আরশিনগর
জোটবাবুদের অঙ্কে প্রত্যয়, সংশয় বেপরোয়া মাটিতে
বাহার উদ্দিন০৩ মে, ২০১৬ ইং
জোটবাবুদের অঙ্কে প্রত্যয়, সংশয় বেপরোয়া মাটিতে
ঘড়ির কাঁটা এইমাত্র ১২টা পেরলো। মধ্যগগনের সূর্য ঝলকে ঝলকে অগ্নিতাপ বমন করছে। শহর জুড়ে গরমের অস্বস্তি আর শান্তি-ভোটের স্বস্তি। স্বস্তির অন্যান্য কারণ— সুনসান, যানজটহীন, উপদ্রবহীন রাস্তা। কোথাও, দলবেঁধে লোকজনের চলাচল নেই। জটলা নেই। চলন্ত গাড়ির বিকট আওয়াজ নেই। খালি খালি বাস হুসহুস করে বেরিয়ে যাচ্ছে। দুরন্ত গতিতে। ট্রাফিক পয়েন্টে থামলেও বড়োজোর একমিনিট। আমরা তখন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচন কেন্দ্র ভবানিপুরের জগুবাজারের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি। রোদের খোঁচায় বেফানা। দুজন পথচারীকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে কোনো বুথ আছে? ‘এই তো পাশের গলিতে একটি। মাঠের ওপাশে আরেকটি। বড়ো রাস্তা থেকে একটু ভেতরে।’ খানিকটা এগিয়ে নজরে পড়ল, বুথের বাইরে ভোটারের দীর্ঘ লাইন। কাছে, দূরে, গেটেও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সশস্ত্র জওয়ানেরা, সঙ্গে পুলিশও। ঘামে ভেজা মুখ তাঁদের গম্ভীর। দৃষ্টিও ভারী সতর্ক। খরদাহ উপেক্ষা করে দুটি বুথেই নিঃশব্দে ভোট প্রয়োগের উত্সব চলছে। আধাফৌজ আর পুলিশকর্মীরা প্রত্যেকের পরিচয়পত্র, বয়স খতিয়ে ভেতরে যেতে দিচ্ছেন। বুথ থেকে কয়েকশ মিটার দূরে, গলির দুপাশে গরম হাওয়ায় পতপত করে ভাসছে তরতাজা ঘাসফুল আর কংগ্রেসের হাতচিহ্নের ফেস্টুন’। দোকানে, বাড়ির দেয়ালে সাদামাটা শাড়ি পরে কাগজের ছবিতে জেদি, আত্মপ্রত্যয়ী মমতা। পাশেই তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী— প্রাক্তন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী দীপা দাসমুন্সী। কপালে লাল গোল টিপ। মিষ্টি হাসিতে যুদ্ধজয়ের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, এক ইঞ্চি জমিও ছাড়বে না। তাঁর আলোকচিত্রের পাশাপাশি কোথাও কোথাও ঝুলছে সিপিএমের কাস্তে হাতুড়ি। হাতের সঙ্গে কাস্তের গদগদ প্রেমচিত্র বেমানান লাগলেও এ বিষয়ে বুথগামী ভোটারের হেলদোল নেই, সবাই আপন ইচ্ছে চেপে রেখে পায়ে পায়ে এগোচ্ছেন। বিজেপিকে ঘিরে হঠাত্ প্রশ্ন জাগল, তাঁদের প্রার্থী চন্দ্র বসুর (নেতাজি পরিবারের সন্তান) মুখ কোথায়? দেয়ালে ছবি নেই, পদ্মফুলের প্রতীক নেই। নেই তাঁর প্রচারের চিহ্ন। ভদ্রলোক কি লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে হাওয়া? দিনকয়েক আগে প্রচারসভায় তাঁর মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়, জোটপ্রার্থীকে ভোট দিন। শুনে শ্রোতারা অবাক। বিস্মিত সংবাদমাধ্যম। সঙ্গে সঙ্গে ডেমেজ কন্ট্রোলে নেমে পড়লেন দলের প্রদেশ নেতারা। বললেন, অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এককথা বলতে গিয়ে আরেককথা বলে ফেলেছেন!’ কিন্তু এতে কি ধস আর হৈচৈ থামে? সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল স্বর চড়াও করে বলতে শুরু করল— বিজেপি, বাম-কংগ্রেস তলে তলে জোট বেঁধেছে। পাল্টা কামান দাগালেন বামপন্থীরা— তৃণমূল আর বিজেপির সমঝোতা আর গোপন থাকল না। পায়ের তলার জমি সরতে দেখে ভবানীপুরের প্রার্থীর মুখ দিয়ে মাকড়সার ঝোল ছড়াচ্ছে। কোনো কোনো টিভি চ্যানেলও প্রশ্ন তুলল। এখানে-সেখানে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেও যথাযথ, যুক্তিযুক্ত জবাব মিলল না। মেলার কথা নয়। গোপন আঁতাত হলে কেউ কি আর বলে? কিন্তু কার্যত বিজেপি’র সঙ্গে তৃণমূলের বা বাম-জোটের সঙ্গে গেরুয়া দলের বোঝাপড়া কি সম্ভব?  তৃণমূল এক সময় বিজেপির এনডি-এ সরকারের শরিক ছিল। গ্রামীণ ভোটব্যাংক, বাংলার সেক্যুলার আদর্শের দিকে তাকিয়ে সরে আসে। মোদী জমানায় সম্পর্ক আরও দুরূহ হয়ে ওঠে। বাম-কংগ্রেসকে ভারতীয় জনতাদল কখনও মিত্র ভাবেনি। ভাবতে পারে না। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে উভয়পক্ষ তাঁদের ঘোষিত, আদর্শগত ‘শত্রু’। বাংলায় বাম-কংগ্রেসের জোটকেও পরোক্ষে সমর্থন যুগিয়ে যাওয়া কখনও বাস্তবানুগ নয়, হবে বলেও মনে হয় না। হলে এই আত্মঘাত সামাল দেয়া অসম্ভব। সীমান্তে বা শহরাঞ্চলে ‘ভাজপা’র যেটুকু ছিটেফোঁটা সমর্থনের ভিত আছে, তাতেও ভয়াবহ ধস নামবে।

নির্বাচন কমিশনের নজিরহীন কড়াকড়ি দেখেও যাঁরা কেন্দ্রের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে তৃণমূলের সদ্ভাব বা সংঘাতের প্রবণতা আবিষ্কার করছেন— তাঁরা কেন জানি বুঝতে নারাজ যে, এক. স্বশাসিত কমিশন গত কয়েক দশক জুড়ে তার নিয়ন্ত্রণ শক্তিকে ক্রমাগত মজবুত করার চেষ্টা করছে। টিএন সেশন-এর আমল থেকে এই প্রক্রিয়ার আরম্ভ। এখনকার মুখ্য কমিশনার নসিম জায়েদি স্বল্পভাষী, অভিজ্ঞ আমলা। কেবল বাণীতে নয়, কাজের পরশ ছড়িয়ে তিনি তাঁর এক্তিয়ারকে দুর্ভেদ্য করে তুলতে চাইছেন। দুই. কেন্দ্রীয় শাসকরা, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর ভাবমূর্তিকে স্বচ্ছ, আরও সবল করতে পুরোপুরি দল নিরপেক্ষ অবস্থান গড়ে তুলে ইতিহাস তৈরি করতে চাইছেন। বাংলার নির্বাচনে তাঁর এ মনোভাব অধিকতর স্পষ্ট, সুদৃঢ়। তিন. বিজেপি জানে, বাংলার রাজনীতিতে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা তৃণমূল্য। এখানে যাঁরা রাজ্য পরিচালনার নামে বাহুবলকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন এবং যেসব বাহুবলী ক্ষমতায় ফিরে আসতে জোটবেঁধে লড়ছেন,— তাঁদের অর্থাত্ পরস্পর বিরুদ্ধ দুপক্ষের মনান্তর যত বাড়বে, ততই সঙ্ঘ পরিবারের সম্ভাবনার জমি শক্ত হবে। আসামের মতো হয়তোবা কোনো একদিন এখানেও তাঁরা ঘোলাজলে মাছ ধরবেন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড়ো রাজ্যটিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তাঁরা সফল। সংগঠন বাড়িয়ে কংগ্রেস ও অন্য বিরোধীদের হিসাবকে তছনছ করে ঝড় তুলে ওখানে সম্ভবত পদ্মফুলই এবার রাজ্য পরিচালনার দায়িত্বে আসবে। বাংলায়ও যদি রাজনীতির প্রধান স্রোতে আবর্জনা জমতে থাকে, তৈরি হয় অস্থিতির পরিবেশ, তাহলে কোনো একদিন ওঁরা বলবেন— বামপন্থীদের ৩৪ বছর তো দেখলেন, তৃণমূলকেও আর কয়েকবছর, কিন্তু কোথাও পরিবর্তনের চিহ্ন নেই, সর্বত্র পতনের দুর্লক্ষণ। অতএব একবার আমাদের সুযোগ দিয়ে দেখুন। বাংলার ভোটে তাঁদের প্রচার সর্বগ্রাসী না হলেও, টিভিতে, সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনে এই স্বপ্ন, এই ভাষাই বারবার ফুটে উঠছে।

৩০ অক্টোবরের ষষ্ঠ দফা-সহ এপর্যন্ত উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের যেসব এলাকায় ভোট হয়েছে, তাতে বিজেপির, কেবল শক্তি হ্রাসই হবে না, আসনসংখ্যা হয়ত তলানিতে এসে ঠেকবে। গত লোকসভা নির্বাচনে প্রবল ঝড় তুলেও কুল্লে দুটি আসন মিলেছে। ভোট পেয়েছে ১৭ শতাংশের একটু বেশি। কলকাতা পুরসভায় তাঁরা শূন্য। ভোটের হারও সারা রাজ্যে কমেছে। এই হ্রাস যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ফায়দা হবে কংগ্রেস ও বামজোটের। ২০১৪-র লোকসভার নির্বাচনে তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৩৯ শতাংশ, বামপন্থিদের ২৯ শতাংশ, কংগ্রেসের ১০ শতাংশের কাছাকাছি। বাম-কংগ্রেস ভোটের একাংশ মোদী ঝড়ে বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাই বামপন্থিদের আসন মাত্র দুটি, মালদা মুর্শিদাবাদের প্রায় অক্ষত দুর্গেও কংগ্রেসের কেবল চার। কিন্তু এবারের বিধানসভা নির্বাচনের পরিস্থিতি হঠাত্, দ্রুত বদলাতে শুরু করল। বাম-কংগ্রেস জোট তৈরি হওয়ার আগে মনে হচ্ছিল— নাগরিক মধ্যবিত্তের প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা সত্ত্বেও তৃণমূল নিরঙ্কুশ শক্তি নিয়ে ‘ক্ষমতায়’ ফিরে আসবে। কারণ, কংগ্রেসের ক্রমাগত অবক্ষয়, গোড়ার দিকে একক লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত এবং বামপন্থিদের সাংগঠনিক শৈথিল্য আর চির-বিরুদ্ধ প্রতিপক্ষের সঙ্গে জোট গড়ার ইচ্ছে নিয়ে সংশয়। দুপক্ষ যখন এসব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে আঁতাত গড়তে সমর্থ হল, তখন তাঁদের সমর্থনের ভিতও চাঙা হয়ে উঠল। সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করল তিনজনের স্বপ্ন। প্রয়াত, সিপিএম থেকে বহিষ্কৃত বাগ্মী সাংসদ সইফুদ্দিন চৌধুরী, প্রাক্তন নগর উন্নয়ন মন্ত্রী শিলিগুড়ির অশোক ভট্টাচার্য এবং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের। তাঁদের সঙ্গে নির্দ্বিধায় সুর মেলালেন কংগ্রেসি সাংসদ ও প্রদেশ সভাপতি অধীর চৌধুরী, বিধায়ক মানস ভূঁইয়া এবং দলের আপসহীন সৈনিক হুগলির আব্দুল মান্নান। জোট হতে পারে, হওয়া সম্ভব—তৃণমূল গোড়াতে বিশ্বাস করেনি। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেছে, এখনও করছে। যখন এ অসম্ভবের দাবি চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছে গেল, সিলমোহর মেরে দিলেন- সোনিয়া ও রাহুল গান্ধী— তখন সতর্ক মমতার ঝাঁজ যেমন বাড়ল, তেমনি বেড়ে গেল তাঁর দলের আশঙ্কা। একাই দলনেত্রী নিশান ও নিশানা নিয়ে ছুটতে লাগলেন উত্তর থেকে দক্ষিণে।

ইতোমধ্যে তাঁর এবং তৃণমূলের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলল অন্য কয়েকটি অপ্রত্যাশিত অঘটন। এক. নির্বাচন শুরু হওয়ার মুহূর্তে নির্মীয়মাণ উড়ালপুল ভেঙে পড়ে বেশ কয়েকটি মৃত্যু। দুই. দক্ষিণ ভারতের নারদ নামে একটি সংস্থা প্রায় একই সময়ে, দলের কয়েকজন নেতার ‘অর্থগ্রহণের সচিত্র মুহূর্তে’ দেখিয়ে অভিযোগ তুলল, ‘এঁরা ঘুষ’ নিয়েছেন। এই স্টিং অপারেশন কতটা সত্য, কতটা জাল— তা আমরা খতিয়ে দেখিনি, দেখা সম্ভব নয়। জাল যদি হয়ে থাকে, তার দায়ভার আমাদের নয়। তবু বলতে হচ্ছে, ভোটে এর প্রভাব পড়ছে। কালি ছড়িয়ে দিচ্ছে মমতার দলের ভাবমূর্তিতে। স্টিং অপারেশনকে শানিত অস্ত্রের মতো বিরোধীরা, বিশেষ করে বাম-কংগ্রেস জোট ইস্যু করছে। তিন. যেসব বুদ্ধিজীবী ১১-র বিধানসভা নির্বাচনে মমতার পাশে ছিলেন, মাঝারি ও নীচুস্তরের তৃণমূল কর্মীদের ‘ক্ষমতামত্ততা দৌরাত্ম্য ও দুর্নীতির’ বহরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে তাঁদের বড়ো অংশ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, প্রতিবাদী অবস্থান বজায় রাখলেন। চার.  নির্বাচন কমিশন গেরিলা কৌশলের মতো যেভাবে সাত দফায়, বিভিন্ন অঞ্চলে ১ লাখ কেন্দ্রীয় বাহিনী নামিয়ে ভোট করাচ্ছে, ভোটের আগে প্রশাসনিক অধিকারিকদের রদবদলের নির্দেশও জারি করল, নজরবন্দী করে রাখল বহু দাপুটে নেতাকে, তাতে তৃণমূলের সাংগঠনিক মেশিনারি নিষ্প্রভ, খানিকটা নিস্তেজ হয়ে পড়ল। ভোট যত কলকাতা ও তত্সংলগ্ন জেলার দিকে এগোল, ততই বিভিন্ন দলের দাদাগিরি রুখতে পুলিশ ও আধাফৌজের সজোর হস্তক্ষেপ বেড়ে ওঠে। প্রসঙ্গত কয়েকটি উদাহরণ— প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফার ভোট প্রয়োগে, উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায়, দক্ষিণবঙ্গের বাকুঁড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর ও বর্ধমানে যতটা দৌরাত্ম্য দেখা গেছে এবং কোথাও কোথাও ৯০ শতাংশের ওপর ভোটও পড়েছে, তাতে পুলিশের ভূমিকা, কেন্দ্রীয় বাহিনীর দিশেহারা অবস্থা প্রশ্নাতীত নয়। রেকর্ড ভাঙা ভোটের কারণ নিয়ে সংশয় আর জিজ্ঞাসা জাগতে পারে। কেউ কেউ অবশ্যই যুক্তি দেখাতে পারেন, ব্যালট বাক্সে গণইচ্ছার বিস্ফোরণ ঘটেছে। একথা আমরাও গোড়ার দিকে বলেছি। ক্ষমতায় টিকে থাকতে যেমন শাসকগোষ্ঠী তাঁদের ভোটারদের মরিয়া করে তুলেছে, তেমনি কুরসিতে ফিরে আসতে সঙ্ঘবদ্ধ জোটও নিজেদের সমর্থকদের দুঃসাহস যুগিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুপক্ষের মৃত ভোটারের জ্যান্ত হয়ে ওঠার সত্য-অসত্য বৃত্তান্ত এবং ছাপ্পা ভোট। আবার চতুর্থ দফা থেকে যখন ভোট প্রয়োগের হার ক্রমশ নিচে, ৭৯ ও ৮০ শতাংশে নেমে এল, কমলো পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, বেড়ে গেল আধাফৌজের বাহাদুরি। পঞ্চম ও ষষ্ঠ পর্যায়ের ভোটের আগে দেখা গেল পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী যৌথ ফৌজের মতো দুর্বৃত্ত দমনে, শৃঙ্খলা রক্ষায় ক্লাবে ক্লাবে বোমা উদ্ধারে নেমে পড়ছে, ব্যারিকেড তৈরি করে রাতে তল্লাশি চালাচ্ছে। ভোটের দিন তাঁরা আরও সক্রিয়, আরও কঠোর। বে-নিয়ম দেখলে মন্ত্রী, প্রার্থী কাউকেই রেহাই দিচ্ছেন না। উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং কলকাতার প্রায় সব কেন্দ্রে নিরাপত্তা রক্ষীদের একই রুদ্রমূর্তি। যা অবাধ ভোটের নজির সৃষ্টিতে ঐতিহাসিক মাইলফলক বলে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এবারের নির্বাচনকে ইতিহাস তৈরির নির্ণায়ক বলার আরো কয়েকটি কারণ রয়েছে। তা হচ্ছে এই যে— এই প্রথম বামপন্থিরা সরাসরি বহুত্ববাদী কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধলেন, লড়লেন, ভোটও দিলেন।

পার্ক সার্কাসের বিশাল সমাবেশে সম্প্রতি এক মঞ্চে পাশাপাশি বসলেন বুদ্ধদেব, কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী, প্রদেশ সভাপতি অধীর চৌধুরি। বুদ্ধকে প্রণাম করলেন বালিগঞ্জের কংগ্রেস প্রার্থী কৃষ্ণা দেবনাথ, শোনাকথা, প্রত্যুত্তরে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নাকি জানালেন, আপনাকেই ভোট দেব। বুদ্ধের গলায় এই প্রথম কংগ্রেসের তেরঙ্গা গামছাও ঝোলাতে দেখা গেল। এবং এই প্রথম কলকাতা পুলিশ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে নৈতিক দায়িত্ব পালন করল। এর কৃতিত্ব যতটা নির্বাচন কমিশনের, তার চেয়ে বেশি বই কম নয় কলকাতার পুলিশ কমিশনার সোমেন মিত্র, সল্টলেকের দুঃসাহসী আধিকারিক জাভেদ শামিম আর তাঁদের সহযোগীদের। আশাকরি ভোটের ফল ঘোষণার পর বিজিত, পরাজিত কারো বলার হক থাকবে না যে, শেষের কয়েক দফায় সশস্ত্র ও নিরস্ত্র বাহিনীকে নিষ্প্রভ ও নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল। তাঁদের এ ভূমিকা, অবাধ ভোট প্রয়োগের দিনপঞ্জীতে অবশ্য, অতি অবশ্যই নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। জোট নেতারা পুলিশকে, বাহিনীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন, সন্তুষ্ট বাম নেতারা প্রেস কনফারেন্স করেছেন, কিন্তু তৃণমূলের কাউকে এহেন সম্মেলন করতে দেখা গেল না। নিজের এলাকায় ভোট দিয়েছেন এবং নিঃশব্দে বারবার ইংরেজি ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়েছেন আত্মবিশ্বাসী মমতা, কিন্তু দিনভর কেন বাড়িতে বসে থাকলেন, কেন ঢুঁ মারলেন না তাঁর নির্বাচন কেন্দ্রে? এর কারণ রহস্যময় হয়ে রইল। ২৯৪ কেন্দ্র ঘুরে বেড়িয়ে, দুই শতাধিক সভা করে মমতা হয়তো ক্লান্ত, হয়তো তাঁর মা মাটি আর বেপরোয়া সৈনিকদের মেঘলা সংশয় আর ‘বাহিনীর’ বাড়াবাড়ি দেখে তিনি বিরক্ত, অভিমানে আহত।

তাঁর মতো জেদি, জনমুখী নেত্রীর দুঃখ পাওয়া, ক্রুদ্ধ হওয়া স্বাভাবিক। লড়াই যাঁর উত্তরণের সঙ্গী, প্রখর যাঁর ভাবাবেগ— তাত্ক্ষণিক, উড়ন্ত গুজব তাঁকে সাময়িকভাবে অশান্ত করতেই পারে, কিন্তু তাঁর স্বপ্নকে কি চিরাহত করে রাখবে? রাখতে পারবে? অসম্ভব। তবু কেন, কীসের ভিত্তিতে বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু ভোটের যষ্টীতেই বলে দিলেন, ১৯ মে’র পর নেত্রী ‘প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী’ হয়ে যাবেন, প্রায়ই একই কথা শুনিয়ে হাসালেন প্রদেশ কংগ্রেসের অধীর সর্বেসর্বা। সাত দফার ভোট তো এখনও বাকি, তা সত্ত্বেও কেন একদিকে সানাই আর অন্যদিকে অতি প্রত্যাশার জয়ধ্বনি বাজতে শুরু করল? এর উত্তর জানা নেই আমাদের। জানি শুধু এইটুকু— ময়দানে যে যুদ্ধ করে সে কখনও কাঁদে না, ভয় পায় না। বলে না হেরে যাচ্ছি, মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও যুদ্ধের সেনাপতি তাঁর বাহিনীকে মরণপণ লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন, মমতাও একই গোত্রের সেনানেত্রী, যদিও বাতাসে সংশয় আর গুজব উড়ছে। দুর্মুখ আভাস টের পেলেও আমরা পেশাগত নিরপেক্ষতার খাতিরে ১৯ মে পর্যন্ত চুপচাপ দেখে যাব। ঘুরতে থাকব। যাচাই করব ভোট ফেরত জনমত।

n লেখক: ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা

 

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
৩ মে, ২০১৮ ইং
ফজর৪:০২
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:৩১
এশা৭:৪৯
সূর্যোদয় - ৫:২৩সূর্যাস্ত - ০৬:২৬
পড়ুন