মুক্তি পেল ‘দ্য লাস্ট কিস’
ইত্তেফাক ডেস্ক০৯ মে, ২০১৫ ইং
মুক্তি পেল ‘দ্য লাস্ট কিস’
 (পূর্ব প্রকাশিতের পর)   সুকুমারীর সফল চিত্রায়ণ ও প্রদর্শনের পর প্রতিষ্ঠিত হল ঢাকা ইস্ট বেঙ্গল সিনেমাটোগ্রাফ সোসাইটি। এর উদ্যোগে ঢাকায় নির্মাণ হল ঢাকার প্রথম বাংলা নির্বাক চলচ্চিত্র ‘দ্য লাস্ট কিস’। এই চলচ্চিত্রের বিশেষত্ব হল, এই প্রথম কোন নারী অভিনয় করল ঢাকার সিনেমায়। নায়িকার ভূমিকায় ছিলেন লোলিটা। আসল নাম বুড়ি তাকে বাদামতলী পতিতালয় থেকে আনা হয়েছিল। লাস্ট কিস-এর কাজ শেষ হলে তিনি আবার ফিরে গিয়েছিলেন পুরানো পেশায়। লোলিটা ছাড়া এতে চারুবালা, দেবা বালা ওরফে দেবী ও হরিমতি নামে আরো তিন নারী অভিনয় করেছিলেন। হরিমতি ছিলেন সে আমলে ঢাকার নামকরা বাইজি। হরিমতি এই সিনেমায় নাচ ও গানের বেশ কয়েকটি দৃশ্যে অভিনয় করেন। চারুবালা ও দেব বালাকে সংগ্রহ করা হয়েছিল পুরানো ঢাকার পতিতালয় থেকে।

নায়িকা লোলিটার বিপরীতে নায়ক (যুবক) চরিত্রে অভিনয় করেন খাজা আজমল। নায়কের শৈশব অংশে অভিনয় করেন খাজা নসরুল্লাহ, কৈশোরে কাজি জালালউদ্দিন। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র ডাকাত দলের সর্দারের ভূমিকায় ছিলেন বিশিষ্ট অভিনেতা শৈলেন রায় (টোনা বাবু) এছাড়া ছিলেন খাজা আদেল, খাজা আকমল, সৈয়দ সাহেব এ আলম, ধীরেন মজুমদার, ধীরেন ঘোষ, বেবি টুনটুন ও বেনু ব্যানার্জি। শ্যুটিং শুরু হল ১৯২৯ সালের অক্টোবর। দিলকুশা, মতিঝিল, পরিবাগ, আজিমপুরসহ এর আশপাশের এলাকায় চলত শ্যুটিংয়ের কাজ। ক্যামেরার দায়িত্বে ছিলেন খাজা আজাদ। খাজা আজমল ও খাজা জহির ছিলেন তার সহকারী। সুকুমারীর মত এই ছবিরও পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন অম্বুজ গুপ্ত।

এর কাহিনী সম্পর্কে দুই রকমের বিবরণ পাওয়া যায়। একটাতে বলা হয়, দুই জমিদার পরিবারের বিরোধকে কেন্দ্র করে এই ছবি আবর্তিত। দুই পরিবারের মধ্যে যখন একেবারে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, তখন দুই পরিবারের দুটি বালক বালিকা পরস্পরকে চুম্বন দিয়েছিল, তাই এই ছবির নাম ‘দ্য লাস্ট কিস।’ অন্য যে বিবরণ পাওয়া যায় তাতে বলা হয়, নায়ক (খাজা আজমল) তার স্ত্রীকে (লোলিটা) নিয়ে যাচ্ছিল যাত্রা দেখতে। পথে অন্য এক জমিদারের (খাজা নসরুল্লাহ) ভাড়াটে ডাকাত দল লোলিটাকে অপহরণ করে। নায়ক খাজা আজমল ছুটে গিয়ে তার স্ত্রীকে খাজা নসরুল্লাহর ঘরে দেখতে পায়। নসরুল্লার সঙ্গে শুরু হয় লড়াই। এতে নায়ক-নায়িকা দু’জনেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তবে উভয় বিবরণে শৈশবে নায়ক (আদেল) ও নায়িকাকে (চারুবালা) ডাকাত সর্দার (শৈলেন রায়) অপহরণ করেছিল বলে উল্লেখ আছে।

দ্য লাস্ট কিসের প্রিন্ট ও নেগেটিভ হারিয়ে গেছে। যতদূর জানা যায়, এর একটি মাত্র প্রিন্ট সাহেবে আলম ১৯৩১ সালে কলকাতার অরোরা ফিল্ম কোম্পানির কাছে বিক্রি করেছিলেন উভয় বঙ্গে প্রচারের উদ্দেশ্যে। এই ছবির পর ঢাকা ইস্ট বেঙ্গল সিনেমাটোগ্রাফ সোসাইটির কাজ আর এগোয়নি। কারণ, দেশ ভাগের পর অম্বুজ গুপ্ত চলে গিয়েছিলেন কলকাতায়। বাইজি হরিমতিও তাই। নায়িকা লোলিটা, দেব বালা ও চারুবালা ফিরে গিয়েছিলেন তাদের পুরানো পেশায়। নায়ক ও অন্যতম ক্যামেরাম্যান খাজা আজমল নিহত হন ১৯৭১ সালে।

দ্য লাস্ট কিসের সাব টাইটেল করা হয়েছিল বাংলা, ইংরেজি ও উর্দুতে। বাংলা ও ইংরেজি সাবটাইটেল প্রস্তুত করেন পরিচালক অম্বুজ গুপ্ত নিজেই এবং উর্দু সাবটাইটেল করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দালিব সাদানি। প্রিন্টিং ও প্রসেসিংয়ের কাজ হয়েছিল কলকাতায়। সব মিলিয়ে এই ছবির জন্য খরচ হয়েছিল ১২ হাজার টাকা। বর্তমানে যেটাকে সবাই আজাদ সিনেমা হল বলে জানে আগে সেটার নাম ছিল মুকুল সিনেমা। এখানেই ১৯৩১ সালে মুক্তিপায় ‘দ্য লাস্ট কিস’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার এর শুভসূচনা করেন। ঢাকার বেশ কয়েকটি সিনেমা হলে কয়েক সপ্তাহ ধরে দেখানো হয়েছিল ছবিটি।

অখণ্ড বাংলার চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী সংযোজন জাতীয় কবি  কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯৩১ সালে তিনি চলচ্চিত্রে জড়িত হন কলকাতার বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ম্যাডান থিয়েটারসের সুরভান্ডারি হিসেবে। পরে তিনি চিত্র পরিচালক, সঙ্গীত পরিচালক, সুরকার, গায়ক, গীতিকার, অভিনেতা, কাহিনীকার, সংগঠক হিসেবে অবদান রাখেন। ১৯৩৪ সালে তিনি সত্যেন্দ্রনাথ দে-র সঙ্গে যৌথভাবে ধ্রুব চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৪১ সালে তিনি শেরে বাংলার নামে বি.টি পিকচার্স গঠন করেন। নজরুলের পর আরও কয়েকজন সাহসী মুসলমান ধর্মীয় ও সামাজিক কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি এড়িয়ে চলচ্চিত্রে জড়িত হন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন  আববাসউদ্দীন আহমদ, হিমাদ্রী চৌধুরী (ওবায়েদ-উল হক), কিরণকুমার বা ফতেহ লোহানী, স্বপনকুমার বা কাজী খালেক, উদয়ন চৌধুরী বা ইসমাইল মোহাম্মদ, বনানী চৌধুরী বা বেগম আনোয়ারা,  আবদুল আহাদ, নাজীর আহমদ, ইনাম আহমদ, বেবী ইসলাম, কিউ.এম জামান প্রমুখ। এঁদের মধ্যে হিমাদ্রী চৌধুরী দুঃখে যাদের জীবন গড়া (১৯৪৬) প্রযোজনা ও পরিচালনা করেন। উদয়ন চৌধুরী মানুষের ভগবান (১৯৪৭) চিত্র নির্মাণ করে অভিযুক্ত হন ও জেলে যান। দেশ বিভাগের পর কলকাতার চিত্রকর্মীরা ঢাকায় এসে চলচ্চিত্রের ভিত্তি স্থাপনে সক্রিয় অবদান রাখেন।

১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল  মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এলে বেতার-ব্যক্তিত্ব নাজীর আহমদকে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি কলকাতার কুশলীদের সহায়তায় ইন আওয়ার মিডস্ট নামে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বছর দুয়েকের মধ্যেই চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য শহীদুল আলম,  আব্দুল জববার খান, কাজী নূরুজ্জামান প্রমুখের নেতৃত্বে ইকবাল ফিল্মস এবং ড. আব্দুস সাদেক, দলিল আহমদ (বুলবুল আহমদের পিতা), আজিজুল হক, দুদু মিয়া (আলমগীরের পিতা), কবি  জসীমউদ্দীন, কাজী খালেক, সারওয়ার হোসেন প্রমুখকে নিয়ে গঠিত হয় কো-অপারেটিভ ফিল্ম মেকার্স লিমিটেড।

সরকারি উদ্যোগে জনসংযোগ বিভাগের অধীনে প্রচারচিত্র নির্মাণের জন্য ১৯৫৩ সালে চলচ্চিত্র ইউনিট গঠিত হয়। এ ইউনিট থেকে নাজীর আহমদের পরিচালনায় নির্মিত হয় প্রামাণ্য চিত্র সালামত । ১৯৫৪ সালে ইকবাল ফিল্মসের প্রথম ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’-এর কাজ শুরু হয় আব্দুল জববার খানের পরিচালনায়।

পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সবাক বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য চিত্র মুখ ও মুখোশ মুক্তি পায় ১৯৫৬ সালের ৩রা আগস্ট। এর প্রযোজনায় ছিলেন নূরুজ্জামান, শহীদুল আলম, কলিমউদ্দিন আহমেদ, এম.এ হাসান ও আব্দুল জববার খান। পরিচালকের নিজের লেখা নাটক ‘ডাকাত’ অবলম্বনে এ ছবির কাহিনী তৈরি হয়। তিনি নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন। অন্যান্য পাত্র-পাত্রী ছিলেন ইনাম আহমেদ, পূর্ণিমা সেন, নাজমা (পিয়ারী), জহরত আরা, আলী মনসুর, রফিক, নূরুল আনাম খান, সাইফুদ্দীন, বিলকিস বারী প্রমুখ। কিউ. এম জামান ছবির চিত্রগ্রহণ এবং সমর দাস সংগীত পরিচালনা করেন। ছবির গানে কণ্ঠ দেন  আবদুল আলীম ও মাহবুবা হাসানাত। ছবিটি পরিবেশনা করেন মোশাররফ হোসেন চৌধুরী।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৯ মে, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৫৬
যোহর১১:৫৫
আসর৪:৩৩
মাগরিব৬:৩৪
এশা৭:৫৩
সূর্যোদয় - ৫:১৮সূর্যাস্ত - ০৬:২৯
পড়ুন