কেশবপুর শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে তিন নদীর পলি অপসারণ কাজ শুরু
কেশবপুর শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে তিন নদীর পলি অপসারণ কাজ শুরু
কেশবপুর শহরের ভয়াবহ জলাবদ্ধতা নিরসনে কোটি টাকা ব্যয়ে প্রধান তিন নদীর পলি ভাসমান এস্কাভেটর দিয়ে অপসারণ কাজ শুরু হয়েছে। এতে পানিন্দি ৮০ গ্রামের লাখো মানুষের মাঝে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিত মত্স্য ঘেরের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় বানভাসীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়া ২৪নং পোল্ডারের ১৭টি স্লুইস গেটের দু পাশই পলিতে ভরাট হয়ে গেছে। এলাকাবাসীর দাবি, ঘ্যাংরাইল বেসিং এর আওতাভূক্ত নদীগুলোকে পলির হাত থেকে রক্ষায় অতীতের মতো কাশিমপুরে ক্রসড্যাম বাঁধ নির্মাণসহ নদী রক্ষায় টিআরএম চালু করতে হবে। তা না হলে সরকারের কোটি টাকাই গচ্চা যাওয়ার আশংকা করছেন ভূক্তভোগিরা।

ঝিকরগাছা থেকে বড়েঙ্গা জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত ৪২ কি.মি হরিহর নদী দিয়ে ঝিকরগাছা, যশোর সদর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার বর্ষার অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন হয়। এ নদী পলিতে ভরাট হয়ে মরে গেছে। ফলে ভাটিতে কেশবপুরের অবস্থান হওয়ায় উজানের পানিতে গত দু বছর ধরে প্লাবিত হচ্ছে। অপরদিকে কপোতাক্ষ নদের ত্রিমোহিনী থেকে ৩২ কি.মি বুড়িভদ্রা নদীর উত্পত্তি হয়ে ত্রিমোহিনী, সাতবাড়িয়া, কেশবপুর সদর, মজিদপুর, বিদ্যানন্দকাটি ও মঙ্গলকোট ইউনিয়ন হয়ে ভাটিতে জিরো পয়েন্টে গিয়ে মিশেছে। পলিতে এ নদীও ভরাট হয়ে গেছে। ফলে গত দু বছর ধরে এ নদীর তীরবর্তী ২০/২৫টি গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। পলির হাত থেকে ঘ্যাংরাইল বেসিং এর আওতাভূক্ত শ্রীহরী, হরিহর, আপারভদ্রা ও বুড়িভদ্রা নদীকে পলির হাত থেকে রক্ষায় বিগত সময়ে কেশবপুরের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেকের উদ্যোগে আপারভদ্রা নদীর কাশিমপুরে প্রতিবছর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে সাময়িক ক্রসবাঁধ দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে ওই স্থানে ক্রস বাঁধ দেয়া হতো এবং জুনের শেষের দিকে তা অপসারণ করা হতো। ওই বাঁধ নির্মাণে সরকারের ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা খরচ হলেও উপজেলার নদ-নদীগুলো পলি উঠে ভরাট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতো। এতে এলাকাবাসী সুফলও পেতে শুরু করে এবং এর পাশাপাশি ভরত ভায়না ও বিল খুকশিয়ায় টিআরএম চালু করা হয়। কিন্তু ২০১৪ সালে দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদার নিয়োগ করা হলে শেষ পর্যন্ত তা বাতিল হয়। তবে বিল খুকশিয়ার ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় জনগণ টিআরএম’র বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ফলে ঘ্যাংরাইল বেসিং এর আওতাভূক্ত নদ-নদীগুলো পলিতে ভরাট হতে থাকে। পাশাপাশি ২৪নং পোল্ডারের ১৭টি স­ুইস গেটের দু পাশই পলিতে ভরাট হয়ে পনি নিষ্কাশন পথ বন্ধ হয়ে যায়। যার কারণে গত দু বছর ধরে ভাটি অঞ্চলের কেশবপুর উপজেলা প্লাবিত হচ্ছে।

এছাড়া কেশবপুরে অপরিকল্পিতভাবে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না রেখে প্রায় ৫ হাজার মাছের ঘের গড়ে উঠেছে। এসব ঘের মালিকরা শুষ্ক মৌসুমে স্যালো মেশিন দিয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানি তুলে ঘের ভরে মাছ চাষ করছে। এতে একদিকে ভূ-গর্ভস্থ পানি স্তর দিন দিন নেমে যাচ্ছে অন্যদিকে বর্ষার অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন হতে না পেরে বিস্তৃর্ণ এলাকা প্ল­াবিত হচ্ছে। গত ১৯ জুলাই শুরু হওয়া সপ্তাহব্যাপী প্রবল বর্ষণ, উজানে হরিহর ও বুড়িভদ্রা নদীর উপচে পড়া পানিতে কেশবপুর পৌরসভাসহ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ৮০টি গ্রাম প্ল­­াবিত হয়। এতে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়। ইতোমধ্যে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্যে তিনটি ভাসমান এস্কাভেটর যন্ত্র দিয়ে হরিহর, আপারভদ্রা ও বুড়িভদ্রা নদীর পলি অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে। যার কারণে শহরের প্রধান সড়কগুলোর পানি নেমে গেছে। তবে ঘেরের কারণে নিম্নাঞ্চলে স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে বাড়িঘর ছাড়া লোকজন ঈদের আগে বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

গত ৩ আগস্ট জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক এমপি উপজেলা পরিষদ হল রুমে সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের নেতাদের সঙ্গে বন্যা পরবর্তী করণীয় শীর্ষক মতবিনিময় সভা করেন। এ সময় তিনি যে সমস্ত ঘেরের কারণে পানি প্রবাহে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেন। কিন্তু তা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।

পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম বলেন, যারা হরিহর নদী দখল করে পাকা ভবন নির্মাণ করেছে ইতোমধ্যে তা চিহ্নিত করা হয়েছে। তার এলাকার প্লাবিত মানুষেরা এসব উচ্ছেদসহ হরিহর নদী খননের দাবি জানিয়েছেন।

খুলনা-যশোর পানি ব্যবস্থাপনা ফেডারেশনের সভাপতি পানি বিশেষজ্ঞ মহিরউদ্দীন বিশ্বাস বলেন, কাশিপুরে ক্রসড্যাম না থাকায় প্রতিবছর এসব নদীতে সাগর থেকে আসা ১৮ লাখ ঘন মিটার পলি জমে। যা অপসারণ করতে গেলে ৩ কোটি টাকা লাগবে। এ থেকে রক্ষা পেতে হলে ওই স্থানে ক্রসড্যাম দেয়ার পাশাপাশি টিআরএম চালুর বিকল্প নেই। তবে এ মুহূর্তে ঘ্যাংরাইল বেসিং এর আওতাভূক্ত নদীগুলো খননসহ ২৪নং পোল্ডারের ১৭টি স­ুইস গেটের দু পাশের পলি অপসারণ করতে হবে।

কেশবপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, কেশবপুর শহরের পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে হরিহর নদীর সাত কি.মি, ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে আপারভদ্রা নদীর সাড়ে সাত কি.মি ও এখনও বরাদ্দ না মিললেও বুড়িভদ্রা নদীর সাত কি.মি পলি অপসারণ কাজ শুরু হয়েছে এবং দ্রুত পানি নামতে শুরু করেছে। তবে ঘেরের কারণেও পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মনিরামপুর ও কেশবপুরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণের জন্য ৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এডিপিতে অনুমোদন পাওয়া গেলে কেশবপুরে আর জলাবদ্ধতা থাকবে না।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৩ আগষ্ট, ২০১৭ ইং
ফজর৪:১৩
যোহর১২:০৪
আসর৪:৩৯
মাগরিব৬:৩৭
এশা৭:৫৪
সূর্যোদয় - ৫:৩৩সূর্যাস্ত - ০৬:৩২
পড়ুন