জলজট ও জলাতঙ্কে বিপন্ন চট্টগ্রাম মহানগর
অধ্যাপক এম আলী আশরাফ২১ জুন, ২০১৭ ইং
জলজট ও জলাতঙ্কে বিপন্ন চট্টগ্রাম মহানগর
চট্টগ্রাম নগরীর জন্য বৃষ্টি মানে জলজট, বৃষ্টি মানে জলাতঙ্ক। বিশেষ করে যারা বস্তিতে থাকেন এবং মুরাদপুর, ষোলশহর, মোহাম্মদপুর, শুলকবহর, চকবাজার, মোগলটুলী, পাথরঘাটা, আগ্রাবাদ কিংবা হালিশহরে যাদের বাস— মেঘ গুড় গুড় করলেই তারা জলাতঙ্ক রোগে ভোগেন। সারাক্ষণ এই দুশ্চিন্তায় থাকেন কখন ঘর-বাড়ি বানের জলে তলিয়ে যাবে। অতি সম্প্রতি জুন মাসের দ্বিতীয় সাপ্তাহে চট্টগ্রামে বেশ কদিন ভারী বর্ষণ হয়েছে। এতে চট্টগ্রাম  নগরীর এক-তৃতীয়াংশ পানির নিচে তলিয়ে যায়। আগ্রাবাদ এক্সেস রোডে সাম্পান চলছে এই দৃশ্য দেশবাসী পত্র-পত্রিকায় এবং টিভির পর্দায় দেখেছেন।

এই জলজট, জলাতঙ্ক চট্টগ্রাম নগরীর পুরনো এক রোগ। ষাটের দশকে চট্টগ্রামের জনসংখ্যা যখন তিন লক্ষের মতো ছিল, যখন দালান কোঠার আধিক্য ছিল না, রাস্তায় যান্ত্রিক যানের চাইতে ঘোড়ার গাড়ি কিংবা গরুর গাড়ির আধিক্য ছিল, তখনো চট্টগ্রামে জলজট ছিল। চট্টগ্রাম নগরীর জলজট নিরসনের জন্য প্রথম ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নকারী  জন স্নেল এন্ড কোম্পানি তাদের রিপোর্েট এ ধরনের এক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে। খবরের কাগজের সংবাদের বরাত দিয়ে লিখেছে, ১৯৬৫ সনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সামনের রাস্তা দিয়ে তিন/চার ফুট জল গড়িয়েছে। এই জলজট কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী ছিল। অর্থাত্ পঞ্চাশাধিক বছর পূর্বেও চট্টগ্রামের জলজট অনেকের চোখে পড়েছিল। ১৯৬৯ সনে চট্টগ্রামের জন্য ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করে আমেরিকান কোম্পানি  জন আর স্নেল এন্ড কোম্পানি। তারা চট্টগ্রাম শহরের ভেতরে ৭০টি খালের প্রায় ৫ লাখ ৬৮ হাজার ফুট (প্রায় ১০০ মাইলেরও বেশি) সার্ভে করেছিলেন। তারা চট্টগ্রামের নেভ্যাল একাডেমি হতে কালুরঘাট ব্রিজ পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর সাথে ৩৪টি খালের সংযোগ দেখেছিলেন। অতি সম্প্রতি চট্টগ্রাম ওয়াসার নিয়োজিত কনসালট্যান্ট, গ্রন্টমিজ (GRONTMIJ A/S) একই স্থানে ২২টি খাল পেয়েছেন। ৩৪টি খালের মধ্যে ১২টি খালই গায়েব। এই খালগুলো গেল কোথায়? খালখেকোরা কি খেয়ে ফেলেছে? আরএস জরিফে খাল ছিল, বিএস জরিফে এসে সেই খাল ভিটাতে পরিণত হয়েছে— কেউ না কেউ সেখানে বাড়ি বানিয়েছে, খালের অস্তিত্বই এখন নেই।ইতিহাস বইতে হয়তো কোনদিন লেখা হবে— একদা এখানে একটি খাল ছিল।

যাক, বলছিলাম জন আর স্নেলের রিপোর্টের কথা। স্নেলের সমাধান প্রস্তাব তিন ভাগে বিভক্ত ছিল: ফেইজ - ১ (৩ বছর), ফেইজ-২ (৩ থেকে ৫ বছর), ফেইজ-৩ (৩ থেকে ৫ বছর) । এই প্রকল্পগুলোতে সর্বমোট খাল পুনর্বাসনের প্রস্তাব ছিল এক লাখ ৮৩ হাজার ফুটের। নতুন প্রধান খালের প্রস্তাব ছিল ৯৮ হাজার ৬৭০ ফুটের, নতুন সেকেন্ডারি খালের প্রস্তাব ছিল ২ লাখ ৭২ হাজার ফুটের। সমুদ্র উপকূলের প্রতিরক্ষা বাঁধ এবং কর্ণফুলীর তীর প্রতিরক্ষা বাঁধসহ প্রকল্পগুলোর সর্বমোট প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১৮ কোটি টাকা ( ১৯৬৯ সালের হিসাবে )। বর্তমান বাজার দরে এই টাকার পরিমাণ হবে প্রায় ৩২০ কোটি টাকার মতো। জলাবদ্ধতা নিরসনে জন আর স্নেলের পরামর্শ অনুযায়ী আমরা কাজ করিনি, ফলে জলাবদ্ধতা জলাতঙ্ক হয়ে সগৌরবে রাজত্ব করার সুযোগ পেয়ে গেল। দিন দিন সমস্যা বাড়তে থাকল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে দোকান-পাট, রাস্তাঘাট, ঘর-বাড়ি ইত্যাদি আচ্ছাদিত স্থানের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকল। ষাটের দশকে যে পানি মাটি ভেদ করে জমির অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ত, ২০১৭ সালে এসে তার অধিকাংশই, জমির অভ্যন্তরে ঢুকতে না পারার কারণে, এখন চাকতাই খাল কিংবা মহেশ খাল অভিমুখী। খালের পরিবহন ক্ষমতার চাইতে বেশি পানি এসে উপস্থিত হলে খালের দুকূল প্লাবিত হয়। মানুষের উঠান এবং রাস্তা-ঘাট হয়ে পড়ে খাল। বর্ষাকালে এই দৃশ্য আমাদের সকলেরই চোখে পড়েছে।

অতি সম্প্রতি  অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে বেশ কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মহেশখালের বাঁধটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। কোনো রকম প্রাক সমীক্ষা ছাড়াই বন্দর কর্তৃপক্ষ বাঁধটি নির্মাণ করেছিলেন আগ্রাবাদ এলাকায়  জোয়ার-জলোচ্ছ্তাসের প্লাবন ঠেকাতে। এই জুন মাসের বন্যায় বাঁধটির অকার্যকারিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। আগে যেখানে হাঁটু পানি হতো— এখন সেখানে গলা পর্যন্ত পানিতে ডুবে গেছে। কোনো কোনো স্থানে পানি সরতে না পেরে সপ্তাহকাল জলাবদ্ধতা ছিল। আবর্জনা পচে-গলে পুরো পরিবেশটাই দুর্গন্ধময় হয়ে পড়েছিল। স্থানীয় জনগণ, সংবাদ মাধ্যম এবং পরিবেশবিদদের প্রচণ্ড আপত্তি উপেক্ষা করে এই বাঁধ নির্মিত হয়েছিল। সেই বাঁধটি এখন কাটা হয়েছে। এই অপরিকল্পিত কাজ এবং জনগণের অর্থের এই অপচয়ের দায়িত্ব কে নেবে ?

আমাদের সমাধান প্রস্তাব আছে। প্রতিটি মাস্টার প্ল্যানেই সমাধান প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আমরা তা প্রয়োগ করিনি বরং নতুন করে আবার সমাধান প্রস্তাব দেয়ার জন্য বিদেশি কনসালট্যান্ট নিয়োগ করেছি। গত ৫০ বছর ধরেই চলছে মাস্টার প্ল্যান বানানোর কাজ— আমরা একের পর এক প্ল্যান বানিয়ে চলেছি। ১৯৭২ সনে তদানীন্তন ওয়াটার ডেভেলপম্যান্ট বোর্ড  আরো একটি ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করে। এতে অনেকগুলো প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সনে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কাজটি আর আগায়নি। এরপরে অনেক দিন থমকে থাকার পর ১৯৮৫ সালে লুইস বার্জার ইন্টারন্যাশনাল, ইউএসএ, ডেভেলপিং এনভাইরনম্যান্টাল ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট নামীয় একটি রিপোর্ট পেশ করে। এই রিপোর্টে শুধুমাত্র নগরীর কেন্দ্রীয় এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ছিল। তারা প্রধানত বহদ্দারহাট, চাকতাই, মহেশখাল এবং সদরঘাট খাল সন্নিহিত ক্যাছমেন্ট এরিয়ার উন্নয়নে কাজ করেন। শেখ মুজিব রোড বক্স কালভার্টের বিষয়ে লুইস বার্জারের সুপারিশ ছিল। পরে বিকেএইচ কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার এই বক্স কালভাটের নকশা প্রণয়ন করেন। ১৯৯৫ সালের দিকে কাজটি সম্পূর্ণ হয়। এটি না হলে এখনো হয়তো শেখ মুজিব রোড এবং সন্নিহিত এলাকায় জাল দিয়ে মাছ ধরা যেত।

এরপর চুপচাপ অনেকদিন। আবারো নতুন করে ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন কাজ শুরু হয় ইউএনডিপির অর্থানুকূল্যে। বিনী এন্ড পার্টনারের নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি কনসালটেন্টদের একটি দল এই মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করেন। ১৯৯৫ সালে এই প্ল্যান প্রণয়নের কাজ শেষ হয়। এরপর গত ২০/২২ বছরে এই প্ল্যান অনুযায়ী খুব একটা কাজ হয়নি। কেউ কোনো প্রকল্প প্রস্তাবও পাঠায়নি প্ল্যানিং কমিশন কিংবা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। ২০১৪ সালে, প্রথমবারের মতো, সিটি কর্পোরেশন বহদ্দারহাট হতে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত নতুন খালের প্রস্তাব পাঠায় এবং সেটা ‘একনেকে’ অনুমোদিত হয়। ১৯৯৫ সনের মাস্টার প্ল্যানের সমস্ত কাজকে পাঁচটি ফেইজে বিভক্ত করা হয়। অগ্রাধিকার-১ কাজগুলো করতে ১৯৯২-এর বাজার দরে খরচ হওয়ার কথা ছিল ৮৯ কোটি টাকা। ১৯৯৫ এর ডেনেজ্র মাস্টার প্ল্যানের সব কাজ সম্পন্ন করতে ১৯৯২এর বাজার দর অনুয়ায়ী খরচ হতো প্রায় একহাজার কোটি টাকা । ফেইজ-১ কাজের মধ্যে কিছু নতুন খাল এবং চাকতাই খালের মুখে রেগুলেটরের প্রস্তাব ছিল। ফেইজ ওয়ানের কাজগুলো  অগ্রাধিকারের এক নম্বরে ছিল। অথচ এখনও কাজগুলোর কিছুই হয়নি।

 

১৯৯৫-এর ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে দাবি করে এখন মাঠে নেমেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা । তারাও আবার নতুন করে চট্টগ্রাম নগরীর জন্য ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের কাজ শুরু করেছেন। এই প্ল্যানটি হবে চট্টগ্রাম নগরীর পঞ্চম ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান। তাদের প্রস্তাবিত ফেইজ-১ কাজগুলো ২০১৬-১৮ সালের মধ্যে শেষ করতে হবে। এতে খরচ হবে ১০ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন ইউএস ডলার।

গত ৫০ বছরে ড্রেনেজ খাতে পাঁচটি মাস্টার প্ল্যান প্রণীত হয়েছে বা হচ্ছে। জনগণের টাকায় প্রণীত এই মাস্টার প্ল্যানগুলো কেউ উল্টিয়ে দেখেন বা দেখেছেন বলে মনে হয় না। দেখে মনে হয়, প্ল্যান বাস্তবায়নের চাইতে প্ল্যান প্রণয়নেই আমাদের আগ্রহ বেশি। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধি, সিভিল ব্যুরোক্রেট এবং টেকনিক্যাল ব্যুরোক্রেটদের এই নিস্পৃহতা অমার্জনীয়। জবাবদিহিতার বাধ্যবাধকতা না থাকায় দিন দিন জনগণের ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। চট্টগ্রাম নগরীর  জনসংখ্যা তিন লাখ থেকে বেড়ে এখন হয়েছে অর্ধ কোটি। রাস্তা-ঘাট এবং পাকা দালান-কোঠা হয়েছে অসংখ্য। কিন্তু জলাতঙ্ক শেষ হয়নি। কবে শেষ হবে জানি না। সম্প্রতি চাকতাই থেকে কালুর ঘাট ব্রিজ পর্যন্ত ৮ দশমিক ৫৫ কি.মি. সড়ক বাঁধের প্রস্তাব ‘একনেকে’ অনুমোদিত হয়েছে। ১২টি রেগুলেটরসহ এই বাঁধ এবং রাস্তা র্নিমাণ করতে খরচ হবে এক হাজার ৯৭৮ দশমিক ৮৮ কোটি টাকা। এই জুলাইতে কাজটি শুরু হয়ে তিন বছরে শেষ হবার কথা। এই বাঁধ এবং রেগুলেটর র্নিমাণ করা হলে চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা কমে যাবে বহুলাংশে। চট্টগ্রামের মানুষ ৫০ বছরেরও অধিককাল ধরে অপেক্ষা করছে এবং স্বপ্ন দেখছে জলাবদ্ধতা ও জলাতঙ্কমুক্ত এক নিরাপদ নগরী। সত্যিই কি সেই সুদিন আসবে?

n লেখক: বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী এবং নগর পরিকল্পনাবিদ। সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত উপ-উপাচার্য এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান। চট্টগ্রাম নগরীর মাস্টার প্ল্যান (১৯৯৫) এবং ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (২০০৮) প্রণয়নে বিশেষজ্ঞ হিসেবে সম্পৃক্ত ছিলেন।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন