আসছে পরিবেশবান্ধব পাটের পলিথিন
ড. মো. হুমায়ুন কবীর২১ জুন, ২০১৭ ইং
আসছে পরিবেশবান্ধব পাটের পলিথিন
যতই ব্যস্ততার মধ্যে থাকি না কেন সপ্তাহে অন্তত একবার নিজের হাতে বাজার করতে বের হই। শুক্রবারের ছুটির দিনেও বেরিয়েছিলাম। আমার বাজারের আইটেম ছিল মোট ১৫টি। সেই ১৫টি আইটেমের বাজার করতে গিয়ে দেখলাম প্রতিটি আইটেমের জন্য আকার-আকৃতি অনুসারে একটি করে পলিথিন ব্যাগ গছিয়ে দিয়েছে। সেই ১৫টি ছোট ছোট ব্যাগের বহরটি আবার ঢোকানো হয়েছে আরেকটি বড় পলিথিনের মধ্যে। সবমিলিয়ে পলিথিনের সংখ্যা দাঁড়াল ১৬টিতে।

আমি বাজার করার জন্য একটি বড় পাটের ব্যাগ নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু দোকানিদের অনাগ্রহের কারণে তা কোনো কাজে আসেনি। শহর শুধু নয়, গ্রাম-গ্রামান্তরের প্রত্যেকটি বাজার দোকানে একই অবস্থা। মানুষ পলিথিনগুলো কোনো ডাস্টবিন কিংবা ফাঁকা স্থানে ফেলে দিয়ে আসে। এভাবে প্রতিদিন শত শত, হাজার হাজার, লাখ লাখ, কোটি কোটি পলিথিন জমা হচ্ছে ভূ-উপরিভাগে। তারপর সেগুলো আবার বাতাস, বৃষ্টির পানির স্রোত, বন্যা ইত্যাদির মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়।

কিন্তু আশার কথা, এরই মধ্যে সরকারের পাট মন্ত্রণালয় নিয়ে এসেছে একটি সুখবর। আর সেটি হচ্ছে গতানুগতিক ধারার ক্ষতিকর সিনথেটিক রাসায়নিক পলিথিনের পরিবর্তে পাট দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে পরিবেশবান্ধব পলিথিন। এ পলিথিন তিন থেকে সর্বোচ্চ ছয়মাসের মধ্যে মাটির সঙ্গে পচে মিশে যাবে। এটি যে পলিথিনের জগতে কী এক বিরাট সফলতার খবর তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। কারণ ইতোমধ্যে পলিথিনের ব্যবহার এত ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে যা আর কোনো অবস্থাতেই একেবারে নির্মূল করা সম্ভব নয়।

এরই মাঝে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ডেমরার লতিফ বাওয়ানি জুটমিলে পাট থেকে পলিথিন উত্পাদনের এ সুসংবাদটি জাতির সামনে তুলে ধরেন পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক ও একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম। সেখানে পাট ও পাটজাত বর্জ্য হতে পলিব্যাগের সেলুলোজ নিয়ে তার সঙ্গে কেমোসিনথেটিক মিলিয়ে তা অল্প আঁচে গলিয়ে ছাঁচে ফেলে তৈরি করা হচ্ছে পরিবেশবান্ধব এ পলিথিন। প্রতিষ্ঠানটি একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে এ অসাধ্য সাধন করার খবরটি প্রকাশ করেছে। 

প্রচলিত পলিথিনের মতোই এ পলিথিন হালকা, পাতলা, টেকসই ও দামে সাশ্রয়ী হবে। বাংলাদেশে পাটের তৈরি এ পলিথিন উদ্ভাবন করেন বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক মহাপরিচালক ড. মোবারক আহমদ। এর আগে পাটের সুদিন আবার ফিরিয়ে আনার অংশ হিসেবে আরো কয়েকটি অসাধ্য সাধিত হয়েছে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের দ্বারা। এর অন্যতম একজন ছিলেন ড. মাকসুদুল আলম যিনি পাটের জীবনরহস্য ও এর ক্ষতিকর রোগজীবাণু হিসেবে একটি ছত্রাকের জীবনরহস্য আবিষ্কার করেন।

বিজ্ঞানীদের মতে, পলিথিন শত বছরেও মাটিতে মিশে যায় না। সূর্যের তাপ, আবহাওয়া, আর্দ্রতা ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এদের কোনোটিই পলিথিনকে নষ্ট করতে পারে না। মাত্র ২০% শতাংশ ব্যাগ পুনর্ব্যবহারযোগ্য আর ৮০ শতাংশই প্রকৃতিতে থেকে যায়, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। পলিথিন ক্যান্সার ও চর্মরোগের অন্যতম কারণ। জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বে প্রতিবছর এক মিলিয়নেরও বেশি পাখি ও লক্ষাধিক জলজ প্রাণীর ধ্বংসের কারণ এ পলিথিনের ব্যবহার। এক হিসাবে দেখা গেছে, শুধু ঢাকাতেই মাসে প্রায় ৪১ কোটি পলিব্যাগ ব্যবহূত হয়। আর বুড়িগঙ্গা নদীতে রয়েছে ৫-৬ ফুট দীর্ঘ পলিথিনের স্তর। এগুলোর জন্যই জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর খাদ্য শৃঙ্খল নষ্ট হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। ঠিক এমন একটি সময়ে পাট থেকে পলিথিন উত্পাদন বিশ্বে চমক সৃষ্টি করেছে।

পলিথিন শুধু আমাদের দেশের একক সমস্যা নয়। সেজন্য যখন পাট থেকে পরিবেশবান্ধব এ পলিথিনটি উদ্ভাবনের ঘোষণাটি আসল তখন জনমনে আশার আলো সঞ্চারিত হয়েছে। এতে দুটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে। একটি হলো পরিবেশ ধ্বংসকারী পলিথিনের উত্পাদন হ্রাস পাবে, অপরদিকে পাটের সুদিনের পালে আরো জোর হাওয়া লাগার সুযোগ সৃষ্টি হলো। কারণ আমরা বাংলাদেশে মাত্র সর্বোচ্চ শতকরা ১০ শতাংশ পাট ব্যবহার করতে পারি। বাকি পাট বিদেশে রপ্তানির উপর নির্ভর করে বসে থাকতে হয়। তাছাড়া সেই রপ্তানিকৃত পাটের পুরোটাই আবার কাঁচা পাট।

কিন্তু আমাদের প্রতিবেশী ভারতের ক্ষেত্রে পুরো উল্টো চিত্র চোখে পড়ে। কারণ তারা মাত্র ৫-১০% পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি করার বিষয়ে চিন্তা করে বাকি পুরোটাই নিজস্ব কাজে ব্যবহার করে। সেই রপ্তানি আবার কোনোটাই কাঁচা পাট হিসেবে করে না। সেটা প্রসেস করে রপ্তানি করে। শুধু তাই নয় তারা বাংলাদেশ থেকে যে কাঁচা পাট আমদানি করে তাও প্রসেস করে আবার অন্যদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের পাট আমদানির ক্ষেত্রে তারা যে এন্টি ডাম্পিং করারোপ করেছে তাতে সেখানে আর তেমনভাবে রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না।

এমতাবস্থায় পাটের পলিথিন উত্পাদনের যে সম্ভাবনা দেখা দিল তাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে একদিকে যেমন পরিবেশ ঠিক করতে হবে, অপরদিকে প্রাকৃতিক তন্তু হিসেবে পাটের ব্যবহার বৃদ্ধি করে বিদেশে বাংলাদেশের পাটপণ্যের বাজার সৃষ্টি করে এ কৃষিপণ্যটির ভবিষ্যত্ খুবই উজ্জ্বল করা সম্ভব।

n লেখক: ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়


 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০১৮ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন