চাই বারুদের গন্ধমুক্ত শিশুবান্ধব পৃথিবী
ড. মো. ইকবাল হোছাইন২৭ মে, ২০১৭ ইং
চাই বারুদের গন্ধমুক্ত শিশুবান্ধব পৃথিবী
ম্যানচেস্টারে অ্যারিয়নের  কনসার্টে  আত্মঘাতী হামলার দিন শিশু সাফি রোজসহ অনেকেই গিয়েছিল। আত্মঘাতী বোমার আঘাতে নিহতের তালিকায় তাকেও সংযুক্ত করেছে। শিশুদের মৃত্যুতে আমাদের মানবিক বিবেক কেঁদে উঠে। মনের কাবাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। আমরাতো মুক্তিযুদ্ধের সময় বারবার গেয়েছি‘একটি ফুলের জন্যে মোরা যুদ্ধ করি’ গান। একটি ফুল তো আর কিছুই নয়। এরা তো ঘুমিয়ে থাকা প্রতিটি অন্তরের প্রাণের প্রাণ বিশ্ব মানবতার ভবিষ্যত্, আমাদের কলিজার টুকরা শিশুরা। আমাদের কালজয়ী যে পঙক্তি “ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে” এ বাণীতো সকল মানবতার জন্য। এখানে পূর্ব-পশ্চিম, ধনী-দরিদ্র, ইউরোপ-আমেরিকার শিশুদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সাফি রোজের শিক্ষক কান্না জড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘Simply a beautiful little girl in every aspect of the world. আসলে রোজেদের মতো সকল শিশুই ‘লিটল এঞ্জেল’। আজকের সিরিয়ায় যুদ্ধের সাধারণ মানুষের কথা না হয় বাদই দিলাম যেভাবে শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে তাদের গুরুত্ব কোনো অংশে সাফি রোজেদের চেয়ে কম নয়। কিন্তু বিশ্ব মিডিয়া বা বিশ্ববিবেক কি তাদের প্রতি সুবিচার করছে? মধ্যপ্রাচ্যে শতশত শিশু হত্যার বিপরীতে পশ্চিমা মিডিয়া বা মানবাধিকার কর্মীদের বৈষম্যমূলক আচরণ আমাদের প্রচণ্ডভাবে আঘাত করে। আমি যখন আমার সন্তানের মুখের দিকে তাকাই তখন পৃথিবীর সকল অকালে ঝরে যাওয়া সাফি রোজেজ, আইলান ও আলীর কথা স্মরণ হয় যারা পৃথিবীর এক বৈষম্যপূর্ণ ব্যবস্থার শিকার। বৈষম্যের মাত্রা আজ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিভীষিকাকবলিত অঞ্চলে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে ম্যানচেস্টার ম্যাসেকারে পরের দিন এক দুর্ঘটনায় প্রায় দেড়শত শিশু নিহত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমানে চলমান প্রতিটি যুদ্ধের আক্রমণে কোনো না কোনোভাবে পিতা-মাতার কলিজার টুকরা সন্তানেরা নিহত হচ্ছেন। মাত্র একজন ইসরাইলি হত্যার অভিযোগ তুলে কোনো তদন্ত ছাড়াই কিছুদিন পূর্বে শতশত শিশুকে যারা হত্যা করল তাদের কোনো বিচার কি হবে না? যে সিরিয়াবাসী একসময় বিশ্বের প্রথমসারির রাষ্ট্রগুলোর লাইফস্টাইলের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করত তাদের শিশুরা যখন ডাস্টবিন থেকে উচ্ছিষ্ট খাবার নিয়ে কুকুরের সঙ্গে লড়াই করে তখন বিশ্বের বৈষম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার দিকেই অভিযোগের ইঙ্গিত চলে আসে। এ বৈষম্য সৃষ্টি করেছে কারা? বিশ্বের তেলকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার যুদ্ধের গিনিপিগ যে দেশ ও শিশুরা তাদের ব্যাপারে বিশ্ববাসীর কিছু করার নেই? আয়নাল কুর্দির কথা হয়ত মিডিয়ায় এসেছে কিন্তু এরূপ কত আইনাল যে ভূমধ্য সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে তার হিসেব কি কেউ রেখেছে? জিবাণু অস্ত্র ব্যবহার সিরিয়ায় কে করেছে এ নিয়ে আমেরিকা আর রাশিয়া কূটনৈতিক অনেক বাকবিতণ্ডা করেছে কিন্তু তারা কি একবার ভেবেছে এ জীবাণুর প্রভাব শিশুদের জীবনকে ঝাঝরা করে দিচ্ছে? পঙ্গু করে দিচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম! কেবল পরাশক্তির নিজেদের দাম্ভিকতা আর স্বার্থের খেলায় সিরিয়ার এসব অবুঝ শিশুর আর কতকাল বলি হবে? এক হামলায় ইয়ামেনের জাতিসংঘ কর্তৃক পরিচালিত হাসপাতালে যে শিশুদের হত্যা করা হয়েছে, এ যুদ্ধাপরাধের দায়ভার কে নেবে? আফ্রিকায় জঙ্গিরা সর্বদা শিশুদের জিম্মি করে তাদের স্বার্থ আদায়ের কৌশল প্রয়োগ করে। যদি প্রশ্ন করা হয় তাদের অস্ত্র ও অর্থের যোগানদাতা কে? তাহলে আমাদের কাছে কি উত্তর আসবে? সারা পৃথিবীর সকল জাতি ও শান্তিপূর্ণ মানুষ বৈষম্যহীন একটি পরিবেশে বেড়ে উঠুক, শিশুরা গোলাবারুদের গন্ধমুক্ত পরিবেশে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গর্জে উঠুক এটা আমাদের সকলের চাওয়া। আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমন্ত্রণে একসফরে গতমাসে আমেরিকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে। শিক্ষাবিদ হিসেবে আমাদেরকে অনেক প্রাথমিক ও প্রি-প্রাথমিক স্কুলেও নিয়ে যাওয়া হয়। কী চমত্কার পরিবেশ? শিশুদের মনন গঠনের প্রায় সকল উপকরণ সেখানে রাখা হয়েছে। সরকার ও সমাজের বিত্তশীলদের অর্থের এক বিরাট অংশ তারা শিশুদের কল্যাণে খরচ করে। নর্থ কেরোলিনার একটি স্কুলের শিশু আমাকে প্রশ্ন করেছিল তোমাদের দেশের শিশুরা কি আমাদের মতো স্কুলে পড়াশুনা করে? উত্তর দিতে অনেক কষ্ট হয়েছে। হেসেই বলেছি আমাদের শিশুরাও স্কুলে যায়, তারাও পড়ার টেবিলে বসে, খেলতে মাঠে যায়, তবে তোমাদের ন্যায় এত চমত্কার স্কুলের পরিবেশ তাদের নেই, এত সুন্দর খেলার বা আর্ট করার জিনিসপত্র নেই। তখন স্কুলের প্রিন্সিপাল তাদের বলল, তোমরা পড়ালেখায় অনেক বেশি সুযোগ পাচ্ছ। যা তাদের সন্তানেরা পাচ্ছে না। সুতরাং তোদের দায়িত্বও বেশি। আমি ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধ ও ক্ষুধামুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি। যে পৃথিবীতে কেবল সীমানার নামে মানুষে মানুষে এত ব্যবধান থাকবে না। ওহাইওতে এক স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রিফিউজিদের সন্তানদের কী সুন্দরভাবে পড়ান হচ্ছে। সেখানে সাদা-কালো বা ব্রাউন চামড়ার কোনো তফাত্ নেই। দেখে মনটা ভরে উঠল আর মনের দৃশ্যপটে ভেসে উঠল সারা পৃথিবীটা শিশুদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে উঠুক। পৃথিবীর সন্তানেরা যেখানেই জন্ম নেয় সেখানেই বড় হোক।  শিশুরা সকল কিছুতে অগ্রাধিকার পাক। শিশু আগামী প্রজন্মের প্রতিনিধি। তাকে কোনোভাবে ধনী, দরিদ্র, সাদা-কালো বা ধর্মের ভিত্তিতে আর কখনো বিভক্ত করা না হোক। পৃথিবীটা শিশুদের জন্য হয়ে উঠুক স্বর্গরাজ্য। যারা ম্যানচেস্টারে বোমা মেরে বা সিরিয়ার শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করছে তাদের প্রতি এবং তাদের ক্রীড়নকদের প্রতি আমাদের নিন্দা ও ঘৃণা। আমার বিশ্বাস এখনই যদি তারা এ খেলা বন্ধ না করে এ দাম্ভিকতার শেষ একদিন হবেই। কেবল তেল সম্পদকে নিজেদের কবজায় রাখার জন্য চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ বন্ধ না করলে বিশ্ববিবেক জেগে উঠবেই। সেদিন নিষ্পাপ শিশুসহ সকল অবৈধ হত্যার পাই পাই হিসেব শান্তিকামী মানুষ বুঝে নেবে। সুতরাং আর দেরী নয় এখন সতর্ক হোন। অস্ত্রের ঝনঝনানি মুক্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসুন।

n লেখক :পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২৭ মে, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৬
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩৫
মাগরিব৬:৪২
এশা৮:০৫
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৩৭
পড়ুন