা এগিয়ে চলো। এগিয়ে চলো। কখনো পিছে ফিরো না।

সূর্যসেনের আত্মত্যাগ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে এভাবেই নতুন পথ নির্মাণ করেছে। আমরা বাঙালিরা দেশের এই বীর সন্তানকে কোনোদিন ভুলব না। (শেষাংশ)

লেখকের ‘সূর্যসেন’ (শিশু একাডেমী, ১৯৯০) বই থেকে

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২০ মার্চ, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন