জয়ের মুকুট বুয়েটের
নাদিম মজিদ২৩ মার্চ, ২০১৬ ইং
জয়ের মুকুট বুয়েটের
গত ১২-১৩ মার্চ ভারতের মুম্বাইয়ে আইআইটি মুম্বাই আয়োজন করে বার্ষিক সিম্পোজিয়াম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে জিতে নেন চারটি সম্মানজনক পুরস্কার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়া হয় সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরস্কার। তাদের অর্জন নিয়ে লিখেছেন নাদিম মজিদ

 

সৈ য়দ তারিক-উল ইসলাম রিফাত বুয়েটে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন তিন বছর আগে। ভর্তির পর থেকে দেখছেন, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ট্রিপল-ই) এবং কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগ বাইরের দেশে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার নিয়ে আসছে। তাদের পুরস্কার পাওয়া দেখে মনে হতো, ইস আমাদের যদি এ ধরনের সুযোগ থাকত! আমরা যদি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে পুরস্কার নিয়ে আসতে পারতাম। দেখতে দেখতে তিন বছর কেটে গেল। ওয়েবসাইট আর বিভিন্ন মাধ্যম ঘেঁটে গত আগস্টে খোঁজ পান আইআইটি মুম্বাইয়ের অ্যাজিওট্রফি প্রতিযোগিতার। মুম্বাইয়ের স্থানীয় নাম বোম্বে। প্রতিবছর আইআইটি বোম্বের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়রিং অ্যাসোসিয়েশন আয়োজন করে বার্ষিক সিম্পোজিয়াম। সে প্রতিযোগিতায় বিদেশিরাও অংশ নিয়ে থাকে। সে থেকে রিফাত স্বপ্ন দেখা শুরু করে। এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সফলতা নিয়ে আসবে। ক্লাসের বন্ধুদের বললে তারাও আগ্রহ দেখায়। গত জানুয়ারি মাসে তারা ৯ সহপাঠী প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন করে।  

মূল প্রতিযোগিতা হয় ১২-১৩ মার্চ। এ বছর ভারত এবং ভারতের বাইরে তিন শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ১০টি কর্পোরেট হাউজ এবং ৫০টিরও বেশি ইন্ডাস্ট্রি এ প্রাগ্রামে অংশগ্রহণ করে। এটি ছিল বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের দেশের বাইরে অংশ নেয়া প্রথম প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতা কেমন হয়, তা জানা ছিল না। কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও সে প্রতিযোগিতায় জিতে নেয় তারা চারটি পুরস্কার। চারটি প্রতিযোগিতা হল কেম-ই-টাইমার, কেম-ই-কার, ল্যামিনিয়ার এবং অনলাইন কুইজ। কেম-ই-টাইমার প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান, কেম-ই-কার এবং ল্যামিনিয়ার প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান এবং অনলাইন কুইজে ৪র্থ ও ৫ম স্থান অর্জন করে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা।

কেম-ই-টাইমার প্রতিযোগিতা সম্পর্কে দলের সদস্য তাসনিম আহমাদুল্লাহ জানান, ‘এই  প্রতিযোগিতার মূল চ্যালেঞ্জ ছিল রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানিকে নির্দিষ্ট সময় ধরে উত্তপ্ত করা। রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটনের জন্য যে দুইটি পদার্থ মিশিয়ে তাদেরকে আলাদা পাত্রে রাখা হবে। এমনভাবে মেশাতে হবে যেন ঠিক ১ মিনিট পর একটি দরজা খুলে রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু করে; কিন্তু এখানে একবার শুরু করার পর হাত দিয়ে কোনো স্পর্শ করা যাবে না। রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমেই পাত্রের দরজা খুলতে হবে। যে দল ঠিক সময়ে দরজা খুলতে পারবে এবং পানির তাপমাত্রা সবচেয়ে বৃদ্ধি পাবে তারাই হবে জয়ী। এ প্রতিযোগিতার প্রথম পর্বে ৭০টি দল অংশ নেয়। চূড়ান্ত পর্বে উঠে ১৮টি দল। আমাদের দলটি চূড়ান্ত পর্বে উঠে। এবং প্রতিযোগিতায় ২য় স্থান অর্জন করে। দলের বাকি সদস্যরা হলো- সৈয়দ তারিক-উল ইসলাম রিফাত, আতিকুর রহমান এবং তাসনিম তাবাসসুম অনু।’

কেম-ই-কার প্রতিযোগিতা সম্পর্কে দলের সদস্য নাফিসা তাসনিম জানান, ‘কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য একমাত্র আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত  প্রতিযোগিতা হলো কেম-ই-কার। এই প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ ছিল পরিবেশবান্ধব একটি ব্যাটারি চালিত গাড়ি বানানো। একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে গাড়িটি যেন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করে থেমে যাবে। গাড়িটি চলার পথে স্পিড ব্রেকার এবং অমসৃণ তল অতিক্রম করতে পারবে।  ব্যাটারিটি অবশ্যই একটি রাসায়নিক কোষ হবে এবং বাজারে পাওয়া কোনো ব্যাটারি ব্যবহার করা যাবে না। এক্ষেত্রে গাড়ি চলাচল শুরু হওয়ার পর থেকে কোনো প্রকার স্পর্শ অথবা ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করলে  প্রতিযোগিতায় অযোগ্য করা হবে। এখানে প্রথম পর্বে ৮০টি দল অংশগ্রহণ করে। চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেয়ার সুযোগ পায় ৩০টি দল। আমাদের দলটি ৩য় স্থান অর্জন করে। দলের বাকি সদস্যরা হলো- কাজী জিহান হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মাসুদ এবং মাজেদ আলম আবির।’

ল্যামিনিয়ার প্রতিযোগিতা সম্পর্কে দলের সদস্য প্রমা প্রদীপ্তি জানান, ‘বিভিন্ন রাস্তার এবং স্থাপনার সামনে যেই সুন্দর ফোয়ারা দেখা যায় তারই একটি ছোট প্রোটোটাইপ বানানোই ছিল এই প্রতিযোগিতার মূল কাজ। সাধারণ পাম্প থেকে জোরে বিক্ষিপ্ত ভাবে বয়ে আসা পানিকে কিভাবে একটি যন্ত্রের মধ্যে দিয়ে পাঠিয়ে সুন্দর একটি চিকন দৃষ্টিনন্দন প্রবাহে পরিণত করা যায়। এতে ৪৫টি দল অংশ নেয়। তাদের সবাইকে টেক্কা দিয়ে আমাদের দল ৩য় স্থান অর্জন করে। দলের বাকি সদস্যরা হলো- কাজী জিহান হোসেন, সৈয়দ তারিক-উল ইসলাম রিফাত এবং আব্দুল্লাহ আল মাসুদ।’

আরেকটি প্রতিযোগিতা ছিল অনলাইন কুইজ। পুরো কেমিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সিলেবাসের উপর ভিত্তি করে বিশেষভাবে সাজানো ছিল এই অনলাইন কুইজ। প্রতিযোগিতায় একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৩০টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল। এই প্রতিযোগিতায় প্রথম ৪০ জনকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রাসায়নিক দ্রব্যাদি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিএএসএফের ভারত শাখার প্ল্যান্ট  ভিজিট করার সুযোগ দেয়া হয়। কুইজে সর্বোচ্চ নাম্বার পাওয়া ৫ জনকে পুরস্কার দেয়া হয়। বুয়েট থেকে কাজী জিহান হোসেন ৪র্থ স্থান, সৈয়দ তারিক-উল ইসলাম রিফাত ৫ম স্থান অর্জন করে। এছাড়াও আতিকুর রহমান প্ল্যান্ট ভিজিটের সুযোগ অর্জন করে। অ্যাজিওট্রফি প্রতিযোগিতায় এ প্রথম বাংলাদেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। প্রথমবার অংশ নিয়ে সবেচেয়ে বেশি পুরস্কার পাওয়ায় আয়োজক কর্তৃপক্ষ অভিভূত হয়।

বুয়েটের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি পুরস্কার পাওয়ায় বুয়েটকে সেরা ইউনিভার্সিটি অ্যাওয়ার্ড ‘অ্যাজিওট্রফি ২০১৬’-এ ভূষিত করা হয়। প্রথমবার অংশ নিয়ে দারুণ সাফল্য পাওয়া প্রসঙ্গে কাজী জিহান হোসেন জানান, ‘আমাদের চেষ্টা ছিল দেশকে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব করার। আমরা প্রতিনিধিত্ব করে চারটি পুরস্কার জিতেছি। বিশেষ করে বুয়েটকে সেরা ইউনিভার্সিটি করতে পারায় আমরা গর্বিত। আমাদের দলকে সার্বিক সহায়তা দেয়ার জন্য কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং             বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. এম এ এ শওকত চৌধুরী, প্রফেসর ড. সৈয়দা রাজিয়া সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহিদুস সামাদ খান, সহযোগী অধ্যাপক ড. শোয়েব অমিও আহমেদ এবং প্রভাষক নাজিবুল ইসলাম স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞ।’

দলের চার সদস্য সৈয়দ তারিক-উল ইসলাম রিফাত, সৈয়দ জিহান হোসেন, আতিকুর রহমান এবং আবদুল্লাহ আল মাসুদ আগামী মাসে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন। তারা ৮-৯ এপ্রিল মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মালয়েশিয়ার কেমি-ই-কার প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৩ মার্চ, ২০১৭ ইং
ফজর৪:৪৪
যোহর১২:০৬
আসর৪:২৯
মাগরিব৬:১৪
এশা৭:২৬
সূর্যোদয় - ৬:০০সূর্যাস্ত - ০৬:০৯
পড়ুন